শিরোনাম

মোশতাক আহমদ
ঢাকা, ৪ আগস্ট, ২০২৬ (বাসস) : জুলাই গণঅভ্যুত্থান কোনো একদিনের ঘটনা নয়; এটি দীর্ঘ ১৭ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামের পরিণতি বলে মন্তব্য করেছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু।
তিনি বলেন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দিকনির্দেশনায় দলের নেতাকর্মীরা পুরো সময় রাজপথে সক্রিয় ছিলেন এবং সেই ধারাবাহিক আন্দোলনের চূড়ান্ত রূপই ছিল জুলাই গণঅভ্যুত্থান।
আজ মঙ্গলবার সচিবালয়ে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।
মন্ত্রী বলেন, ‘জুলাই আমাদের জাতির একটি বিশাল অর্জন। কিন্তু জুলাই একদিনে সৃষ্টি হয়নি। এই অর্জনের জন্য আমাদের দীর্ঘ ১৭ বছর রাজপথে সংগ্রাম করতে হয়েছে। বিএনপির অসংখ্য নেতাকর্মী নির্যাতিত হয়েছেন, গুম হয়েছেন, কারাবরণ করেছেন, অনেকেই প্রাণ দিয়েছেন।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রিয় নেত্রী দেশমাতা বেগম খালেদা জিয়া দীর্ঘ সময় কারাবন্দি ছিলেন। আমাদের প্রিয় নেতা তারেক রহমান দীর্ঘদিন দেশের বাইরে থাকতে বাধ্য হন। কিন্তু তিনি লন্ডনে অবস্থান করেও আন্দোলনের রূপরেখা দিয়েছেন, আমাদের সাহস জুগিয়েছেন এবং প্রতিনিয়ত দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। তাঁর নির্দেশনায় আমরা সবসময় রাজপথে সরব ছিলাম।’
আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, প্রথম দিকে বিএনপির আন্দোলন ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারে অধীনে নির্বাচন ব্যবস্থা ও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে। পরে ছাত্রদের কোটা সংস্কার আন্দোলন ঠেকাতে ফ্যাসিস্ট সরকার যখন কঠোর অবস্থান নেয়, তখন আমাদের দলের নেতা-কর্মী ও সমর্থকরাও রাস্তায় নামে। এরপর পরিস্থিতি ধীরে ধীরে সর্বস্তরের মানুষের গণআন্দোলনে রূপ নেয়।
তিনি বলেন, ‘ছাত্রদের সঙ্গে সাধারণ মানুষ, কৃষক, শ্রমিকসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষ রাজপথে নেমে আসে।
সরকার চাইলে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টির সমাধান করতে পারত। কিন্তু তারা অনমনীয় অবস্থান নেয়। সেই একগুঁয়েমির কারণেই শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয় এবং ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন ঘটে।’
মন্ত্রী বলেন, গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। যারা এ আন্দোলনে জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাদের প্রতি জাতির গভীর শ্রদ্ধা রয়েছে।
শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনা এবং আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করে তিনি বলেন, তাদের আত্মত্যাগের কারণেই আমরা নতুন বাংলাদেশ গড়ার সুযোগ পেয়েছি।
গণঅভ্যুত্থানের পর অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জনগণ বিএনপির দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের মূল্যায়ন করেছে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জনগণ যে রায় দিয়েছে, তাতে স্পষ্ট হয়েছে যে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে বিএনপির ভূমিকার প্রতি জনগণের আস্থা রয়েছে। জনগণ বিএনপিকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে।
রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়ে কিছুটা হতাশা প্রকাশ করে মন্ত্রী বলেন, এত বড় একটি গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আশা করেছিলাম।
ভাষা, আচরণ এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের ক্ষেত্রে নতুন ধারা তৈরি হবে বলেও প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এখনও অনেক ক্ষেত্রে অশালীন ভাষা, ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অপমানের সংস্কৃতি দেখতে পাচ্ছি।
তিনি বলেন, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং ১৯৯০ সালের গণআন্দোলনের পর দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছিল। এবারও সেই প্রত্যাশা ছিল। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আরও সংযত, দায়িত্বশীল ও শালীন রাজনৈতিক আচরণের দৃষ্টান্ত স্থাপন করা উচিত। আমরা যদি একে অপরকে সম্মান করি, তাহলে জাতিও আমাদের সম্মান করবে।
নিজের রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি নিজ এলাকা রংপুর বিভাগের লালমনিরহাটে অবস্থান করছিলেন এবং সেখানকার আন্দোলন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন।
তিনি বলেন, লালমনিরহাটে একদিনেই ছয়জন শহীদ হন। এছাড়া জেলার যেসব মানুষ ঢাকায় গার্মেন্টস, রিকশা চালনোসহ বিভিন্ন পেশায় কর্মরত ছিলেন, তাদের মধ্যে আরও তিনজন শহীদ হন। সব মিলিয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে লালমনিরহাটের নয়জন মানুষ প্রাণ হারান।
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামের সময়ও লালমনিরহাটে অন্তত আরও ১৩ জন রাজনৈতিক কর্মী নিহত হয়েছেন।
ছাত্রদলের এক নেতার হত্যাকাণ্ডের স্মৃতিচারণ করে মন্ত্রী বলেন, ‘পাটগ্রামের ছাত্রদলের কর্মী নাসিরকে ২০১৩ সালে মিছিল চলাকালে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল। পরে তার অসহায় পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছিল বিএনপি। রাজনৈতিকভাবে সহযোগিতা করে তাদের জন্য একটি বাড়ি নির্মাণ করা হয়। সে সময় দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বিদেশে অবস্থান করেও পরিবারের জন্য সহায়তার ব্যবস্থা করেছিলেন।’
রাষ্ট্র সংস্কারের প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার কারণে রাষ্ট্রযন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন এখন সময়ের দাবি।
তিনি বলেন, একটি ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থা রাষ্ট্রযন্ত্রকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিকীকরণ, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল। এগুলো থেকে রাষ্ট্রকে বের করে আনতে হবে।
তিনি বলেন, বিএনপি অনেক আগে থেকেই রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা জাতির সামনে তুলে ধরেছিল। নির্বাচনের আগেই আমরা ৩১ দফা সংস্কার কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলাম। আমাদের চেয়ারম্যান তারেক রহমান বহু আগে থেকেই রাষ্ট্র পুনর্গঠনের এই চিন্তা করেছিলেন। আমরা দেশজুড়ে সভা-সমাবেশ, গণসংযোগ ও লিফলেট বিতরণের মাধ্যমে জনগণের কাছে সেই কর্মসূচি তুলে ধরেছি।
মন্ত্রী বলেন, জনগণের সমর্থন নিয়ে সরকার এখন সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। ৩১ দফা বাস্তবায়নে সরকার এবং দল- উভয়ই আন্তরিক। ধাপে ধাপে সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে। আমরা বিশ্বাস করি, একটি জবাবদিহিমূলক, গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গড়ে তুলতে এসব সংস্কার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান শুধু সরকার পরিবর্তনের ঘটনা নয়; এটি রাষ্ট্র ও সমাজকে নতুনভাবে গড়ে তোলার একটি ঐতিহাসিক সুযোগ। যারা জীবন দিয়েছেন এবং যারা আহত হয়েছেন, তাদের আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষা করতে হলে গণতন্ত্র, আইনের শাসন এবং জনগণের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। সরকার সেই লক্ষ্য নিয়েই কাজ করছে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, জাতীয় ঐক্য, সহনশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং ধারাবাহিক সংস্কার কার্যক্রমের মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে এগিয়ে যাবে। একই সঙ্গে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।