শিরোনাম

ঢাকা, ২ জানুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে নতুন গতি দিতে এবং বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে বাণিজ্যিক বিচার ব্যবস্থায় এক নতুন যুগের সূচনা হতে যাচ্ছে। দীর্ঘদিনের বিচারিক দীর্ঘসূত্রতা কাটিয়ে দ্রুততম সময়ে বাণিজ্যিক বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে সরকার ‘বাণিজ্যিক আদালত অধ্যাদেশ, ২০২৬’ জারি করেছে।
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন সংবিধানের ৯৩(১) অনুচ্ছেদে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে গতকাল বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) গুরুত্বপূর্ণ এই অধ্যাদেশটি জারি করেন। আজ শুক্রবার আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ থেকে এই সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশিত হয়েছে।
বিশেষায়িত আদালত গঠন, মামলা ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন এবং ডিজিটাল বিচারপ্রক্রিয়া নিশ্চিত করার মাধ্যমে অধ্যাদেশটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করতে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনে এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
একইসঙ্গে, মামলার চূড়ান্ত শুনানি শুরুর ৯০ দিনের মধ্যে বিচারপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা রেখে প্রণীত এই আইনি কাঠামো দেশের ‘ইজ অব ডুয়িং বিজনেস’ বা সহজ ব্যবসা সূচকে আমূল পরিবর্তন আনবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাণিজ্যিক বিরোধের দ্রুত নিষ্পত্তি :
এই অধ্যাদেশের মূল লক্ষ্য হলো-ব্যবসা-বাণিজ্যসংক্রান্ত জটিলতা ও বিরোধসমূহ দ্রুত এবং কার্যকরভাবে নিষ্পত্তি করা। এর ফলে পণ্য আমদানি-রপ্তানি, ব্যাংকিং লেনদেন, যৌথ উদ্যোগ চুক্তি, মেধা সম্পদ (ট্রেডমার্ক, পেটেন্ট), খনিজ সম্পদ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক রীতিনীতি সংক্রান্ত বিরোধগুলো সাধারণ আদালতের দীর্ঘসূত্রতা এড়িয়ে বিশেষায়িত আদালতের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব হবে।
আদালত গঠন ও বিচারপ্রক্রিয়া :
অধ্যাদেশ অনুযায়ী, সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শক্রমে সরকার প্রয়োজনীয়সংখ্যক বাণিজ্যিক আদালত গঠন করবে। জেলা জজ বা অতিরিক্ত জেলা জজ পর্যায়ের বিচারকগণ এই আদালতের দায়িত্ব পালন করবেন। বাণিজ্যিক আইনের ওপর বিশেষ প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বিচারকগণ নিয়োগের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবেন।
এই অধ্যাদেশের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো ‘সুইট ম্যানেজমেন্ট’ বা মামলা ব্যবস্থাপনা শুনানি। বিবাদী জবাব দাখিল করার পর প্রথম শুনানির দিনই আদালত বিচার্য বিষয়গুলো নির্ধারণ করবেন এবং কত সময়ের মধ্যে বিচার শেষ হবে, তার একটি রূপরেখা তৈরি করবেন। চূড়ান্ত শুনানি শুরু হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে।
ডিজিটাল ও ভার্চুয়াল বিচার :
তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর বিশেষ জোর দিয়ে অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, ‘আদালত কর্তৃক তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহার আইন, ২০২০’ অনুসরণ করে ভার্চুয়াল উপস্থিতিতে সব ধরনের শুনানি সম্পাদন করা যাবে। এছাড়া ই-ফাইলিং এবং ইলেকট্রনিক উপায়ে সমন জারির বিধানও রাখা হয়েছে।
বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) :
মামলাজট কমাতে অধ্যাদেশে ‘প্রাক-মামলা মধ্যস্থতা’ (প্রি সুইট মেডিটেশন) পদ্ধতি বাধ্যতামূলক করার সুযোগ রাখা হয়েছে। জরুরি কোনো অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ প্রয়োজন না থাকলে, বাদীকে মামলা দায়েরের আগে মধ্যস্থতার চেষ্টা করতে হবে। এছাড়া মামলা চলাকালীন উভয় পক্ষ সম্মত হলে আদালতের মাধ্যমে ৩০ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে মধ্যস্থতায় আসার বিধান রাখা হয়েছে।
আপিল ও রিভিশন :
বাণিজ্যিক আদালতের রায় বা আদেশের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ পক্ষ ৬০ দিনের মধ্যে হাইকোর্ট বিভাগে আপিল করতে পারবেন। প্রধান বিচারপতি এই উদ্দেশ্যে হাইকোর্ট বিভাগে এক বা একাধিক ‘বাণিজ্যিক আপিল বেঞ্চ’ গঠন করবেন।
এর বাইরে অবকাঠামো প্রকল্প বা বড় বিনিয়োগ সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিষ্পত্তি করা হবে; অহেতুক সময়ক্ষেপণ করলে সংশ্লিষ্ট পক্ষের ওপর আদালত বড় অংকের জরিমানা বা খরচ আরোপ করতে পারবেন।
চুক্তিতে সুদের হার উল্লেখ না থাকলে আদালত প্রচলিত ব্যাংক হারের চেয়ে ২ শতাংশ বেশি হারে সুদ নির্ধারণ করতে পারবেন; প্রতি মাসে বিচারাধীন ও নিষ্পত্তিকৃত মামলার পরিসংখ্যান সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হবে।