শিরোনাম

এস এম জাহিদ হোসেন
খুলনা, ২৯ নভেম্বর, ২০২৫ (বাসস) : ১৯৮৮ সালের ২৯ নভেম্বর দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলে আঘাত হানে একটি ভয়াবহ ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড়। এ দুর্যোগে আনুমানিক ২ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে, যা ১৯৭০ সালের ভোলা ঘূর্ণিঝড়ের পর এ অঞ্চলের সবচেয়ে প্রাণঘাতী ঝড় হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
ঘূর্ণিঝড়ের সেই ভয়াল স্মৃতি ৩৭ বছর পর আজও তাড়া করে বেড়ায় সুন্দরবনসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় বাসিন্দাদের। সেই ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষয়ক্ষতি এখনো কাটিয়ে ওঠতে পারেননি অনেক পরিবার।
ঘূর্ণিঝড়ের সময় বাতাসের গতি ছিল ঘণ্টায় প্রায় ১২৫ মাইল এবং জলোচ্ছ্বাস ছিল ৫-১০ ফুট। ঘূর্ণিঝড়ের প্রাথমিক প্রভাব ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডের কিছু অংশেও পড়ে, সেখানেও ভারী বৃষ্টিপাত ও হতাহতের ঘটনা ঘটে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় কৃষিতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল আনুমানিক প্রায় ৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি ছিল।
ঘূর্ণিঝড়ের ফলে খুলনা ও বরিশাল বিভাগের প্রধান উপকূলীয় বাঁধ ভেঙে যায়। ফলে লবণাক্ত পানি নিম্নাঞ্চলে প্রবেশ করে।
জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয়ের কার্যালয় (ইউএনওসিএইচএ) জানায়, ঘূর্ণিঝড়ে ৭০০ জনের প্রাণহানি হয়েছিল। এতে দক্ষিণাঞ্চলের দ্বীপগুলোর খাল ও নদীপথে হাজারো জেলে নিখোঁজ হন।
খুলনা বন সংরক্ষকের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, উপকূল থেকে ৯০ কিলোমিটার দূরে দুবলাচর দ্বীপের কাছে শত শত মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল।
প্রায় ৮৫ শতাংশ গ্রামীণ বাড়িঘর ধ্বংস হয়ে যায়। হাজারো বাসিন্দা বাস্তুচ্যুত হন, অনেকেই স্কুল ও মসজিদের মতো ভবনে আশ্রয় নেন।
দেয়াল ভেঙে ও বিদ্যুতের তারে স্পৃষ্ট হয়ে অনেক মানুষ হতাহত হন। জলোচ্ছ্বাসে অধিকাংশ নলকূপ দূষিত হয়ে পড়ে। ঘূর্ণিঝড়ে কুঁড়েঘর, স্কুল, মসজিদ, মন্দির, সড়ক, সেতু, কালভার্ট, মাছের ঘের, ফসল, গাছপালা ও গৃহপালিত প্রাণী ধ্বংস হয়ে যায়।
বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলার প্রবীণ সাংবাদিক শেখ মোহাম্মদ আলী স্মৃতিচারণ করে বলেন, ১৯৮৮ সালের ২৯ নভেম্বর সন্ধ্যায় ঘূর্ণিঝড়টি সুন্দরবনের রায়মঙ্গল নদী অতিক্রম করে। এতে খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, ভোলা, বরগুনা, পটুয়াখালী এবং আশপাশের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়।
বন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ঘূর্ণিঝড়ে হাজারো গাছ উপড়ে যায় এবং পরদিন সুন্দরবনে বাঘ, হরিণ, বানর ও বুনো শূকরসহ শত শত বন্যপ্রাণী মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়।
দৈনিক ইত্তেফাক ও জন্মভূমির তৎকালীন প্রতিবেদক শেখ মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘মানুষ ও বন্যপ্রাণীর মৃতদেহ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল সুন্দরবনের রায়মঙ্গল, পুষ্পখাতি, মান্দারবাড়ি, নোটাবেকি, আগুনজালা, হলদেবুনি, ভেটখালি, কৈখালি, আড়পাংগাশিয়া, বলেশ্বর এবং মংলা ও শরণখোলার পশুর নদীর চ্যানেলে।’
ঘূর্ণিঝড়ে মনপুরা, নিঝুম দ্বীপ, ভোলার চর কুকরি মুকরি এবং সাতক্ষীরা, বরগুনা, পিরোজপুর ও পটুয়াখালীর অন্যান্য এলাকায়ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।
খুলনার কয়রা উপজেলার কৃষক হারুন শেখ বাসসকে বলেন, ‘আমি ও আমার প্রতিবেশীরা ঘূর্ণিঝড়ে প্রিয়জন হারিয়েছি। মৃত পরিবারের সদস্যদের স্মৃতি এখনো তাড়া করে বেড়ায়। কবরস্থানের জায়গার অভাবে অনেক মৃতদেহ কাপড়ে জড়িয়ে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল।’
৩৭ বছর পর আজও অনেক ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার পুরোপুরি ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠতে পারেননি। সহায়-সম্পত্তি হারিয়ে প্রচণ্ড দুর্ভোগ সত্ত্বেও এ অঞ্চলের বাসিন্দারা বাঁধের পাশে বসবাস ও জীবনধারণ করছেন।
কয়রা সদর উপজেলার বাসিন্দা শেখ মনিরুজ্জামান মনু বলেন, বারবার ঘূর্ণিঝড়ের ধ্বংসযজ্ঞের কারণে অনেক মানুষ জীবিকার জন্য দেশের অন্যত্র চলে গেছে। যারা টিকে আছেন, তারা শক্তিশালী ও টেকসই বাঁধ নির্মাণে জোর দিচ্ছেন। এগুলো ছাড়া এ উপকূলীয় অঞ্চলে বসবাস করা অসম্ভব।