শিরোনাম

দিলরুবা খাতুন
মেহেরপুর, ৪ জানুয়ারি ২০২৬ (বাসস): মাঠে নামলেই মনে হয় যেন সূর্যোদয়ের আগেই হাজারো ছোট সূর্য ফুটে আছে। মেহেরপুরের পথে প্রান্তরে সরষে ফুলের এমন মনোরম সমারোহে চোখ জুড়িয়ে যায়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে চলতি মৌসুমে জেলায় সরিষা চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ হাজার ৮৫০ হেক্টর। চাষ হয়েছে ৪ হাজার ৯৫ হেক্টর জমিতে। সংখ্যার হিসাব যতই কঠোর হোক, মাঠের ভোরবেলা তা মানতে চায় না। সে শুধু ফুলের ভাষায় বলে এবার সরিষা চাষ বেড়েছে, অনেক বেড়েছে।
হলুদে হলুদে মোড়ানো সরিষা ফুলে ছেয়ে গেছে মেহেরপুরের বিস্তীর্ণ মাঠ। হলুদ রঙের যে তরঙ্গ বাতাসে দুলে ওঠে, তা যেন এক অদৃশ্য নদীর স্রোত। প্রকৃতি সেজেছে তার আপন মহিমায়। মৌমাছির মৌ-মৌ গন্ধে সরব হয়ে উঠেছে সরিষা ক্ষেত । মেহেরপুরের বিস্তৃর্ণ মাঠের সরিষা ক্ষেত বলে দিচ্ছে বড় কোন প্রাকৃতিক দূর্যোগ না হলে চলতি মৌসুমে সরিষার ভালো ফলন হবে। কৃষকের চোখে আনন্দের ঝিলিক। সরিষার তেলের রয়েছে অনেক ওষুধি গুণ। সরিষার খৈল জমির উর্বরা শক্তি বৃদ্ধি করে। সরিষার গাছ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা যায়। এছাড়া জমিতে সরিষার আবাদ করলে ওই জমিতে সরিষার পাতা পড়ে জমির খাদ্য চাহিদা অনেকাংশে মিটিয়ে থাকে। সময় এবং খরচ কম হওয়ায় জেলায় সরিষার চাষ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
কৃষকেরা বলেন, সরিষা শুধু ফসল নয়, মেহেরপুরের শীতের রঙিন মুখ। ভোরের শিশির লেগে ফুলগুলো যখন চকচক করে, মনে হয় ঠিক সেই মুহূর্তে প্রকৃতি চুপিচুপি আলো জ্বেলে গেছে।
সরেজমিনে মেহেরপুরের বিভিন্ন গ্রামের মাঠ ঘুরে দেখা যায়, সরিষার ডাঁটায় বসে মৌমাছিরা। একেকটি যেন ফুলের কাছে বিমল পত্রবাহক। দেয়ালহীন এই হলুদ রাজ্যে তারা গুনগুনিয়ে বেড়াচ্ছে। আর কৃষকেরা স্বপ্ন দেখছেন তেলের, সোনালি দানার, ভালো ফলনের।
মাঠজুড়ে হাঁটলে বোঝা যায়, এবার শুধু চাষ বেড়েছে তা নয়, প্রত্যাশা বেড়েছে কৃষকের মনেও। কারণ সরিষার ফুলেরা যেভাবে আলো ছড়ায়, তা যেন বলছে এই বছর আমাদের হাতে সোনার ফসল ধরা দেবে।
মেহেরপুরের সরিষা চাষীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, বিঘা প্রতি সরিষা উৎপাদন হয় ৭ থেকে ৮ মণ। লাভজনক এবং সরিষা চাষের অনুকূল পরিবেশের কারণে এবার চলতি রবি মৌসুমে মেহেরপুরে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে সরিষার চাষ বেশি হয়েছে। চলতি রবি শস্য মৌসুমে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবং সরিষা ক্ষেতে রোগবালাই কম হওয়ায় বাম্পার ফলনের আশা করছেন কৃষক ও কৃষি বিভাগ।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, গতবছর প্রতি মণ সরিষা বিক্রি হয়েছে ২ হাজার ৫শ টাকা থেকে ৩ হাজার টাকা মণ হিসেবে ।
মেহেরপুরের শীতের এই হলুদ উৎসব তাই শুধু কৃষি নয়, গ্রামবাংলার সৌন্দর্যেরও এক বিস্তৃত আয়োজন। সরিষার ফুল তাই প্রতি বছরই ফিরে আসে। কিন্তু এ বছর তার ভিড় আর রঙ স্বপ্ন ছড়ানো অন্যরকম।
মেহেরপুর সদর উপজেলার উজলপুর গ্রামের সরিষা চাষী আবু হোসেন জানান, প্রতিবিঘা জমিতে সরিষা চাষে খরচ হয় ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা। প্রতি মণ সরিষা বিক্রি করা যায় ২ হাজার ৫শ থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত। প্রতি বিঘাতে সাত মণ সরিষা উৎপাদন হলে বিঘা প্রতি ১৫ হাজার টাকা লাভ করা যায়। এছাড়া সরিষা আবাদে তেমন সেচের প্রয়োজন হয় না। মাত্র তিনমাস সময়ে সরিষা আবাদ করা যায়। সরিষার বড় শত্রু জাব পোকা। এবার জাব পোকার আক্রমণ না থাকায় সরিষার ফলন ভাল হবে বলে আশা করছেন তিনি।
মেহেরপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সনজীব মৃধা জানান, বাজারে সরিষা এবং ভোজ্য তেলের দাম বেশি হওয়ায় অনেক কৃষক আমন ধান সংগ্রহের পর জমি ফেলে না রেখে সরিষার চাষ করেছে। রবিশষ্য চাষের এবার অনুকূল পরিবেশ বিরাজ করছে। আবহাওয়া শেষ পর্যন্ত অনুকূলে থাকলে এবার সরিষার বাম্পার ফলন হবে বলেও তিনি আশাবাদী।