বাসস
  ৩১ আগস্ট ২০২৬, ১১:৩৩

৩৪ উপজেলায় ডিজিটাল পদ্ধতিতে ভূমি রেকর্ড হালনাগাদ করা হচ্ছে : মহাপরিচালক

ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আবুল হাছানাত হুমায়ুন কবীর। ফাইল ছবি

মোশতাক আহমদ

ঢাকা, ৩১ আগস্ট ২০২৬ (বাসস): ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আবুল হাছানাত হুমায়ুন কবীর বলেছেন, ভূমি সেবার আধুনিকায়নে দেশের ৬ জেলার ৩৪ উপজেলায় পাইলট ভিত্তিতে ডিজিটাল পদ্ধতিতে জরিপ ও রেকর্ড হালনাগাদের কাজ শুরু হয়েছে।

রাজধানীর তেজগাঁওয়ে ভূমি ভবনে ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের নিজ কার্যালয়ে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)-কে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা জানান।

মহাপরিচালক জানান, ভূমি সেবায় মানুষের দুর্ভোগ কমাতে দেশের ভূমি জরিপ ও রেকর্ড ব্যবস্থাকে আধুনিকায়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে দেশের ৬ জেলার ৩৪ উপজেলায় পাইলট ভিত্তিতে ডিজিটাল পদ্ধতিতে ভূমি জরিপ ও রেকর্ড হালনাগাদের কাজ শুরু হয়েছে। পাইলট প্রকল্পের সফলতার ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমে সারা দেশে এ ব্যবস্থা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।

তিনি বলেন, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভূমি জরিপ, রেকর্ড সংরক্ষণ ও হালনাগাদ করা হলে মানুষের ভোগান্তি অনেকাংশে কমবে। একই সঙ্গে ভূমি সংক্রান্ত তথ্য আরও নির্ভুল ও সহজলভ্য হবে।

আবুল হাছানাত হুমায়ুন কবীর বলেন, ভূমি এমন একটি মৌলিক সম্পদ, যার সঙ্গে দেশের প্রায় সব মানুষ কোনো না কোনোভাবে সম্পৃক্ত। ব্যক্তি থেকে শুরু করে প্রতিষ্ঠান, ভূমির সঙ্গে সম্পর্ক নেই এমন মানুষ বা প্রতিষ্ঠান খুব কমই আছে। ফলে ভূমি ব্যবস্থাপনায় মানুষের সম্পৃক্ততা যেমন ব্যাপক, তেমনি এ খাতে সেবা নিতে গিয়ে মানুষের দুর্ভোগের সম্ভাবনাও বেশি।

তিনি বলেন, ‘ভূমি সেবা নিতে গিয়ে মানুষের যে দুর্ভোগ হয়, তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। এই কষ্ট ও ভোগান্তি যাতে কমানো যায়, সেজন্য সরকার ভূমি ব্যবস্থাকে ডিজিটাল করার উদ্যোগ নিয়েছে। আমাদের অধিদপ্তরও এ লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ভূমি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে সারা দেশের ভূমি ব্যবস্থাকে ডিজিটাল করার বিষয়ে একটি ফিজিবিলিটি স্টাডি করা হয়েছে। এর ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। আশা করা হচ্ছে, আগামী ১৫ বছরের মধ্যে দেশের প্রতিটি ইঞ্চি জমিকে ডিজিটাল ভূমি জরিপ ও রেকর্ড ব্যবস্থার আওতায় আনা সম্ভব হবে।

মহাপরিচালক বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে ভূমি সংক্রান্ত তথ্য আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে সংরক্ষিত থাকবে এবং মানুষ সহজে প্রয়োজনীয় সেবা পাবে। সব উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য মানুষের ভোগান্তি কমানো।’

