শিরোনাম

মো. আসাদুজ্জামান
সাতক্ষীরা, ৩০ নভেম্বর, ২০২৫ (বাসস) : কালো ছেলের নাম পদ্মলোচন হতেই পারে, কিন্তু সাতক্ষীরার নামের ভেতরে আছে সাত গুণ। তার সন্দেশ, কুল, ওল, আম, ঘোল, মাদুর ও গাছের কলম প্রতিটিই সেরা। এই সাত সেরার গুণেই নাম হয়েছে তার সাতক্ষীরা।
সাতক্ষীরা জেলার অন্যতম প্রসিদ্ধ মিষ্টি ‘সন্দেশ’। জেলা ও জেলার বাইরে জনপ্রিয় এই সন্দেশ সবারই প্রিয়।
পাকিস্তান আমল থেকেই দেশের সেরা মিষ্টির তালিকায় লেখা রয়েছে সাতক্ষীরার বিখ্যাত নলেন গুড়ের ক্ষীর সন্দেশ, প্যারা সন্দেশ ও সরপুরিয়া। জেলার নলেন গুড়ের এই সুপরিচিত মিষ্টি মূলত শীতকালে খেজুরের রস থেকে তৈরি নলেন গুড় দিয়ে বানানো হয়। এটি সাতক্ষীরার একটি ঐতিহ্যবাহী এবং জনপ্রিয় মিষ্টি। এই মিষ্টির বৈশিষ্ট্য হলো; এর স্বাদ ও গন্ধ, যা নলেন গুড়ের কারণে আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। এছাড়া, দুধ মালাই, সাদা সন্দেশ, রসমালাই, ছানার জিলাপি, জামরুল, গোলাপ জাম, মৌচাক, বালিশ, চমচম, দানাদার, রসগোল্লা, দইসহ হরেক নামের মিষ্টি তৈরি হয় সাতক্ষীরায়।

সাতক্ষীরার মিষ্টি দেখতে অপরূপ, খেতেও সুস্বাদু। খাটি দুধ উৎপাদনে সাতক্ষীরা বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম জেলা। ফলে কম দামে খাঁটি গরুর দুধ পাওয়ায় এ অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে উঠেছে সুস্বাদু মিষ্টি তৈরির কারখানা। খাঁটি দুধের তৈরি মিষ্টি ও সন্দেশ তৈরিতে জেলার কারিগরদেরও সুনাম রয়েছে সারাদেশে।
খাঁটি গরুর দুধের ছানা ও দক্ষ কারিগরের নিপুণ হাত এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলা ঐতিহ্যবাহী রেসিপির সমন্বয়ে তৈরি হয় সাতক্ষীরার এসব মিষ্টি। জেলার চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও যাচ্ছে সাতক্ষীরার সুস্বাদু এসব মিষ্টি। শতভাগ খাঁটি দুধ দিয়ে ছানা তৈরি করেই গড়ে ওঠে সাতক্ষীরার এই সুস্বাদু মিষ্টির জগৎ।
সাতক্ষীরার মিষ্টির কথা উঠলেই সামনে আসে ফকির মিষ্টান্ন ভাণ্ডার, সাগর সুইটস, ভাগ্যকূল মিষ্টান্ন ভাণ্ডার, কেষ্ট, ময়রার নাম। দোকানগুলো আজও ধরে রেখেছে তাদের আগের সেই সুনাম ও ঐতিহ্য।

সাতক্ষীরার মিষ্টি বিক্রেতাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, ঐতিহ্যবাহী নলেন গুড়ের সন্দেশ প্রতি কেজি ৪২০ টাকা, নলেন গুড়ের প্যারা সন্দেশ সাড়ে ৪০০-৫০০ টাকা ও সাদা সন্দেশ প্রতি কেজি ৩৭০ টাকা দরে বিক্রি হয়।
মিষ্টির কারিগর আবু তালেব জানান, ভোর থেকেই শুরু হয় তাদের কর্মব্যস্ততা। খাঁটি গরুর দুধ সংগ্রহ করে আনা হয় কারখানায়। বড় পাতিলে দুধ জাল দিয়ে তৈরি করা হয় ছানা। ছানাগুলো পানিশূন্য করার জন্য একটি গামছায় পেঁচিয়ে গামছাটি কিছুক্ষণ ঝুলিয়ে রাখা হয় । এরপর উনুনের ওপর রাখা লোহার কড়াইয়ে একটি নির্দিষ্ট অনুপাতে ছানা, নলেন গুড় ও চিনি মিশিয়ে ৩০ মিনিটের মতো তাপ দেওয়া হয়। এরপর উনুন থেকে কড়াই নামিয়ে সন্দেশ ঠান্ডা করা হয়। কড়াই থেকে সন্দেশ তুলে একটি বড় পাতিলে তুলে টেবিলের ওপর রাখা হয় ঠান্ডা করার জন্য।
কারিগর রফিকুল ইসলাম জানান, ২০ কেজি দুধ থেকে ৭ কেজি ছানা তৈরি হয়। ওই ৭ কেজি ছানা চুলোর উপর কড়াইতে ঢালা হয়। কড়াইতে এক কেজি নলেন গুড় ও এক কেজি চিনি দেওয়া হয়। এরপর সেটি জ্বালিয়ে নলেন গুড়ের সন্দেশ ও প্যারা তৈরি করা হয়। ২০ কেজি দুধে ৮ কেজি সন্দেশ বা প্যারা তৈরি করা যায়।

সন্দেশ ক্রেতা রেজাউল ইসলাম বলেন, সাতক্ষীরার নলেন গুড়ের সন্দেশ ও প্যারা খুবই সুস্বাদু ও জনপ্রিয়। পরিবারের সবাই খুব পছন্দ করে। তাই পরিবারের জন্য এই মিষ্টি কিনতে এসেছি।
ক্রেতা আব্দুর রাজ্জাক বলেন, সাতক্ষীরার বিখ্যাত নলেন গুড়ের সন্দেশ। আর তাই সাতক্ষীরা শহরে বেড়াতে আসলে ফকির মিষ্টান্ন ভাণ্ডার থেকে এই মিষ্টি না কিনে বাড়ি ফিরি না।
ফকির মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের স্বত্বাধিকারী জাহিদুল ইসলাম জানান, তার দোকানে প্রতিদিন প্রায় ৭০ থেকে ৮০ কেজি মিষ্টি বিক্রি হয়। এর মধ্যে ৩০ থেকে ৪০ কেজি সন্দেশ বিক্রি হয়। তিনি জানান, নলেন গুড়ের প্যারা দেশের গণ্ডি পেরিয়ে মালয়েশিয়া, ভারতে ও আমেরিকায়ও নিয়ে যায় অনেক ক্রেতা।