শিরোনাম

নারায়ণগঞ্জ, ১১ এপ্রিল, ২০২৬ (বাসস) : দীর্ঘ দেড় দশকের রাজনৈতিক সংগ্রাম আর গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লড়াই শেষে নতুন এক দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপি’র আহ্বায়ক অধ্যাপক মামুন মাহমুদ। তবে এবার রাজপথের আন্দোলন নয়, তার কাঁধে পড়েছে জেলা পরিষদের প্রশাসকের গুরু দায়িত্ব। দায়িত্ব নেয়ার স্বল্প সময়ের মধ্যেই তিনি হাত দিয়েছেন উন্নয়ন ও জনসেবার বহুমুখী কর্মপরিকল্পনায়। সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জের বর্তমান প্রেক্ষাপট, ভবিষ্যৎ উন্নয়ন এবং জেলা পরিষদের স্বচ্ছতা নিয়ে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার বাসস’র সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে নিজের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন তিনি।
উন্নয়নের অগ্রাধিকার: জনসম্পৃক্ততা ও সমন্বয়
জেলা পরিষদের মূল কর্মক্ষেত্র নিয়ে মামুন মাহমুদ বলেন, ‘জেলা পরিষদের কাজ মূলত উন্নয়ন এবং জনসেবামূলক। আমি দায়িত্ব নেয়ার আগেই একটি বাজেট প্রণীত হয়েছিল। তবে বর্তমান জন আকাঙ্ক্ষা এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের চাহিদাকে সমন্বয় করে আমি নতুন অগ্রাধিকার ঠিক করছি।’
তিনি জানান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে সরাসরি কাজ করার ব্যাপক সুযোগ এখানে রয়েছে। মেধাবী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদান থেকে শুরু করে মসজিদ-মাদ্রাসা, মন্দির ও শ্মশানের উন্নয়ন-সবকিছুই এখন তার অগ্রাধিকার তালিকায়।
চলমান প্রকল্পের তদারকি ও ‘অপ্রয়োজনীয়’ কাজ বাতিল :
দায়িত্ব নিয়েই কাজে স্বচ্ছতা ফেরাতে জোর দিয়েছেন এই প্রশাসক। তিনি জানান, বর্তমানে অনেকগুলো প্রকল্প চলমান আছে যার গুণগত মান ও গুরুত্ব পর্যালোচনা করা হচ্ছে। মামুন মাহমুদ স্পষ্ট করে বলেন, যেসব কাজ জনগুরুত্বহীন বা কম গুরুত্বপূর্ণ, সেগুলো আমরা প্রয়োজনে বাতিল করে দিচ্ছি।
ইতোমধ্যেই কিছু মানবিক কাজে জেলা পরিষদ সাড়া পাওয়া গেছে। এক অসহায় পরিবারের বেদখল হওয়া জমি উদ্ধার ও ঘর সংস্কারে সহায়তার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশেই আমরা অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছি। এমনকি দুরারোগ্য রোগীর চিকিৎসা সহায়তায়ও জেলা পরিষদ হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে।
দৃশ্যমান কিছু উন্নয়ন প্রকল্প:
জেলা পরিষদ প্রশাসক বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট প্রকল্পের তথ্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদের উদ্যোগে জনকল্যাণ ও জেলা অবকাঠামো উন্নয়নে বর্তমানে ২শতাধিক ছোট-বড় প্রকল্পের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। এই উন্নয়ন অগ্রযাত্রার অন্যতম বিশেষ দিক হলো সদর উপজেলার ফতুল্লায় প্রায় ৩০ লক্ষ টাকা ব্যয়ে একটি আধুনিক বিনোদন কেন্দ্র বা পার্ক নির্মাণ, যা স্থানীয়দের সুস্থ বিনোদনের সুযোগ তৈরি করবে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ ভবঘুরে ও বুদ্ধি প্রতিবন্ধী কেন্দ্রের আবাসস্থল সংস্কারে ২৫ লক্ষ টাকার প্রকল্প চলমান। প্রায় ৪০ লক্ষ টাকা ব্যয়ে সরকারি আশ্রয় কেন্দ্রের কার্যক্রম সংক্রান্ত প্রকল্প এবং গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায় আরসিসি ঢালাইয়ের কাজ চলছে। এসব বহুমুখী প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো প্রান্তিক পর্যায়ে নাগরিক সুবিধা পৌঁছে দেয়া এবং জনজীবনের মানোন্নয়ন নিশ্চিত করা।
অতীত সংগ্রাম ও আগামীর দিকনির্দেশনা:
বিগত সরকারের আমলের দীর্ঘ সংগ্রামের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদ প্রশাসক মামুন মাহমুদ আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, আমাদের সংগ্রাম ছিল জনগণের ভোটের অধিকার আদায়ের। এই লড়াইয়ে অসংখ্য নেতাকর্মী গুম-খুন ও কারাবন্দী হয়েছেন। আজ জনগণের রায়ে আমাদের দল রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে।
বাসস’র সঙ্গে সাক্ষাৎকারে তিনি আরও জানান, জেলা পরিষদের মর্যাদা বৃদ্ধি এবং প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী বৃক্ষরোপণ ও জেলা পরিষদের সক্ষমতা অনুযায়ী খাল খনন কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে।
শিক্ষা ও কর্মসংস্থান: শিক্ষকের চোখে পরিকল্পনা
দীর্ঘসময় শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন অধ্যাপক মামুন মাহমুদ। তিনি তরুণ প্রজন্ম ও শিক্ষা খাত নিয়ে বিশেষ পরিকল্পনা করছেন। তিনি মনে করেন, ঝরে পড়া রোধকল্পে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা উপকরণ ও আর্থিক সহযোগিতা প্রয়োজন। বেকারত্ব নিরসনে সরাসরি শিল্পকারখানা স্থাপন না করলেও শিল্পায়নের পরিবেশ তৈরির ওপর জোর দিচ্ছেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘আমি যদি একটি অবহেলিত জনপদে রাস্তা করে দেই, সেই রাস্তা ঘেষেই কলকারখানা গড়ে উঠবে। উন্নয়ন কাজের মাধ্যমে হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান ও ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।’
লক্ষ্য: এক বছরের ব্র্যান্ডিং
এক বছর পর জেলা পরিষদকে কোথায় নিয়ে যেতে চান-এমন প্রশ্নে মামুন মাহমুদের উত্তর ছিল আত্মবিশ্বাসে ভরপুর। তিনি বলেন, অতীতে জেলা পরিষদকে জনমুখী করা সম্ভব হয়নি। সাধারণ মানুষের ধারণা নেই এই প্রতিষ্ঠানটি কী কাজ করে।
আমি এই প্রতিষ্ঠানটির ব্র্যান্ডিং করতে চাই। মানুষ যেন মনে করে, যেকোনো প্রয়োজনে জেলা পরিষদে গেলে কাজ হবে।
সবশেষে নারায়ণগঞ্জের সাধারণ মানুষের উদ্দেশ্যে তার বার্তা-জেলা পরিষদ আপনাদের প্রতিষ্ঠান। যেকোনো প্রয়োজনে আপনারা এখানে আসুন, আমরা আপনাদের দ্বারে সেবা পৌঁছে দিতে বদ্ধপরিকর।