বর্তমানে ভূমি জরিপের ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আগের তুলনায় জরিপ পদ্ধতিতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। অতীতে যেসব যন্ত্রপাতি ও পদ্ধতি ব্যবহার করে ভূমি মাপা হতো, বর্তমানে সেগুলোর পরিবর্তে আরও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, আমরা যে পদ্ধতিতে ভূমি জরিপের সময় পরিমাপ করতাম, সেই পদ্ধতি এখন আর নেই। এখন আমরা আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করছি। ২০০২-০৩ সালের দিকে যে ধরনের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হতো, এখন সেগুলো ব্যবহার করা হয় না।

ডিজিটাল ভূমি জরিপ ব্যবস্থার বাস্তব প্রয়োগের অংশ হিসেবে ৬ জেলার ৩৪ উপজেলায় পাইলট প্রকল্পের কথা উল্লেখ করে মহাপরিচালক বলেন, আমাদের একটি পাইলট প্রকল্প হিসেবে ৬ জেলার ৩৪ উপজেলায় কাজ শুরু হয়েছে। সেখানে ডিজিটাল পদ্ধতিতে ভূমি জরিপ ও রেকর্ড আপডেট করা হচ্ছে। এই পাইলট প্রকল্পের সফলতা মূল্যায়নের পর পরবর্তী পর্যায়ে সারাদেশে এটি রেপ্লিকেট করা হবে।’

তার মতে, একটি নতুন পদ্ধতি সারা দেশে বাস্তবায়নের আগে সীমিত পরিসরে এর কার্যকারিতা যাচাই করা জরুরি। পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে কোথায় কী ধরনের সমস্যা হচ্ছে, প্রযুক্তি ব্যবহারে কী ধরনের সক্ষমতা প্রয়োজন এবং কতটা দ্রুত ও নির্ভুলভাবে কাজ করা সম্ভব, এসব বিষয় মূল্যায়ন করা যাবে।

এদিকে ভূমি জরিপের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করতে জনবল সংকট একটি বড় চ্যালেঞ্জ বলে জানিয়েছেন মহাপরিচালক।  ‘অনুমোদিত পদের তুলনায় আমাদের জনবল অনেক কম,’ বলেন তিনি।

তবে গত দুই বছরে জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে জানিয়ে মহাপরিচালক বলেন, সিনিয়র সচিবের নেতৃত্বে গত দুই বছরে প্রায় ২ হাজার জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আগামী ছয় মাসে আরও প্রায় ৫০০ জন নিয়োগ দেওয়া হতে পারে।

জনবল সংকটের কারণে ভূমি জরিপের কাজ দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কার কথাও তুলে ধরেন তিনি। এ সমস্যা সমাধানে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে জরিপের কিছু কাজ সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।

মহাপরিচালক বলেন, ২০১২ সালের আগে ভূমি জরিপের প্রাথমিক ফিল্ডওয়ার্কের কিছু অংশ আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হতো। তখন সরদার আমিন, বদর আমিনসহ মৌসুমি ও চুক্তিভিত্তিক জনবল ব্যবহার করে মাঠপর্যায়ের কাজ করা হতো। কিন্তু ২০১২ সালের পর থেকে এ ধরনের ব্যবস্থা আর চালু নেই।

তিনি বলেন, ‘২০১২ সালের পর এটি করা হচ্ছে না। যার কারণে আমাদের যে লোকবল আছে, সেই লোকবলের মাধ্যমে আমরা কাজের গতি বাড়াতে পারছি না।’

এ সমস্যা সমাধানে নতুন একটি প্রকল্প নেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন আউটসোর্সিং কোম্পানির মাধ্যমে ভূমি জরিপের নির্দিষ্ট কিছু কাজ সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে।

তার মতে, আউটসোর্সিংয়ের উদ্দেশ্য অধিদপ্তরের দায়িত্ব কমানো নয়; বরং সীমিত জনবল দিয়ে বৃহৎ পরিসরের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করা। পাইলট পর্যায়ে এ পদ্ধতির কার্যকারিতা যাচাই করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

ভূমি জরিপের সব তথ্য নিয়ে একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ তৈরির পরিকল্পনার বিষয়েও কথা বলেন মহাপরিচালক। তিনি জানান, অতীতে ভূমি সংক্রান্ত রেকর্ড বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সংরক্ষিত থাকলেও ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের নিজস্ব কেন্দ্রীয় সংরক্ষণব্যবস্থা ছিল সীমিত।

