শিরোনাম

ঢাকা, ১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : বাংলাদেশে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) আবাসিক প্রতিনিধি স্টেফান লিলার আজ বলেছেন, নির্বাচন সংক্রান্ত প্রতিবেদন এখন জাতীয় সীমানা ছাড়িয়ে অনেক দূর পর্যন্ত প্রভাব ফেলছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, এসব নির্বাচনী আখ্যান আন্তর্জাতিক আস্থা, কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা এবং একটি দেশের গণতান্ত্রিক পরিপক্বতা সম্পর্কে ধারণাকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
লিলার নির্বাচনসংক্রান্ত প্রতিবেদনে নির্ভুলতা, নিরপেক্ষতা ও নৈতিক বিবেচনার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের সাংবাদিকদের কাজ কূটনীতিক, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক, উন্নয়ন সহযোগী, বিনিয়োগকারী এবং বৈশ্বিক গণমাধ্যমগুলো নিবিড়ভাবে অনুসরণ করে।
লিলার বলেন, ‘ফলস্বরূপ নির্বাচনী বর্ণনা আন্তর্জাতিক আস্থা, কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা এবং একটি দেশের ভাবমূর্তি ও গণতান্ত্রিক পরিপক্বতাকে প্রভাবিত করতে পারে।’ তিনি যোগ করেন, এটি সাংবাদিকদের ওপর বিশেষ দায়িত্ব আরোপ করে, বিশেষত কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটে নির্বাচন কাভার করার সময়।
রাজধানীর একটি হোটেলে ইউএনডিপি ও মিডিয়া রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এমআরডিআই)-এর সহযোগিতায় ডিপ্লোম্যাটিক করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ (ডিক্যাব) আয়োজিত দুই দিনব্যাপী নির্বাচনী প্রতিবেদন বিষয়ক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির সমাপনী অনুষ্ঠানে তিনি আজ এসব কথা বলেন।
সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন। প্রশিক্ষণটি পরিচালনা করেন অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)-এর সাবেক বাংলাদেশ ব্যুরো প্রধান ফরিদ হোসেন।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন এমআরডিআই-এর নির্বাহী পরিচালক হাসিবুর রহমান এবং ডিক্যাব সভাপতি এ কে এম মঈনুদ্দিন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ডিক্যাব সাধারণ সম্পাদক ইমরুল কায়েস।
বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী মাইলফলকের দিকে এগোচ্ছে উল্লেখ করে লিলার বলেন, সাংবাদিকদের ভূমিকা একইসঙ্গে চ্যালেঞ্জিং এবং অপরিহার্য। তিনি বলেন, ‘গণতন্ত্র কেবল আইন ও প্রতিষ্ঠান দ্বারা টিকে থাকে না, বরং সচেতন নাগরিকদের মাধ্যমেও। সাংবাদিকরা সেই প্রক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দু।’
তিনি বলেন, নির্বাচনী ঘটনাবলি অবশ্যই বাংলাদেশের সাংবিধানিক ও আইনি কাঠামোর মধ্যে এবং জাতিসংঘ সনদ, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দলিল ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) আওতায়, বিশেষত শান্তি, ন্যায়বিচার ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান বিষয়ক লক্ষ্য-১৬-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রতিবেদন করতে হবে।
দায়িত্বশীল প্রতিবেদন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে আন্তর্জাতিকভাবে আইনসম্মত ও নিয়মভিত্তিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বোঝাতে সহায়তা করে বলে লিলার উল্লেখ করেন।
নির্বাচনকে গণতান্ত্রিক শাসনের সবচেয়ে প্রযুক্তিগত ও রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল দিকগুলোর একটি হিসেবে বর্ণনা করে তিনি বলেন, সাংবাদিকরা প্রতিষ্ঠান ও নাগরিকদের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করেন।
তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা তীব্র হলে পেশাদার ও নৈতিক প্রতিবেদন সরাসরি জনআস্থা, গণতান্ত্রিক বৈধতা এবং সামাজিক সংহতিতে অবদান রাখে।’ তিনি সতর্ক করে বলেন, ভুল তথ্য বা অস্পষ্ট প্রতিবেদন অনিচ্ছাকৃতভাবে উত্তেজনা বাড়াতে পারে এবং নির্বাচনী ফলাফলের প্রতি আস্থা দুর্বল করতে পারে।
লিলার আরও বলেন, ভুয়া তথ্য, বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা, ঘৃণাত্মক বক্তব্য এবং ডিজিটালি বিকৃত কনটেন্ট-যার মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দ্বারা তৈরি বা প্রচারিত বিষয়ও রয়েছে-এসব থেকে বৈশ্বিক ঝুঁকি বাড়ছে।
তিনি বলেন, তথ্যের সততা রক্ষা সাংবাদিকদের নিজেদের সুরক্ষার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। তিনি উল্লেখ করেন, সাংবাদিকরা ক্রমেই অনলাইন ও অফলাইন উভয় ক্ষেত্রেই হয়রানি, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও হুমকির মুখে পড়ছেন। নিরাপদ সাংবাদিক মানেই নিরাপদ নির্বাচন।
লিঙ্গ ও অন্তর্ভুক্তি প্রসঙ্গে লিলার বলেন, নারী প্রার্থী, কর্মী ও সাংবাদিকরা প্রযুক্তি-সহায়ক লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার শিকার হচ্ছেন অসামঞ্জস্যভাবে। এর মধ্যে রয়েছে অনলাইন হয়রানি, ভয়ভীতি প্রদর্শন, যৌনকেন্দ্রিক বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা এবং ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ (ডক্সিং)।
তিনি আরও বলেন, এসব আক্রমণের উদ্দেশ্য কণ্ঠরোধ করা এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিরুৎসাহিত করা। তিনি জোর দিয়ে বলেন, তিনি বলেন, এসব আক্রমণ কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করতে এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিরুৎসাহিত করতে পরিকল্পিত। তিনি জোর দিয়ে বলেন, গণমাধ্যম এসব প্রবণতা উন্মোচন, নারীদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরা এবং এ ধরনের নির্যাতনকে গণতান্ত্রিক অধিকার লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণে প্রতিবন্ধকতা তুলে ধরা এবং প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে গণমাধ্যম ব্যাপক অংশগ্রহণে উৎসাহ দিতে পারে এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্র ও বৈধতা জোরদার করতে পারে বলেও উল্লেখ করেন লিলার।