শিরোনাম

সংসদ ভবন, ৩০ এপ্রিল, ২০২৬ (বাসস) : বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও ঢাকা-৩ আসনের সরকারি দলের সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেছেন, স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ সবার সাথে বন্ধুত্ব চায়, কিন্তু সেই সম্পর্ক কখনোই দাসত্বের পর্যায়ে যেতে পারে না। প্রতিবেশীর সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সার্বভৌমত্বের প্রশ্নটি সামনে এনে তিনি বলেন, বন্ধুত্ব হবে সমমর্যাদার ভিত্তিতে।
তিনি আজ সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনীত ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
গয়েশ্বর চন্দ্র রায় তার বক্তব্যে শহীদ জিয়ার রাজনৈতিক দর্শনের স্মৃতিচারণ করে বলেন, জিয়াউর রহমান চাটুকারিতা পছন্দ করতেন না এবং বিশ্বাস করতেন যে, সমালোচনা হলো গণতন্ত্রের সৌন্দর্য।
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ জিয়াউর রহমান যখন যুদ্ধের ডাক দিয়েছিলেন, তখন তিনি জাতিকে আত্মরক্ষার নয় বরং পাক হানাদার বাহিনীকে বিতাড়িত করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। অথচ সেই উত্তাল সময়ে অনেক বড় বড় নেতাকে যুদ্ধের পরিবর্তে কেবল সাবধানে থাকার নির্দেশনা দিতে দেখা গেছে।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই শহীদ জিয়ার সেই অবদানকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে চায় না।
তিনি আরও বলেন, দেশের স্বাধীনতা অর্জিত হলেও প্রকৃত মুক্তি এখনো আসেনি। জলবায়ু ও রাজনৈতিক ভাবনার পরিবর্তনের সাথে সাথে নতুন প্রজন্মের যে আকাক্সক্ষা তৈরি হয়েছে, তা অতীতের অভিজ্ঞতার আলোকে বর্তমানকে ধারণ করেই পূরণ করতে হবে।
বেগম খালেদা জিয়ার আপসহীন নেতৃত্বের প্রশংসা করে গয়েশ্বর রায় বলেন, ওবায়দুল কাদের একদিন খালেদা জিয়াকে ক্ষমা চাইতে বলেছিলেন। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের কাছে তিনি আজ ‘মাদার অফ ডেমোক্রেসি’ হিসেবে স্বীকৃত। গণতন্ত্রের প্রশ্নে তিনি কখনোই মাথা নত করেননি।
১/১১-র সময়কার ষড়যন্ত্রের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, তৎকালীন বিরাজনীতিকরণের মুখে অনেক নেতা যখন দল ত্যাগ করেছিলেন, তখন তৃণমূলের নেতা-কর্মীরাই খালেদা জিয়ার শক্তি হয়েছিলেন। তিনি জেল খেটেছেন কিন্তু দেশত্যাগ করেননি।
জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন নেতৃত্বের ভূমিকার সমালোচনা করে তিনি জানান, বিপদের দিনে তারা বিএনপির পাশে দাঁড়াতে অস্বীকৃতি জানালেও বেগম খালেদা জিয়া সবসময়ই তাদের বিচারের স্বচ্ছতার দাবি তুলে উদারতা দেখিয়েছেন।
জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান প্রসঙ্গে বিএনপির সংসদ সদস্য বলেন, বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন যখন শুরু হয়, তখন তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি দ্রুততম সময়ে এই আন্দোলনকে নৈতিক ও সর্বাত্মক সমর্থন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এটি কোনো একক দলের অর্জন নয়, বরং প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে স্কুলপড়ুয়া কিশোর-কিশোরী এবং বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের সকল স্তরের মানুষের সম্মিলিত ত্যাগের ফসল। যারা আজ সংসদে আছেন তাদের পাশাপাশি অসংখ্য সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক কর্মী এই ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশের জন্য লড়াই করেছেন।
মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট ও বর্তমান ভূ-রাজনীতির তুলনা করে তিনি বলেন, ১৯৪৭-এর দেশভাগ থেকে শুরু করে ৫২-র ভাষা আন্দোলন এবং ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, সবকিছুর মূলে ছিল বঞ্চনা ও শোষণ থেকে মুক্তি। অথচ আজও বিদেশের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমরা জাতীয় মর্যাদা সমুন্নত রাখতে পারছি না।
তিনি অভিযোগ করেন, অনেক ক্ষেত্রে আন্তরিকতার অভাব ও রাজনৈতিক নতজানু নীতির কারণে আমরা জাতীয় লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হচ্ছি। আমরা অতীতকে ভুলে থাকব না, কিন্তু বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোই আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ।
বিএনপি প্রতিষ্ঠার স্মৃতিচারণ করে গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, তিনি অত্যন্ত সৌভাগ্যবান যে, শহীদ জিয়ার হাত ধরে বিএনপির জন্ম হতে দেখেছেন।
তিনি ব্যক্তিগতভাবে কোনো সুযোগ-সুবিধার জন্য রাজনীতি করেন না জানিয়ে বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পর ভুয়া সার্টিফিকেটধারীদের দাপট দেখে তিনি নিজের অরিজিনাল সার্টিফিকেটটি ছিঁড়ে ফেলেছিলেন। কারণ তিনি যুদ্ধের বিনিময়ে কিছু প্রত্যাশা করেননি।
তিনি দলের নেতা-কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, কেবল মুখে জিয়াউর রহমান বা খালেদা জিয়ার নাম উচ্চারণ করলেই হবে না, তাদের আদর্শ ও নির্দেশিত পথে চলেই প্রকৃত দেশপ্রেম প্রমাণ করতে হবে।