শিরোনাম

ঢাকা, ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : আগামীকাল অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে সারা দেশে নিরাপত্তা জোরদার ও ব্যাপক টহল শুরু করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। শান্তিপূর্ণ ও বিশ্বাসযোগ্য ভোটগ্রহণ নিশ্চিত করতে অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে একটি সমন্বিত নিরাপত্তা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে।
ভোটের আগে, ভোটের দিন ও পরবর্তী সময়সহ গত ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সারা দেশে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রায় ১০ লাখ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
দেশে মোট ৩০০টি আসনে (তবে, একটি আসনের একজন প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে ওই আসনে ভোটগ্রহণ স্থগিত রয়েছে) প্রায় ১২ কোটি ৭৫ লাখ ভোটারের জন্য স্থাপিত প্রায় ৪৩ হাজার ভোটকেন্দ্র ও আনুমানিক ২ লাখ ৬০ হাজার ভোটকক্ষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জানিয়েছেন, সরকার সহিংসতা ও নাশকতার বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার নীতি গ্রহণ করেছে এবং সব বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল ও বিঘ্নমুক্ত রাখতে আমরা দৃঢ় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। নির্বাচনী পরিবেশ বিঘ্নিত করার যেকোনো চেষ্টার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
তিনি আরও জানান, প্রয়োজনে নিরাপত্তা বাহিনী যেকোনো স্থানে, এমনকি ভোটকেন্দ্রেও প্রবেশ করতে পারবে। সীমান্তে নজরদারি, গোয়েন্দা তৎপরতা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানিমূলক কনটেন্ট পর্যবেক্ষণও জোরদার করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, জনগণের জন্য কোনো অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ঝুঁকি নেই। প্রতিটি নাগরিক সুরক্ষিত থাকবেন। নির্বাচন শান্তিপূর্ণ, উৎসবমুখর ও গ্রহণযোগ্য পরিবেশে অনুষ্ঠিত হবে।
পুলিশ সদর দপ্তরে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণকক্ষ পরিদর্শনকালে উপদেষ্টা সারা দেশের রিয়েল-টাইম মনিটরিং ব্যবস্থা, যোগাযোগ কাঠামো এবং জরুরি সাড়া প্রদানের প্রস্তুতি পর্যালোচনা করেন।
রাজধানীর নিউ মার্কেট ও মোহাম্মদপুর থানা পরিদর্শন করে মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতি মূল্যায়ন করেন এবং দায়িত্ব পালনে কর্মকর্তাদের সতর্ক, নিরপেক্ষ ও পেশাদার থাকার নির্দেশনাও দেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মোতায়েনকৃত বাহিনীর মধ্যে রয়েছে ১ লাখ সেনা সদস্য, ৫ হাজার নৌবাহিনী সদস্য, ৩ হাজার ৭৩০ বিমানবাহিনী সদস্য, ৩৭ হাজার ৪৫৩ বিজিবি সদস্য, ৩ হাজার ৫০০ কোস্টগার্ড সদস্য, ১ লাখ ৮৭ হাজার ৬০৩ পুলিশ সদস্য, ৯ হাজার ৩৪৯ র্যাব সদস্য, আনসার ও ভিডিপির ৫ লাখ ৬০ হাজার সদস্য এবং ৪৫ হাজার ৮২০ চৌকিদার ও দফাদার।
ঝুঁকির মাত্রা অনুযায়ী নিরাপত্তা ব্যবস্থা শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। মহানগর এলাকা, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও দুর্গম অঞ্চলসহ গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর ভোটকেন্দ্রে বাড়তি নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
পুলিশ মহাপরিদর্শক বাহরুল আলম বলেছেন, পুলিশকে পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতা প্রদর্শন করতে হবে যাতে জনগণের আস্থা ফিরে আসে।
তিনি আরও বলেন, পুলিশ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে রয়েছে। জনআস্থা পুনরুদ্ধারে সদস্যদের পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। সাইবার গোয়েন্দা কার্যক্রম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যবেক্ষণের গুরুত্বও তুলে ধরেন তিনি।
ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার এস এম সাজ্জাত আলী নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে সতর্ক করে বলেন, রাজনৈতিক আনুগত্যের ঊর্ধ্বে উঠে ত্রুটিমুক্ত ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করায় অগ্রাধিকার দিতে হবে।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) কৌশলগত ও স্পর্শকাতর এলাকায়, বিশেষ করে রাজধানীসহ বড় শহরগুলোতে বিশেষ টহল শুরু করেছে। বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী জানান, ৪৮৯টি উপজেলায় ৩৭ হাজারের বেশি সদস্য মোতায়েন থাকছে এবং ৬১টি সীমান্ত উপজেলায় বিজিবি একক দায়িত্ব পালন করবে।
তিনি বলেন, ভোটাররা যাতে অবাধ ও সুষ্ঠু পরিবেশে ভোট দিতে পারেন, সেজন্য বিজিবি পেশাদার, সুশৃঙ্খল ও রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ বাহিনী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে। তিনি জানান, হেলিকপ্টার, ড্রোন, কে-৯ ইউনিট ও কুইক রেসপন্স টিম প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
রোহিঙ্গা পরিস্থিতি, সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা ঝুঁকি, চোরাচালান ও অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে মিয়ানমার সীমান্তে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডও ১৮ জানুয়ারি থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত উপকূলীয় ও নদীবেষ্টিত এলাকায় দায়িত্ব পালন করছে।
ভোলা, নারায়ণগঞ্জ, চাঁদপুর, খুলনা, চট্টগ্রাম, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, কক্সবাজার, বরিশাল ও পটুয়াখালীসহ দুর্গম ও নদীবেষ্টিত এলাকার ৬৯টি ইউনিয়নের ৩৩২টি ভোটকেন্দ্রে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ সদস্যের ১০০ প্লাটুন দায়িত্ব পালন করছে কোস্ট গার্ড।
এদিকে, আনসার ও ভিডিপির ৫ লাখ ৬০ হাজার সদস্য সারাদেশে ৪২, হাজার ৭৬৬ ভোটকেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করছে।
সব বাহিনীকে নিয়ে একটি কেন্দ্রীয় আইনশৃঙ্খলা সমন্বয় সেল গঠন করা হয়েছে। জরুরি সেবা ৯৯৯-এর অধীনে বিশেষ দল সার্বক্ষণিক সহায়তা দেবে।
রিটার্নিং কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানে যৌথবাহিনী নির্বাচনকালীন এলাকা-ভিত্তিক অভিযান, চেকপোস্ট ও মোবাইল টহল পরিচালনা করবে।
ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভোটারদের স্বাধীনভাবে, নিরাপদে ও নির্বিঘ্নে ভোটাধিকার প্রয়োগে সহায়তা করবে বলে আশা করছে কর্তৃপক্ষ।