শিরোনাম

মোশতাক আহমদ
ঢাকা, ২১ মে, ২০২৬ (বাসস) : আসন্ন ঈদুল আযহাকে সামনে রেখে দেশের রেল ব্যবস্থা আরও যাত্রীবান্ধব ও আধুনিক করতে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সরকার।
ঈদযাত্রায় অতিরিক্ত যাত্রীর চাপ সামাল দিতে তাৎক্ষণিক টিকিট ব্যবস্থা, অতিরিক্ত কোচ সংযোজন, স্টেশনভিত্তিক যাত্রীসেবা সম্প্রসারণ, ওয়েটিং স্পেস বৃদ্ধি, ট্রেনের সময়সূচি সমন্বয় এবং লেভেল ক্রসিং আধুনিকায়নের মতো নানা পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব।
আজ সচিবালয়ে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)-কে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা জানান।
তিনি বলেন, সরকার রেলকে দেশের অন্যতম প্রধান গণপরিবহন ব্যবস্থায় রূপান্তর করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমরা রেলের সেবাকে আরও বিস্তৃত করতে চাই। ইতোমধ্যে ঢাকার আশেপাশে রেল কানেক্টিভিটি বাড়ানোর জন্য কাজ চলছে।
একই সঙ্গে লেভেল ক্রসিংগুলো আধুনিকায়নের কাজও আমরা করছি। যানজট কমাতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে আন্ডারপাস ও ওভারপাস নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর যাত্রীসেবা নিশ্চিত করতে সরকার রেলে ডিজিটাল সুবিধা সম্প্রসারণ করছে। অনেক ট্রেনে আমরা ইতোমধ্যে ওয়াইফাইয়ের মাধ্যমে ইন্টারনেট সেবা চালু করেছি। যাত্রীদের ভ্রমণকে আরও স্বাচ্ছন্দ্যময় করতে ধাপে ধাপে এই সুবিধা বাড়ানো হবে।
রেলমন্ত্রী জানান, ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-কক্সবাজার এবং ঢাকা-সিলেট রুটে যাত্রীসেবার মানোন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এসব রুটের স্টেশনগুলোতে যেখানে এখনও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সুবিধা নেই, সেখানে উন্নয়নকাজ দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, আমরা রেলকে তিনটি ধাপে পরিকল্পনা করছি, দীর্ঘমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। যদিও আমাদের সক্ষমতার কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। লোকোমোটিভ ও ক্যারেজের ঘাটতি আছে। তারপরও যেটুকু সম্পদ রয়েছে, তার সর্বোচ্চ ব্যবহার করে আমরা যাত্রীসেবা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছি।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, কোথাও কোনো ঘাটতি থাকলে তা চিহ্নিত করে দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। স্টেশনগুলোতে যাত্রীসেবা বাড়ানোর জন্য কাজ করছি। লেভেল ক্রসিং আধুনিকায়ন, আন্ডারপাস ও ওভারপাস নির্মাণ, সবকিছু মিলিয়ে আমরা রেলকে আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থায় রূপ দিতে চাই।
রেলে বেসরকারি বিনিয়োগের সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরে হাবিবুর রশিদ বলেন, নৌ, সড়ক ও বিমান খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ রয়েছে। কিন্তু রেলে এখনও তেমন বিনিয়োগ হয়নি।
তিনি বলেন, আমরা চাই রেলেও বেসরকারি বিনিয়োগ আসুক। কেউ যদি লোকোমোটিভ, ক্যারেজ বা অন্য কোনো খাতে বিনিয়োগ করতে চায়, সে সুযোগ তৈরি করার জন্য সরকার কাজ করছে।
ঈদযাত্রার প্রস্তুতি প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, চাহিদার তুলনায় লোকোমোটিভ ও কোচের ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। আমাদের প্রায় ৮৬ থেকে ৮৭টি লোকোমোটিভ নিয়মিত পরিচালনায় প্রয়োজন হয়। কিছু সময় প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে জটিলতা তৈরি হয়। তবে আমরা দ্রুত মেরামত করে সেগুলো পুনরায় সার্ভিসে আনার চেষ্টা করছি।
