বাসস
  ২০ আগস্ট ২০২৬, ১৯:২৪
আপডেট : ২০ আগস্ট ২০২৬, ১৯:২৯

জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন পথচলা: ড. তিতুমীর

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। ছবি: বাসস

ঢাকা, ২০ আগস্ট, ২০২৬(বাসস): প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেছেন, ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি দেশের পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন এক দৃষ্টিভঙ্গির সূচনা করেছে। এই নীতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের কেন্দ্রে রাখা হয়েছে জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব, পারস্পরিক সম্মান ও আঞ্চলিক সম্প্রীতিকে।

আজ বৃহস্পতিবার বাসসকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট, বাংলাদেশ ফর অল’—এই দর্শনের ভিত্তিতে প্রণীত নীতিটি কোনো বিচ্ছিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি নয়। বরং জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষার পাশাপাশি বিশ্বের সব দেশের সঙ্গে গঠনমূলক ও পারস্পরিক লাভজনক সম্পর্ক বজায় রাখার একটি বাস্তবধর্মী কৌশল।

ড. তিতুমীর বলেন, বাংলাদেশ মর্যাদা ও সমতার ভিত্তিতে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করতে চায়। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ ও অংশীদারিত্বের জন্য দেশ উন্মুক্ত থাকবে।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ অর্থ বাংলাদেশের স্বার্থ সবার আগে। তবে বাংলাদেশ সবার জন্য। জাতীয় স্বার্থ রক্ষা ও বৈশ্বিক সম্পৃক্ততা পরস্পর বিরোধী নয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

উপদেষ্টা বলেন, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের অংশগ্রহণের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আঞ্চলিক সম্পৃক্ততা বাড়ানো এবং পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠনে সরকারের প্রচেষ্টার একটি উদাহরণ ছিল ওই আয়োজন।

ছবি: বাসস

বাংলাদেশ কারও ওপর নির্ভরশীল বা কারও অধীন থেকে সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায় না। বরং পারস্পরিক মর্যাদা, সমতা ও সম্মানের ভিত্তিতে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে চায় বলে জানান তিনি।

তিতুমীর বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে স্বচ্ছতা, সংলাপ ও পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে উত্তেজনা ও ভুল তথ্য মোকাবিলায় এসব উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ এমন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করবে, যা সংঘাতের পরিবর্তে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও সহযোগিতা জোরদারে ভূমিকা রাখবে। ক্রমেই বিভক্ত হয়ে পড়া বৈশ্বিক পরিবেশেও বাংলাদেশ গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে চায় বলে উল্লেখ করেন অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা।

চট্টগ্রাম বন্দরের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, সরকার বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিনিয়োগ ও সহযোগিতার জন্য দেশের কৌশলগত সম্পদ উন্মুক্ত করছে। বাংলাদেশের কৌশলগত অবকাঠামো কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশের একক প্রভাববলয়ের অংশ হয়ে উঠুক, তা সরকার চায় না।

তিতুমীর বলেন, বাংলাদেশের লক্ষ্য ‘বিভক্ত বিশ্ব’ নয়, বরং একটি ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক বিশ্ব’ গড়ে তোলা, যেখানে বিভিন্ন অঞ্চল ও দেশের মধ্যে পারস্পরিক স্বার্থে সহযোগিতার সুযোগ থাকবে।

এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থের মধ্যে বাংলাদেশকে সেতুবন্ধ হিসেবে নিজের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে সহায়তা করবে বলে তিনি মনে করেন।

বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক প্রসঙ্গে তিতুমীর বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক অত্যন্ত ভালো। কৌশলগত ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা আরও বাড়াতে চায় বাংলাদেশ।

তিনি বলেন, জ্বালানি, ওষুধশিল্প, বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি—এই চার খাত দুই দেশের সহযোগিতা সম্প্রসারণে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

জ্বালানি খাতে যুক্তরাষ্ট্রের আরও বেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে চায় বাংলাদেশ। পাশাপাশি প্রতিযোগিতামূলক দামে উচ্চমানের ওষুধ সরবরাহের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের ওষুধ রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা বাড়লে বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও ডিজিটাল রূপান্তরও ত্বরান্বিত হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নীতির সঙ্গে তুলনা করে তিতুমীর বলেন, বাংলাদেশের ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির লক্ষ্যও একইভাবে দেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থকে নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসা।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে ক্রমেই অর্থনৈতিক কূটনীতি, বিনিয়োগ ও উন্নয়নের বিষয়গুলো যুক্ত হচ্ছে। বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে সরকার বিভিন্ন ধরনের বি-নিয়ন্ত্রণ সংস্কার করছে বলেও জানান তিনি। এর মধ্যে ওয়ান স্টপ সার্ভিস বা সিঙ্গেল উইন্ডো ব্যবস্থা কার্যকর করা এবং নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সেবা প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে কাজের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ ও অনুসরণ ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ রয়েছে।

এসব পদক্ষেপ আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো এবং সরকারি সেবা পেতে সময় কমানোর পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য আরও বেশি স্বচ্ছ ও পূর্বানুমেয় পরিবেশ নিশ্চিত করবে বলে তিনি আশা করেন।

তিতুমীর বলেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি অনেকাংশে দেশের অভ্যন্তরীণ প্রতিষ্ঠানগুলোর শক্তি ও কার্যকারিতার ওপর নির্ভর করে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং আইনের শাসনের প্রতি সম্মানের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, বিশেষ করে বিচারাধীন বিষয়ে রাজনৈতিক বক্তব্যের মাধ্যমে বিচারিক প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করতে চায় না সরকার।

ছবি: বাসস

বিচারিক কার্যক্রম নিয়ে উসকানিমূলক ও বিভ্রান্তিকর বক্তব্যের সমালোচনা করে তিনি বলেন, বাংলাদেশকে প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা এবং আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধার বিষয়টি আন্তর্জাতিক পরিসরেও তুলে ধরতে হবে।

নতুন পররাষ্ট্রনীতির মূল লক্ষ্য হলো সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও বৈশ্বিক সম্পৃক্ততার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা, বলেন তিতুমীর। তিনি বলেন, বাংলাদেশ জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করবে, পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখবে, বিশ্বের প্রধান শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকবে এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগ ও সহযোগিতাকে স্বাগত জানাবে।

পররাষ্ট্রনীতির চূড়ান্ত লক্ষ্য একটি শান্তিপূর্ণ, স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা, যা আঞ্চলিক সম্প্রীতি ও বৈশ্বিক সহযোগিতায় ভূমিকা রাখবে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলাসহ বিভিন্ন বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সম্মিলিত উদ্যোগেও বাংলাদেশ ভূমিকা রাখতে চায় বলে জানান তিনি।

তিতুমীর বলেন, বাংলাদেশ নিজেকে একটি নির্ভরযোগ্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক আন্তর্জাতিক অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়—যে দেশ নিজের জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেবে, আবার একই সঙ্গে অন্য দেশের স্বার্থ ও মর্যাদার প্রতিও সম্মান দেখাবে।