বাসস
  ৩০ নভেম্বর ২০২৫, ১৭:০৩

আর্থিক স্বচ্ছলতা থাকলেও নদী ভাঙনের ঝুঁকিতে অনিশ্চিত চরের জীবন 

ছবি : বাসস

শফিকুল ইসলাম বেবু

কুড়িগ্রাম, ৩০ নভেম্বর, ২০২৫ (বাসস) : উর্বর পলি জমায় চরাঞ্চলের মাটি কৃষির উপযুক্ত হয়ে উঠেছে। চরের জমিতে আবাদ হচ্ছে ১৩০ প্রকার ফসল। এ সব ফসল ক্রয়-বিক্রয়ে কোম্পানিগুলো সরাসরি চরের সাথে যোগাযোগ করছে। এতে কৃষক ও ব্যবসায়ী উভয়ই লাভবান হচ্ছেন। তবে নদী ভাঙনের ঝুঁকিতে সবসময় আশঙ্কায় থাকেন চরাঞ্চলের মানুষ। 

চরাঞ্চলের মানুষের দাবি, চরের বাসিন্দাদের জীবন, জীবিকা ও বসতবাড়ির নিশ্চয়তা দেওয়ার জন্য প্রয়োজন পৃথক নীতিমালা। বিভিন্ন ফোরামে তারা চরবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দাবি জানাচ্ছেন দীর্ঘদিন ধরে। 

সরেজমিনে দেখা যায়, জেলার বড় বড় নদীগুলো সংকুচিত হলেও জেগে উঠছে নতুন নতুন চর। একসময়ের অনুর্বর, বালুময় এ সব অঞ্চলে এখন ঘটছে নীরব অর্থনৈতিক বিপ্লব। কৃষি, পশুপালন, বাজার ও বাণিজ্য মিলিয়ে চরাঞ্চল পরিণত হয়েছে সম্ভাবনার নতুন কেন্দ্র হিসেবে। উত্তর-মধ্যাঞ্চলের কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, জামালপুর, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া ও টাঙ্গাইলের বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে গত এক দশকে জীবন ও জীবিকার পরিবর্তন হয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, বর্তমানে দেশের চরাঞ্চলে উৎপন্ন হচ্ছে ১৩০ ধরনের ফসল। এর মধ্যে ডাল, মরিচ, বাদাম, ভুট্টা, কাউন, পিঁয়াজ, রসুন ও মিষ্টি আলুর উৎপাদন বেশি। পলিমাটির কারণে নতুন জেগে ওঠা জমির উর্বরতাও বেশি। ব্রহ্মপুত্র, যমুনা ও তিস্তা অববাহিকায় উৎপাদিত ফসল সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে কিনে নিচ্ছে বড় ব্যবসায়ীরা। 

সময়ের সাথে সাথে উন্নত হয়েছে চরাঞ্চলের সাথে সমতলের যোগাযোগ ব্যবস্থাও। আগে নৌকা ছাড়া চরের সাথে যোগাযোগের কোনো উপায় না থাকলেও, এখন কাচা সড়ক ও বিদ্যুৎ চরের জীবনে আধুনিকতার ছোঁয়া এনে দিয়েছে। এখন বহু চরে পৌঁছেছে আধাপাকা সড়ক, ব্যাটারি চালিত ভ্যান, ঘোড়ার গাড়ি, আর সাবমেরিন কেবলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ। ফলে কৃষিকাজে কমেছে কষ্ট, বেড়েছে উৎপাদন এবং বাজারজাতকরণ সহজ হয়েছে।

কুড়িগ্রাম চর উন্নয়ন কমিটির তথ্যমতে, দেশের মোট জমির ৮ শতাংশ অর্থাৎ কমপক্ষে ২,৫০০ বর্গকিলোমিটার চরাঞ্চল। এরমধ্যে ব্রহ্মপুত্র-তিস্তা ৪০০ বর্গ কিলোমিটার, যমুনা ১০০০ বর্গ কিলোমিটার, পদ্মা-গঙ্গা ৭০০ কিলোমিটার এবং মেঘনা অববাহিকা ৪০০ কিলোমিটার।

গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর হিসাব অনুযায়ী, চরাঞ্চলে বসবাস করেন ১৭-১৮ লাখ মানুষ, যার মধ্যে শুধু কুড়িগ্রাম-লালমনিরহাটের চরাঞ্চলেই প্রায় ৬ লাখ লোক বাস করে।

কুড়িগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর জানায়, জেলার মোট ১৯ লাখ গবাদিপশুর ৬৫ শতাংশই চরে উৎপাদন হয়। 

এসব চরে তৈরি হয়েছে অসংখ্য মিনি ডেইরি ফার্ম। অনেক পরিবার বছরে ৩ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করছে গরু, ছাগল ও ভেড়া পালন করে। নারীরাও যুক্ত হচ্ছেন কৃষিকাজ, পশুপালন ও বাজার বাণিজ্যে। ফলে পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের গুরুত্ব বেড়েছে। 

তবে যত উন্নতিই হোক না কেন, নদী ভাঙনের ভয় সবসময় তাড়া করে চরাঞ্চলের মানুষকে। একদিকে আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য, অন্যদিকে নদী ভাঙনের ভয়ে তারা স্থায়ী কোনো কিছুই করতে পারেন না। 

কুড়িগ্রামের চর কড়াই, বরিশালের কৃষক আমিনুল ইসলাম (৬০) বলেন,‘আগে অনাবাদি জমি ছিল, এখন বছরে দুই তিনবার ফসল হয়। আয় ১০ লাখ টাকার মতো।’

চর বেগমগঞ্জের কৃষক বাবলু মিয়া (৬০) বাসসকে বলেন,‘অর্থনৈতিক উন্নতি হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু নদী ভাঙনের ভয় তো আছেই তাই পাকা ঘর তুলতেও ভয় পাই।’

যাত্রাপুর ইউনিয়নের বিচ্ছিন্ন চর দৈ খাওয়ার কৃষক মমেনা বেগম (৪৮) বলেন,‘এখন আমরা নারীরাও মাঠে কাজ করি, পশু পালন করি। নিজের আয় করি, তাই পরিবারের সিদ্ধান্তেও কথা বলতে পারি।’

চিলমারীর ব্যবসায়ী ফজলুল হক বলেন, ‘চরের গরু, ভেড়া, ছাগলসহ সব ফসলেরই বাজারে বাড়তি চাহিদা রয়েছে।’

পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, উজান থেকে বালি পলি ধেয়ে আসা, ড্রেজিং কম হওয়া এবং নদীপথে বাধা তৈরির কারণে চরের পরিমাণ বাড়ছে। কমছে নদীর নাব্যতা। যা বন্যার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

তিনি বলেন, চরের উন্নয়ন হয়েছে, কিন্তু এক রাতের ভাঙনে সব শেষ হয়ে যেতে পারে।

কুড়িগ্রাম জেলা চর উন্নয়ন কমিটির সভাপতি অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু বলেন, ‘চরে উন্নতি হচ্ছে, কিন্তু নীতি ও কাঠামো না থাকলে তা ধরে রাখা কঠিন। চরের টেকসই জীবন ব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য চরবিষয়ক পৃথক মন্ত্রণালয় প্রয়োজন।

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নদী বিশেষজ্ঞ ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, ‘চরাঞ্চলের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ নিয়ে আলাদা নীতিমালা না হলে উন্নয়ন থেমে যেতে পারে।’

পল্লি উন্নয়ন অ্যাকাডেমির প্রকল্প পরিচালক ড. আব্দুল মজিদ প্রামাণিক বাসসকে বলেন, ৩০ জেলার ১০০ উপজেলায় চর রয়েছে। সঠিক ব্যবহারে দেশের খাদ্য ঘাটতি কমবে। তিনি চর উন্নয়নে দ্রুত পৃথক নীতিমালা প্রণয়নের সুপারিশ করেন।