তিনি জানান, ঈদ উপলক্ষ্যে অতিরিক্ত যাত্রীসেবা দিতে ক্যারেজ ও ইঞ্জিন মেরামত করে সচল করা হচ্ছে। যেখানে কোচ সংকট রয়েছে, সেখানে অতিরিক্ত সাপোর্ট দেওয়া হচ্ছে। যাত্রীদের সুবিধার্থে বিভিন্ন স্টেশনে তথ্যসেবা জোরদার করা হয়েছে। কোনো ট্রেন দেরি করলে ম্যাসেজের মাধ্যমে যাত্রীদের আগেই জানিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ঈদের সময় অতিরিক্ত যাত্রী চাপ মোকাবিলার বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ঈদের আগের দিনগুলোতে হঠাৎ করে গার্মেন্টসসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে একসঙ্গে ছুটি শুরু হলে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়। তখন সব যাত্রীকে কাক্সিক্ষত সেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ চাহিদার তুলনায় আমাদের সক্ষমতা এখনও কম।
তিনি বলেন, আজকে সিদ্ধান্ত নিলেই আগামীকাল লোকোমোটিভ বা কোচ এনে ফেলা সম্ভব নয়। এগুলো সংগ্রহ করতে সময় লাগে। তবে সরকারের আন্তরিকতা রয়েছে এবং সক্ষমতা বাড়ানোর কাজ চলমান আছে।
তাৎক্ষণিক টিকিট ব্যবস্থা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ঈদ উপলক্ষ্যে রেলস্টেশনগুলোতে সীমিত পরিসরে তাৎক্ষণিক টিকিটের ব্যবস্থা রাখা হবে। যাতে জরুরি প্রয়োজনে যাত্রীরা শেষ মুহূর্তেও বৈধভাবে টিকিট সংগ্রহ করতে পারেন।
টিকিট কালোবাজারি রোধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, কমলাপুর রেলস্টেশনে বিনা টিকিটের যাত্রী যাতে প্রবেশ করতে না পারে, সে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
যাত্রীদের অপেক্ষার পরিবেশ উন্নত করা, ওয়াশরুমের মানোন্নয়ন এবং কালোবাজারি ঠেকাতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, স্টেশনগুলোতে ট্রলি সার্ভিস ঠিকঠাক করা হয়েছে। বয়স্ক ও অসুস্থ যাত্রীদের জন্য হুইলচেয়ারের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। আমাদের সক্ষমতার মধ্যে সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি।
বিমানবন্দর রেলস্টেশনের উন্নয়ন প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এয়ারপোর্ট এলাকায় এখন যাত্রীর চাপ অনেক বেড়েছে। উত্তরা একটি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় পরিণত হয়েছে। সেখানে গিয়ে আমরা দেখেছি যাত্রীদের জন্য পর্যাপ্ত অপেক্ষার ব্যবস্থা নেই। এজন্য নতুন একটি ছাউনি নির্মাণ করা হচ্ছে, যেটি ওয়েটিং রুমের মতো কাজ করবে। সেখানে অন্তত ২০০ যাত্রীর বসার ব্যবস্থা থাকবে।
তিনি জানান, প্রথম পর্যায়ে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট এবং বিমানবন্দর স্টেশনকে অগ্রাধিকার দিয়ে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। পরে পর্যায়ক্রমে সব বিভাগীয় শহর ও গুরুত্বপূর্ণ জংশন স্টেশনে অবকাঠামো ও যাত্রীসেবা উন্নয়ন করা হবে।
প্রতিবছর ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয়ের বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ব্রডগেজ ও মিটারগেজ লাইনের সংযোগস্থলে প্রযুক্তিগত জটিলতার কারণে সময়ক্ষেপণ হয়। ঢাকা-সিলেট রুট পরিদর্শনের সময় আমি কয়েকটি স্টেশনে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছি। প্রয়োজন হলে নতুন করে সময়সূচি সমন্বয় করা হবে, যাতে ট্রেনের বিলম্ব কমানো যায়।
অতিরিক্ত কোচ সংযোজনের বিষয়ে তিনি বলেন, আমাদের যতটুকু সক্ষমতা রয়েছে, সেই অনুযায়ী অতিরিক্ত কোচ সংযোজন করা হবে। কিছু ক্ষেত্রে স্ট্যান্ডিং টিকিটও দেওয়া হবে। কারণ চাহিদা অনেক বেশি। আমাদের কাছে হয়ত ৩ শতাংশ সক্ষমতা আছে, কিন্তু চাহিদা ১০ শতাংশেরও বেশি।
সরকারের বৃহত্তর পরিবহন পরিকল্পনার প্রসঙ্গ টেনে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকার সড়ক, নৌ ও রেলের সমন্বিত উন্নয়নে কাজ করছে। যেমন সড়কপথে এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, জিপিএসের মাধ্যমে যানবাহন মনিটরিং এবং ইলেকট্রিক যানবাহন চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, তেমনি রেলেও প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক সেবা নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।
তিনি বলেন, রেলকে আরও কার্যকর ও আধুনিক করতে সময় প্রয়োজন। তবে প্রতিটি পরিকল্পনাই বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সরকার আন্তরিকভাবে চায় রেল দেশের মানুষের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য গণপরিবহন হয়ে উঠুক।