বাসস
  ২৪ আগস্ট ২০২৬, ১৫:৪৩

রংপুরে ৪ হত্যাকাণ্ড : ২ অভিযুক্তের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি

ছবি: কোলাজ

রংপুর, ২৪ আগস্ট, ২০২৬ (বাসস): ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় একই পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া দুই অভিযুক্ত রংপুর চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক মো. রফিকুল ইসলামের কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

জবানবন্দি রেকর্ড করার পর, আদালত রোববার রাত সাড়ে ১১টায় নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকার কানু দাসের ছেলে মুগ্ধ দাস (২৩) এবং বিনয় দাসের ছেলে সিদ্ধার্থ দাসকে (১৯) কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা (আইও) এবং রংপুর মেট্রোপলিটন কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মিলন চ্যাটার্জী আজ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

এর আগে, ওই দিন বিকেল ৫টার দিকে দুই অভিযুক্তকে আদালতে হাজির করা হয়।

তিনি বলেন, ‘যেহেতু তারা নিজেদের দায় স্বীকার করেছে, তাই তাদের রিমান্ডে নেওয়ার প্রয়োজন ছিল না।’

পরে তাদের প্রিজন ভ্যানে করে জেলে নিয়ে যাওয়া হয়।

গত শনিবার রাত ১১টায় নগরীর ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের মাছুয়াপাড়া এলাকায় তাদের নির্মাণাধীন বাড়ি থেকে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

মৃতরা হলেন- রংপুর জেলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত জনপ্রিয় শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ভোলা (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থি (২৫) ও ছেলে আয়ুষ চক্রবর্তী প্রিয়ম (১২)।

গতকাল সন্ধ্যায় রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্তের পর চারজনের মরদেহ আত্মীয়দের কাছে হস্তান্তর করার পরে গতরাতেই নগরীর দখিগঞ্জ শ্মশানে মরদেহ দাহ করা হয়েছে।

এদিকে, নিহত গণপতি চক্রবর্তী জুয়েলের বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় রোববার রংপুর মেট্রোপলিটন কোতোয়ালি থানায় অজ্ঞাতনামা অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন।

অভিযোগ অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, রাত প্রায় সাড়ে ১১টায় গণপতির স্ত্রী প্রীতিলতা তার মোবাইল ফোন থেকে হোয়াটসঅ্যাপে ছোট বোন পূজা চক্রবর্তীর সঙ্গে কথা বলেন।

শনিবার রাত ৮টা ৪৫ মিনিটে পূজা আবার তার বড় বোন প্রীতিলতাকে ফোন করেন। তখন তিনি বুঝতে পারেন যে তার পরিবারের চারজনেরই মোবাইল ফোন বন্ধ।

সন্দেহজনকভাবে পূজা রাতে তার স্বামী বিপুল আচার্যের সঙ্গে বোনের বাড়িতে যায়। তখন বাড়িটি অন্ধকারে ডুবে ছিল। ভেতর থেকেও কোনো সাড়া পাওয়া যাচ্ছিল না। ওই সময়ে, বাড়ির ভেতর থেকে পচা গন্ধ আসছিল। পরে, ফায়ার সার্ভিসের সহায়তায় পুলিশ শনিবার রাতে তালা ভেঙে বাড়িতে প্রবেশ করে।

মামলার বিবরণীতে আরও বলা হয়েছে যে সেই বাসায় আলমারি, শোকেস, আসবাবপত্র, জামাকাপড়সহ বিভিন্ন জিনিসপত্র ছড়ানো-ছিটানো অবস্থায় ছিল।

গণপতির বড় ভাই এবং মামলার বাদি গোপীনাথ চক্রবর্তী জানান যে, গণপতি নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকায় পরিবারসহ তার নিজের নির্মাণাধীন বাড়িতে থাকতেন।

রোববার ভোরে ডেপুটি কমিশনার অফ পুলিশ (ডিবি) সনাতন চক্রবর্তীর নেতৃত্বে আরপিএমপি’র একটি বিশেষ ডিবি পুলিশ দল নগরী থেকে পৃথক-পৃথক অভিযানে দুই সন্দেহভাজন খুনি মুগ্ধ দাস এবং সিদ্ধার্থ দাসকে গ্রেফতার করে।

মুগ্ধ দাস এবং সিদ্ধার্থ দাস সম্পর্কে কাজিন এবং তারা নিহত পরিবারের সদস্যদের একই এলাকার বাসিন্দা। তারা একে অপরকে চিনতেন। রংপুর নগরীতে সিদ্ধার্থ একটি সোনার গহনার দোকানে এবং মুগ্ধ একটি মাছের দোকানে কাজ করতেন।

আরপিএমপি কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ বলেন, গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিরা স্বীকার করেছে যে, শিক্ষক যখন তাদের বাড়ির ছাদে ইয়াবা ট্যাবলেট খাওয়া থেকে বিরত করার চেষ্টা করেন, তখন তারা গলায় গামছা জড়িয়ে একের পর এক চারটি হত্যাকাণ্ড ঘটায়।’

পরিবারের চারজনকেই হত্যা করার পর সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ সেখানে ওই বাড়িতেই স্নান করেছে। তারা খাবার টেবিলে বসে শসা ও খেজুর খেয়েছে এবং তাদের সাথে থাকা ইয়াবা ট্যাবলেটগুলো সেবন করেছে।

পরে তারা সোনার গহনাও লুট করে এবং বাড়িতে থাকা দু’টি মোবাইল ফোন ডিটারজেন্ট পাউডার মেশানো পানিতে ভিজিয়ে রাখে, যাতে কোনো আঙুলের ছাপ না থাকে।

আরপিএমপি কমিশনার আরো বলেন, গত শুক্রবার জুমার নামাজের সময় রাস্তা ফাঁকা থাকলে হত্যাকারীরা ওই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়।

একজন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা বাসসকে জানিয়েছেন, চুরি যাওয়া গয়না উদ্ধার এবং রোববার রাতে রংপুর চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দুই অভিযুক্তের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি গ্রহণের মধ্য দিয়ে চার হত্যাকাণ্ড মামলার তদন্ত প্রায় সম্পন্ন হয়েছে।