শিরোনাম

সংসদ ভবন, ৩০ এপ্রিল, ২০২৬ (বাসস) : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শেষ হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার রাতে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম অধিবেশন সমাপনী সংক্রান্ত রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের ঘোষণা পাঠের মাধ্যমে প্রথম অধিবেশনের সমাপ্তি ঘোষণা করেন।
গত ১২ মার্চ থেকে ২৫ কার্যদিবস অধিবেশন চলার পর আজ ৩০ এপ্রিল জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শেষ হয়। এই অধিবেশনে মোট বৈঠক দিবস ছিল ২৫টি। অধ্যাদেশ ছিল ১৩৩টি। অধ্যাদেশগুলোর বিপরীতে বিল পাস হয়েছে ৯১টি। আজকের দুটি বিলসহ মোট ৯৪টি বিল পাস হয়েছে। আইন প্রণয়ন কার্যাবলী ছাড়াও এই অধিবেশনে ৫টি স্থায়ী কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং ২টি বিশেষ কমিটি গঠিত হয়েছে।
কার্যপ্রণালী বিধির ৬২ বিধিতে ১৬টি নোটিশ পাওয়া যায়। এর মধ্যে দুটির ওপর আলোচনা হয়েছে। ৬৮ বিধিতে ৯টি নোটিশ পাওয়া যায়, এর মধ্যে একটি নোটিশের ওপর সংক্ষিপ্ত আলোচনা হয়েছে। ৭১ বিধিতে গৃহীত ৩৮টি নোটিশের ওপর আলোচনা হয়েছে এবং ৭১ক বিধিতে দুই মিনিট করে বক্তব্য দেওয়া হয়েছে ২০৭ বার। ১৬৪ বিধিতে ১৪টি নোটিশের মধ্যে একটি নোটিশ গৃহীত হয়েছে এবং এটি বিশেষ অধিকার সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়েছে। ২৬৬ বিধিতে দুটি বিশেষ কমিটি গঠিত হয়েছে।
এই অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীকে উত্তর দানের জন্য সর্বমোট ৯৩টি প্রশ্নের নোটিশ প্রদান করা হয়েছে। এর মধ্যে তিনি ৩৫টি প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীদের উত্তরদানের জন্য মোট ২ হাজার ৫০৯টি প্রশ্নের নোটিশ পাওয়া যায়। এই নোটিশগুলোর মধ্যে মন্ত্রীগণ মোট ১ হাজার ৭৭৮টি প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ৪০ ঘণ্টা ১৪ মিনিট আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সমাপনী বক্তব্যে স্পিকার বলেন, ‘দীর্ঘ ১৮ বছর পর জনগণের সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা এই মহান সংসদে সক্রিয় অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েছি। তাই এই অধিবেশন ছিল বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আমার বেশ কয়েকটি সংসদ দেখার অভিজ্ঞতা হয়েছে। এই ত্রয়োদশ সংসদে এই অধিবেশনে সরকারি দল এবং বিরোধী দলের মধ্যে যেই সৌহার্দ্য, সহমর্মিতা এবং সহযোগিতা আমি দেখেছি, তা অতীতের কোনো সংসদে এই ধরনের দৃশ্য দেখতে পাইনি।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের সামনে গুরুত্বপূর্ণ হলো সংসদীয় গণতন্ত্রকে আরো শক্তিশালী করা, দেশের সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। আসুন আমরা সবাই এক সাথে কাজ করি। মতের ভিন্নতা থাকলেও দেশের স্বার্থকে সবার ওপরে স্থান দেই। আমাদের কাজ ও আচরণের মাধ্যমে জনগণের আস্থা সুদৃঢ় করি। আমরা সংসদে একটি আন্তরিক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ প্রত্যক্ষ করেছি, যেখানে অংশগ্রহণকারী সকল সংসদ সদস্য সক্রিয়ভাবে আলোচনায় অংশগ্রহণ করেছেন।’
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে প্রথমবারের মতো স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সুযোগ পেয়ে সংসদ সদস্যদের প্রতি কৃতজ্ঞ প্রকাশ করে হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদ পরিচালনায় সরকার ও বিরোধী দলের সকল সদস্যের সহযোগিতার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, ‘এই সংসদে মোট ২২০ জন সদস্য প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য হয়েছেন। তা সত্ত্বেও গঠনমূলক আলোচনা ও সহনশীল আচরণ আমাকে মুগ্ধ করেছে। আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়াসহ সংসদীয় অন্যান্য কার্যক্রমে আপনাদের সহনশীল আচরণ ও গঠনমূলক আলোচনা আমাকে অভিভূত করেছে।’ রাষ্ট্র পরিচালনায় নেতৃত্ব প্রদান ও দেশের জন্য গৌরব বয়ে আনার জন্য সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে তিনি সশ্রদ্ধ অভিনন্দন জানান।
বিরোধী দলকে কার্যকরভাবে নেতৃত্ব প্রদান এবং সংসদীয় কার্যক্রমে ইতিবাচক ভূমিকার জন্য বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানকে ধন্যবাদ জানিয়ে স্পিকার বলেন, আমি কৃতজ্ঞতা জানাই মন্ত্রিসভার সদস্যবৃন্দ, চিফ হুইপ, হুইপবৃন্দ এবং সকল সংসদ সদস্যের প্রতি। একইভাবে বিরোধী দলের চিফ হুইপ ও বিরোধী দলের সদস্যদের প্রতিও আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। তিনি ডেপুটি স্পিকার ও সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীবৃন্দ, সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ এবং দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীবৃন্দ, পুলিশ, চিকিৎসক, ফায়ার সার্ভিস, গণপূর্ত, বিদ্যুৎ ও টেলিফোন বিভাগসহ সকল সংশ্লিষ্ট সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তিবর্গকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান।
স্পিকার জাতীয় দৈনিক পত্রিকা, বিভিন্ন সংবাদ সংস্থা, বাংলাদেশ বেতার, সংসদ বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেসরকারি টিভি চ্যানেলসমূহ সহ দেশের সকল গণমাধ্যমের সাংবাদিক, কর্মকর্তা ও প্রতিনিধিবৃন্দকে ধন্যবাদ জানান।
‘মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাইয়ের চেতনায় করব কাজ গড়ব দেশ’— এই প্রতিপাদ্য এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ মূলনীতি সামনে রেখে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে উল্লেখ করে স্পিকার বলেন, বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকারমূলক কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে দেশের প্রতিটি পরিবারের জন্য ফ্যামিলি কার্ড, কৃষকদের জন্য কৃষক কার্ড কার্যকর করা এবং কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা। বিশেষ করে খাল খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচির মাধ্যমে জলাবদ্ধতা নিরসন, সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা প্রশংসনীয়। এটি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং গ্রামীণ জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আমি বিশ্বাস করি।
তিনি বলেন, জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সংসদে গঠনমূলক আলোচনা ও নিয়মতান্ত্রিক কর্মসূচির মাধ্যমে জনগণের দাবি উত্থাপনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে বর্তমান বিরোধী দল, তা আমাদের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বিশেষ ভূমিকা রাখবে বলে আশা রাখি। এছাড়া ফ্যাসিস্ট আমলে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সমুন্নত রাখা এবং আইনের শাসন সুসংহত করাও আমাদের অঙ্গীকার।
স্পিকার বলেন, আমরা নিরপেক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণে কাজ করছি। একই সঙ্গে একটি মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গড়ে তুলতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ এসব লক্ষ্য অর্জনে বাস্তব এবং কার্যকর ভূমিকা রাখবে।