বাসস
  ১৩ আগস্ট ২০২৬, ১৫:৫১

জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে সম্মিলিত অর্জন হিসেবে বিবেচনা করা উচিত: ছাত্রদল নেতা অনীক

ওয়াসিম আহমেদ অনীক। ছবি: বাসস

মাহ আলম 

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, ১৩ আগস্ট, ২০২৬ (বাসস): বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সদস্য সচিব ওয়াসিম আহমেদ অনীক বলেছেন, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর সম্পত্তি হিসেবে না দেখে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের একটি সম্মিলিত অর্জন হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান প্রাথমিকভাবে একটি ছাত্র আন্দোলন হিসেবে শুরু হলেও পরবর্তীতে এটি বৃহত্তর রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নেয়, যেখানে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ অংশ নিয়েছিল। কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের এই আন্দোলনের একক মালিকানা দাবি করা উচিত নয়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো সাধারণ মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণের মধ্যে এর বৃহত্তর তাৎপর্য নিহিত রয়েছে।

সম্প্রতি রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন। 

ওয়াসিম আহমেদ অনীক আশা প্রকাশ করেন, গণতন্ত্র, আইনের শাসন, জবাবদিহিতা ও অর্থবহ সংস্কারের ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশ একটি রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাবে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্মরণ করে অনীক বলেন, ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তাদের কর্মীদের নির্দেশ দিয়েছিলেন যেন আন্দোলনের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা না করে শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবির প্রতি সমর্থন জানানো হয়।

তিনি বলেন, সাধারণ শিক্ষার্থীদের সামনের সারিতে থাকতে উৎসাহিত করা হয়েছিল, অন্যদিকে রাজনৈতিক কর্মীরা প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে পেছন থেকে কাজ করেছিলেন। আমরা কখনোই আন্দোলনের নেতৃত্ব নেওয়ার চেষ্টা করিনি। সাধারণ শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ করে দিয়ে আমরা প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা দেওয়ার জন্য কাজ করেছি।

তার তথ্যমতে, তিনিসহ দলের নেতাকর্মীরা সমন্বয়, লজিস্টিকস ও যোগাযোগ করে আন্দোলন চাঙা রাখতে ভূমিকা রেখেছিলেন। তারা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের শিক্ষার্থীদেরও বিক্ষোভে নিয়ে আসেন।

সাভারের রেডিও কলোনি, বাসস্ট্যান্ড ও শিমুলতলীসহ বেশ কয়েকটি স্থানে টিয়ার গ্যাস ও গুলির মুখোমুখি হওয়ার কথা স্মরণ করেন অনীক। তিনি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আব্দুল কাইয়ুমের মৃত্যুকে এই অভ্যুত্থানের অন্যতম বেদনাদায়ক মুহূর্ত হিসেবে বর্ণনা করেন।

তিনি বলেন, আমি মাত্র কয়েক মিনিট আগে ওই স্থানে ছিলাম। ভুক্তভোগীদের মধ্যে আমিও একজন হতে পারতাম।

তিনি জানান, আন্দোলনের সময় গ্রেফতারের ভয়ও কর্মীদের মধ্যকার যোগাযোগকে প্রভাবিত করেছিল। তারা প্রায়শই মোবাইল ফোনের ব্যবহার সীমিত রাখতেন এবং কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য সরাসরি যোগাযোগ ও নির্ধারিত মিলনস্থলের ওপর নির্ভর করতেন।

আন্দোলনের সময় শিক্ষক ও সাংবাদিকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের কৃতিত্ব দেন অনীক। তিনি বলেন, শিক্ষকরা যখন শিক্ষার্থীদের নৈতিক সমর্থন দিয়েছেন, তখন সাংবাদিকরা ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও প্রতিবেদন তৈরি করে গেছেন।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে অনীকের অভিযোগ, সংকটের সময় শিক্ষার্থীদের পর্যাপ্ত সুরক্ষা দিতে প্রশাসন ব্যর্থ হয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, যেকোনো জবাবদিহি প্রক্রিয়া নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতে হওয়া উচিত।

নিজের রাজনৈতিক যাত্রা সম্পর্কে অনীক বলেন, স্কুল জীবনে যখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস ও বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শ সম্পর্কে জানতে শুরু করেন, তখন থেকেই জাতীয়তাবাদী রাজনীতির প্রতি তার আগ্রহ তৈরি হয়।

তিনি বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শন তাকে বিশেষভাবে আকর্ষণ করেছিল, পাশাপাশি সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন ও সংগ্রামও তার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করেছিল।

অনীক বলেন, আমি অনুভব করেছি বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ আমার নিজস্ব চিন্তাভাবনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং এটি দেশ, সমাজ ও মানুষের জন্য কাজ করার একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে পারে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র রাজনীতিতেসম্পৃক্ততার কথা তুলে ধরে অনীক জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তিনি প্রথম বর্ষের প্রতিনিধি এবং দর্শন বিভাগ ছাত্র সংসদের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। 

