বাসস
  ০৪ জানুয়ারি ২০২৬, ১৫:০০

বলসুন্দরী, আপেল ও কাশ্মীরি কুল চাষে স্বপ্ন বুনছেন পটুয়াখালীর কৃষকেরা

ছবি: বাসস

\ এনামুল হক এনা \

পটুয়াখালী, ৪ জানুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : বলসুন্দরী, আপেল ও কাশ্মীরি কুল চাষ করে কৃষিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছেন পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলার কৃষকেরা।

উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সমন্বিত মিশ্র ফলের বাগানগুলোতে এখন সবুজের সমারোহা। গাছের পাতার ফাঁকে ফাঁকে ঝুলছে মিষ্টি কুল—আপেল কুল, বলসুন্দরী কুল ও কাশ্মীরি কুলসহ বিভিন্ন জাতের ফল। এছাড়াও বাগানগুলোতে কুলের পাশাপাশি আম, তরমুজ এবং বেগুন, ফুলকপি ও আলুসহ বিভিন্ন শীতকালীন সবজি চাষ করছেন কৃষকেরা। এতে কৃষকদের মধ্যে বাড়ছে লাভবান হওয়ার আশা। চলতি মৌসুমে কুলের অধিক ফলন ও বাজারে ভালো লাভের প্রত্যাশা করছেন তারা।

সরেজমিনে দশমিনা উপজেলার আলীপুরা ইউনিয়নের স্থানীয় কৃষি উদ্যোক্তা রণজিৎ চন্দ্র দাসের (৩৮) সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘আমার বাগানে আপেল কুল, আম ও তরমুজসহ অন্যান্য ফসল চাষে প্রায় চার লাখ টাকা খরচ হয়েছে। তবে আপেল কুল ও কাশ্মীরি কুলের চাহিদা এত বেশি যে, সব খরচ বাদ দিয়েও ভালো লাভ হবে বলে আমি আশা করছি।’

তিনি বলেন, এখন কুলের ভরা মৌসুম চলছে। স্থানীয় বাজারে বেশ চাহিদা রয়েছে। পাশাপাশি ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় পাইকারি বিক্রির সুযোগ থাকায় লাভের সম্ভাবনাও বেশি।

একই উপজেলার আলীপুরা ইউনিয়নের কৃষক মো. হাসান (৩৯) বলেন, ‘এ এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে কুল চাষ দিন দিন বাড়ছে। এখানকার মাটি কুল চাষের জন্য খুবই উপযোগী। উন্নত জাতের কুল গাছ আকারে ছোট হলেও খুব ভালো ফলন হয়।

তিনি বলেন, কুলের ভারে ডাল নুইয়ে পড়ায় ফল সংগ্রহ করতেও তেমন একটা কষ্ট হয় না। যারা শুরুতে কুল চাষ নিয়ে সন্দিহান ছিলেন, তারাও বিভিন্ন জাতের কুল চাষ করে এবার লাভের মুখ দেখছেন।’

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে কুলের বাজারদর বেশ সন্তোষজনক। খুচরা বাজারে কুল প্রতি কেজি ৭০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। আর পাইকারি বাজারে প্রতি কেজির দাম ৬০ থেকে ১২৫ টাকার মধ্যে রয়েছে। এর মধ্যে বলসুন্দরী ও আপেল কুলের দাম তুলনামূলক বেশি। তবে কিছু টক জাতের কুল মৌসুমভেদে ৪৫ থেকে ৯০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

দশমিনা উপজেলার কৃষক শাহ আলম মিয়া (৫০) বলেন, আমরা শুধু স্থানীয় বাজারে কুল বিক্রি করছি না। যশোর, খুলনা, বরিশালসহ বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকারেরা সরাসরি এসে বাজার থেকে কুল কিনে নিচ্ছেন। এবছর হাট-বাজারে কুলের চাহিদা থাকায় দামও বেশ ভালো পাওয়া যাচ্ছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী রফিক উল্লাহ (৪৫) বলেন, এই মৌসুমে কুল বিক্রি ভালোভাবে শুরু হয়েছে। প্রতিদিনই পাইকারেরা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কুল সংগ্রহ করছেন। ঢাকাসহ বড় শহরের বাজারে কুলের চাহিদা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে।

দশমিনার ছোট বাইশদিয়া এলাকার কৃষক সোহাগ হোসেন (৩৫) বলেন, আমাদের কুল চাষে খরচ তুলনামূলক কম, কিন্তু উৎপাদন ভালো হওয়ায় লাভের সম্ভাবনাও বেশি। শুধু কুল নয়—আম, তরমুজ ও শীতকালীন সবজি মিলিয়ে সামগ্রিকভাবে ভালো আয় হচ্ছে।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্র জানায়, চলতি মৌসুমে কুলের ফলন আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অনুকূল আবহাওয়া, উর্বর মাটি এবং বাজারে তুলনামূলক বেশি চাহিদা থাকায় কৃষকদের জন্য ইতিবাচক পরিস্থিতি তৈরি করেছে। ফলে কৃষকেরা এখন শুধু উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ নন, বরং বাজারজাতকরণ ও বিক্রির পরিকল্পনাও সক্রিয়ভাবে করছেন।

দশমিনা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. জাফর আহমেদ বাসসকে বলেন, “দশমিনা উপজেলার মাটি কুলসহ বিভিন্ন ফল চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। চলতি মৌসুমে উপজেলার সাতটি ইউনিয়নে উন্নত জাতের কুল চাষে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে উপজেলা কৃষি অফিস। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলন ভালো হয়েছে। আশা করছি কৃষকরা লাভবান হবেন।”

তিনি জানান, পটুয়াখালী জেলায় কুলের পাশাপাশি শীতকালীন সবজি, তরমুজ ও আমের সফল চাষও দেখা যাচ্ছে। ফলে এই অঞ্চলে মিশ্র ফল ও সবজি বাগান আরও সমৃদ্ধ হচ্ছে। সবকিছু বিবেচনায় বলা যায়, পটুয়াখালীর দশমিনায় কুল চাষ এখন আর পরীক্ষামূলক উদ্যোগ নয়—এটি পরিণত হয়েছে লাভজনক ও টেকসই কৃষি কার্যক্রমে। 
অনুকূল প্রাকৃতিক পরিবেশ, উন্নত জাতের ব্যবহার, কৃষি বিভাগের সহায়তা এবং বাজারে স্থায়ী চাহিদার কারণে বলসুন্দরী, আপেল কুল ও কাশ্মীরি কুল কৃষকদের আয়ের নির্ভরযোগ্য উৎসে পরিণত হয়েছে। পরিকল্পিত চাষ ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে এই কুল চাষ ভবিষ্যতে গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী করার পাশাপাশি কৃষকদের স্বাবলম্বী করে তুলবে—এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।