তিনি বলেন, ‘আগে আমাদের রেকর্ড চারটি প্রতিষ্ঠানে রাখা হতো। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, কালেক্টরেট, জেলা জজের কার্যালয় এবং তহসিল অফিসসহ বিভিন্ন জায়গায় রেকর্ড সংরক্ষণ করা হতো। আমাদের অধিদপ্তরেও সব রেকর্ড সংরক্ষণ করা হতো না।’

তবে এখন পরিস্থিতি পরিবর্তন হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে নতুন জরিপের রেকর্ড অধিদপ্তরের নিজস্ব ব্যবস্থায় সংরক্ষণ করা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে বিডিএস (বাংলাদেশ ডিজিটাল সার্ভে) জরিপের রেকর্ড কেন্দ্রীয় ডাটাবেজে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আমরা এখন থেকে আমাদের বিডিএস জরিপের রেকর্ডগুলো এখানে রাখব। গত দুই বছর আগে থেকেই এ কাজ শুরু হয়েছে।’

এর ফলে ভবিষ্যতে কোনো জেলা বা উপজেলা থেকে প্রয়োজনীয় রেকর্ড পাওয়া না গেলে মানুষ যেন অধিদপ্তর থেকে তথ্য বা রেকর্ডের কপি পাওয়ার সুযোগ পান, সেই ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

তিনি বলেন, কেন্দ্রীয়ভাবে রেকর্ড সংরক্ষণ করা হলে ভূমি সেবায় স্বচ্ছতা ও তথ্যের নিরাপত্তা বাড়বে। একই সঙ্গে পুরোনো নথি হারিয়ে যাওয়া, ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া বা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় রেকর্ড খুঁজে পেতে দীর্ঘ সময় লাগার মতো সমস্যাও কমবে।

তবে সব পুরোনো রেকর্ড একসঙ্গে ডিজিটাল ডাটাবেজে নিয়ে আসা একটি বড় কাজ বলেও উল্লেখ করেন তিনি। বিশেষ করে সিএস, এসএ, আরএস, বিএসসহ বিভিন্ন সময়ের জরিপের রেকর্ড রয়েছে। এসব রেকর্ডের ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা বজায় রেখে ডিজিটাল ব্যবস্থায় সংরক্ষণ করতে হবে।

নতুন জরিপ পরিচালনার ক্ষেত্রে আগের জরিপের রেকর্ডের গুরুত্ব রয়েছে উল্লেখ করে মহাপরিচালক বলেন, একটি নতুন জরিপের জন্য আগের জরিপকে ভিত্তি বা বেইসলাইন হিসেবে বিবেচনা করতে হয়।

ভূমি সেবা আধুনিকায়নের সামগ্রিক পরিকল্পনা সম্পর্কে মহাপরিচালক বলেন, ডিজিটাল জরিপ, রেকর্ড হালনাগাদ, কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ এবং পর্যাপ্ত জনবল, সবগুলো উদ্যোগ পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। একটি কার্যকর ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে শুধু প্রযুক্তি নয়, দক্ষ জনবল ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও প্রয়োজন।

তিনি বলেন, সরকারের মূল লক্ষ্য হচ্ছে ভূমি সংক্রান্ত সেবাকে মানুষের কাছে আরও সহজ, দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য করা। এজন্য মাঠপর্যায়ে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি রেকর্ড সংরক্ষণ ও তথ্য ব্যবস্থাপনাকেও শক্তিশালী করা হচ্ছে।

মহাপরিচালক আশা প্রকাশ করেন, পাইলট প্রকল্পগুলোর সফল বাস্তবায়ন এবং পরবর্তী সময়ে পর্যায়ক্রমে সারা দেশে সম্প্রসারণের মাধ্যমে ভূমি জরিপ ও রেকর্ড ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। এতে ভূমি মালিকদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি কমবে এবং ভূমি সংক্রান্ত তথ্য ব্যবস্থাপনা আরও আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর হবে।