পরবর্তীতে তিনি সক্রিয়ভাবে ছাত্রদলের রাজনীতির সাথে যুক্ত হন।

শুধু ছাত্র রাজনীতিই নয়, রোভার স্কাউট, নৈতিকতা-সম্পর্কিত কার্যক্রম এবং অন্যান্য গঠনমূলক কর্মসূচিতেও অংশ নিয়েছেন বলেন জানান অনীক। 

এই ছাত্রনেতা মনে করেন, ছাত্রনেতাদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার পাশাপাশি একাডেমিক, সামাজিক ও সহ-শিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে তাদের নেতৃত্ব ও ব্যক্তিগত দক্ষতা বিকাশ করা উচিত।

নিজের ওপর নেমে আসা রাজনৈতিক নিপীড়নের কথা স্মরণ করে অনীক বলেন, ২০১০-এর দশকের শুরুর দিকে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে বিরোধীদলীয় ছাত্র কর্মীরা চাপ, ভীতি প্রদর্শন এবং হুমকির সম্মুখীন হয়েছিলেন।

অনীক জানান, ২০১২ সালে শহীদ রফিক-জব্বার হল ছাত্রদলের কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক হওয়ার আগে তিনি প্রায় আট মাস ওই হলে অবস্থান করেছিলেন। শারীরিক নির্যাতন, প্রকাশ্য অপমান এবং মানসিক চাপের হুমকির কারণে শেষ পর্যন্ত তার পক্ষে হলে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ে।

তিনি বলেন, আবাসিক হল ত্যাগ করার কারণে আমার একাডেমিক জীবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। 

কারণ আমি স্বাভাবিক পরিবেশে নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত হতে পারছিলাম না বা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুযোগ-সুবিধাও নিতে পারিনি।  

ফৌজদারি মামলা ও কারাবাসের অভিজ্ঞতাও স্মরণ করেন অনীক। তিনি জানান, ২০১২ সালে বিশ্ববিদ্যালয়-সম্পর্কিত একটি ভাঙচুরের মামলায় ১৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয় এবং পরবর্তী সময়ে পুলিশ তার গ্রামের বাড়িতে গিয়ে খোঁজখবর নেয়। ২০১৫ সালের ১৯ জানুয়ারি তাকে গ্রেফতার করা হয় এবং প্রায় এক বছর কারাগারে ছিলেন।

অনীক বলেন, তার বিরুদ্ধে একটি বিস্ফোরক মামলা করা হয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-সম্পর্কিত একটি হত্যাচেষ্টা ও একটি ভাঙচুরের মামলাসহ আরও বেশ কয়েকটি মামলা দায়ের করা হয়েছিল। 

এই সময়টিকে তার জীবনের অন্যতম কঠিন পর্যায় হিসেবে বর্ণনা করে অনীক বলেন, এই মামলাগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল। রাজনৈতিক কার্ক্রমের জন্য তার পরিবারও চাপের মুখে পড়েছিল। তাদের গ্রামের বাড়িতে পুলিশের তল্লাশি এবং পারিবারিক সম্পত্তি নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী বিরোধও সৃষ্টি হয়েছিল।

নিজের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার আলোকে অনীক তরুণ রাজনৈতিক কর্মীদের সতর্ক থাকার এবং আবেগপ্রবণ হয়ে কোনো সিদ্ধান্ত না নেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, রাজনীতিতে অনেক ধরনের ফাঁদ থাকে। আপনি যদি একটিতে পা দেন, তাহেল আপনি এবং আপনার সংগঠনÑউভয়ই বিপদে পড়তে পারে। একবার আপনি সমস্যায় পড়লে সাংগঠনিক কার্যক্রম ব্যাহত হয় এবং রাজনৈতিক রূপকল্প সঠিকভাবে বিকশিত হতে পারে না।

তিনি ছাত্রনেতাদের নিজের ব্যক্তিগত উচ্চাকাক্সক্ষার চেয়ে সংগঠন ও দেশের স্বার্থকে উপরে রেখে মাথা ঠান্ডা রাখার, ধৈর্য ধারণ করার এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে গভীরভাবে চিন্তা করার পরামর্শ দেন।

নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে অনীক বলেন, ছাত্র রাজনীতি শেষ করার পর তিনি পেশাদার জীবনে প্রবেশের পরিকল্পনা করছেন। তবে দল থেকে কোনো সাংগঠনিক দায়িত্ব দেওয়া হলে তিনি তা পালন করতে প্রস্তুত থাকবেন।

তিনি গণতন্ত্র, আইনের শাসন, জবাবদিহিতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ওপর ভিত্তি করে একটি বাংলাদেশের প্রত্যাশা পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শিক্ষা দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নে প্রতিফলিত হওয়া উচিত।