শিরোনাম

।। রেজাউল করিম মানিক।।
রংপুর, ৩০ নভেম্বর, ২০২৫ (বাসস) : বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উত্তরের নদ-নদীগুলো এখন মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। বালুময় জমিগুলো বেলে দোয়াশে পরিণত হওয়ায় চাষাবাদের ধুম পড়েছে উত্তরের তিস্তা, ধরলা, সানিয়াজান, ব্রহ্মপুত্র, নদীর চরে।
কৃষি বিভাগ বলছে, উত্তরের এই সব নদীতে প্রায় ৭৮৬টি চর রয়েছে। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর, চরের মানুষগুলো ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে।
রংপুর কৃষি অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ সিরাজুল ইসলাম বলেন, এ সব চরে এবারে চাষাবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৬ হাজার ৯১১ হেক্টর জমি। এ সব জমিতে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩ লক্ষ ৬২ হাজার মেট্রিক টন বিভিন্ন প্রকার ফসল।
তিনি আরও বলেন, কৃষি বিভাগ মনে করে, চরের ফসলে ঘুরে দাঁড়িয়েছে এই অঞ্চলের চরবাসীরা। একবারের ফসলেই তাদের সারা বছর চলে যায়।
উত্তরের লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা ও নীলফামারী জেলার তিস্তা নদীর চরে চাষাবাদের ধুম পড়েছে। স্থানীয় কৃষকরা ব্যস্ত সময় পার করছেন।
এ অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে আবাদ হয়েছে আলু, বেগুন, মরিচ, ছিটা পিঁয়াজ, আদা, রসুন, শিম, ধনেপাতা, গাজর, কপি, মূলা, লাউ, গম, তিল, তিশি, সরিষা ও ভুট্টা।
এ মৌসুমে ভালো ফলনের আশা করছেন চাষিরা।
রংপুরের গঙ্গাচরার ইচলির চরের চাষি হোসেন মিয়া বলেন, তিস্তার চরে তিন বিঘা জমিতে আলু, তিন বিঘায় বেগুন ও ২০ শতক জমিতে ধনে পাতা চাষ করেছি। ফলন ভালো হলে খরচ বাদ দিয়ে, এই মৌসুমে দেড় লাখ টাকা আয় হবে।
শুধু হোসেনই নন, ওই এলাকার কৃষক হাবিবুর, রহিম ও খায়রুল একই কথা বললেন।
তারা বলেন, যেটুকু জমিতে আবাদ করেছি, ফলন ভালো হলে তাতে ৬০-৭০ হাজার টাকা লাভ হবে।
লক্ষ্মীটারি ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল হাদী বলেন, তিস্তার চরাঞ্চল এখন কৃষি জোনে পরিণত হয়েছে। ইতোমধ্যে অনেক ফসল বাজারে উঠতে শুরু করেছে। অনেকে নতুন করে চাষাবাদ করছেন।
তিনি আরও বলেন, চরের কৃষকের একটাই দুঃখ, আর তা হলো— উৎপাদিত পণ্য সংরক্ষণ, বাজারে সরবরাহ ও প্রক্রিয়াজাত করণের কোনো ব্যবস্থা নেই।
এ সব কারণে চাষিরা কাঙ্ক্ষিত মুনাফা অর্জন করতে পারছেন না বলে জানান তিনি।
চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আরও বলেন, তিস্তার চরাঞ্চলে যে সব ফসল উৎপাদন হয়, তাতে ২-৩টি হিমাগার প্রয়োজন। অথচ গংগাচড়ায় আছে মাত্র একটি হিমাগার। তা ছাড়া যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন থাকায়, চরাঞ্চল থেকে কৃষক উৎপাদিত পণ্য সহজে বাজারে নিতে পারছেন না।
কৃষি কর্মকর্তা তুষার কান্তি বলেন, তিস্তার চরাঞ্চলের মাটিতে পলি জমায়, চরাঞ্চলটি অনেক উর্বর। রাসায়নিক সার ছাড়াই এখানে বিভিন্ন ফসলের ভালো ফলন হচ্ছে। বিশেষ করে— ভুট্টা, গম, আলু, মরিচ, পিঁয়াজ, রসুন, সরিষা, তিল ও তিশিসহ শাকসবজি চাষ বেশি হচ্ছে।
চর নিয়ে কাজ করেন রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডক্টর তুহিন ওয়াদুদ।
তিনি বলেন, বন্যা চলে যাওয়ার পর, চরের জমিতে যে পলি থাকে তা অত্যন্ত উর্বর, আর এ কারণে প্রতি বছরই বাম্পার ফলনের দেখা পান চরের কৃষকরা। তবে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত না হওয়ায় ন্যায্য মূল্য পান না চাষীরা।
তিনি মনে করেন তিস্তাসহ অন্যান্য নদীগুলো যদি খনন করা হয়, তাহলে চরের জমিগুলো জেগে উঠবে আর তাহলে উত্তরের মানুষের আর অভাব থাকবে না।
কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, উত্তরের ৮ জেলার ৭৮৬টির চরে যে ফসল উৎপাদন হবে, তাতে ২০০ কোটি টাকা আয় হবে।
তারা আরও বলেন, ফসল উৎপাদনের জন্য কৃষকদেরকে প্রণোদনাসহ কারিগরি সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে কৃষি বিভাগের মাঠ কর্মীরা।
বন্যায় চরের যে সব কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদেরকে ইতোমধ্যেই সহায়তা দেওয়া হয়েছে বলে জানান রংপুর অঞ্চলের কৃষি কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলাম।