বাসস
  ২৫ মার্চ ২০২৬, ২১:২৬
আপডেট : ২৫ মার্চ ২০২৬, ২১:৪৭

জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণাটিই ছিল মুক্তিযুদ্ধের ডাক : ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু

বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)-কে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। ছবি : বাসস

রুমানা জামান

ঢাকা, ২৫ মার্চ, ২০২৬ (বাসস) : বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, ‘শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণাটিই ছিল মূলত মুক্তিযুদ্ধের ডাক। এই ডাকে দেশজুড়ে জনযুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। 

যেখানে কৃষক, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ এক সুতায় গেঁথে গিয়েছিল।’

আজ বুধবার দুপুরে সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)-কে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু এসব কথা বলেন। এসময় তিনি ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ পূর্ববর্তী সময়ে দেশের চরম অনিশ্চয়তার মুহূর্তে জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণার তাৎপর্য তুলে ধরেন।

২৫ মার্চের বিভীষিকাময় রাতের স্মৃতিচারণ করে রণাঙ্গনের এই মুক্তিযোদ্ধা বলেন, ‘১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাত্রে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী অপারেশন সার্চলাইটের নামে ঢাকাসহ সারাদেশে নারকীয় গণহত্যা শুরু করে। তখন পুরো ঢাকা শহর যেন মুহূর্তেই এক বিশাল গোরস্তানে পরিণত হয়েছিল।’

তিনি বলেন, ‘সাধারণ মানুষের মধ্যে এক চরম আতঙ্ক ও দিশেহারা ভাব তৈরি হয়। এসময় তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃত্বের একটি বড় অংশ নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছিলেন। অনেকে গা ঢাকা দিয়ে দেশ ছেড়েছেন। 

প্রাণের ভয়ে এবং যুদ্ধের প্রস্তুতির জন্য তখন মানুষ শহর ছেড়ে পায়ে হেঁটে অজানার উদ্দেশ্যে রওনা দিচ্ছে। 

আমিও রওনা হই তাদের সঙ্গে। ঠিক তেমনি এক মুহূর্তে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির মাঝে নরসিংদীর পথে হাঁটার সময় একটি ট্রানজিস্টারকে ঘিরে তৈরি হয় এক ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণ।’

তিনি আরও বলেন, ‘একটি চায়ের দোকানে সাধারণ মানুষ যখন রুদ্ধশ্বাসে রেডিওর সামনে হুমড়ি খেয়ে পড়ল। 

জাতির চরম হতাশা আর অনিশ্চিত সময়ে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে ভেসে আসা একটি কণ্ঠস্বর পাল্টে দিয়েছিল পুরো দৃশ্যপট। সেই কণ্ঠ ছিল শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা। 

চারিদিকে রইরই পড়ে গেল— বাঙালি সৈনিক জিয়া স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন। সেই অস্পষ্ট কিন্তু দৃঢ় আওয়াজ মানুষের কানে পৌঁছামাত্রই যেন এক জাদুকরী পরিবর্তন ঘটে গেল।’

ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু সেই মুহূর্তের অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন, ‘মেজর জিয়ার সেই কণ্ঠস্বর দিশেহারা মানুষের মধ্যে এক অসীম সাহসের সঞ্চার করেছিল। এর আগে মানুষের মধ্যে যে চরম হতাশা ছিল, যাদের নেতৃত্ব দেওয়ার কথা ছিল বা যাদের মানুষ ভোট দিয়েছিল, সেই দুর্দিনে তাদের কাউকে পাশে খুঁজে পাওয়া যায়নি। মানুষ যখন দেখল— তাদের পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ নেই, ঠিক তখনই জিয়াউর রহমানের এই ঘোষণা এক আলোকবর্তিকা হয়ে দেখা দেয়। সাধারণ মানুষের মধ্যে এক নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়।

মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করল যে, যেহেতু বাঙালি সেনারা বিদ্রোহ করেছে এবং যুদ্ধে নেমেছে, তাই এবার পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বর্বরতার মোকাবিলা করা সম্ভব হবে। এই লড়াই হবে সমানে সমানে। তখন থেকেই আমরা নেমে পড়লাম যুদ্ধে।’

মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘ ৫৫ বছরের ইতিহাসে জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণাকে অস্বীকার করার কোনো পথ নেই উল্লেখ করে ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, ‘বাংলাদেশের ইতিহাস যদি নিরপেক্ষভাবে লিখতে হয়, তবে জিয়াউর রহমানের এই ঘোষণা বাদ দিয়ে তা পূর্ণাঙ্গ হবে না। মানুষ যখন দেখল আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব— যাদের তারা ভোট দিয়েছিল, তারা ৭ কোটি মানুষকে বিপদের মুখে রেখে সীমান্ত পাড়ি দিয়েছে, তখন বন্দি মানুষের সামনে জিয়াউর রহমান আবির্ভূত হয়েছিলেন স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে। তার সেই ভাষণ কেবল একটি ঘোষণা ছিল না, তা ছিল প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে জ্বলে ওঠা এক একটি মশাল।’

ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জোর দিয়ে বলেন, ‘১৯৭১ সালের সেই যুদ্ধ কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের একচেটিয়া আধিপত্য ছিল না। এটি ছিল একটি খাঁটি জনযুদ্ধ। কামার, কুমোর, জেলে আর কৃষকের সন্তানরা তাদের জীবন বাজি রেখে এই যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল বলেই পাকিস্তান সেনাবাহিনী তাদের আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র নিয়েও বাঙালির অগ্রযাত্রাকে দমাতে পারেনি। দলের পরিচয় ছাপিয়ে সেই সময় বড় হয়ে উঠেছিল জাতীয় ঐক্য।’

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান একজন অকুতোভয় যোদ্ধা ছিলেন উল্লেখ করে বিএনপির এই জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, ‘জিয়াউর রহমানও ১৯৭১ সালের সেই জনযুদ্ধের একজন অকুতোভয় যোদ্ধা ছিলেন। তিনি শুধু কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে ঘোষণাই দেননি, বরং রণাঙ্গনে সম্মুখ সমরে লড়াই করেছেন।’

কমলপুরসহ বিভিন্ন রণাঙ্গনে তাঁর বীরত্ব আজও ইতিহাসের অংশ। ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু ব্যক্তিগতভাবে তাঁর অধীনে যুদ্ধ না করলেও তাঁর বীরত্বগাঁথা ও সমরকৌশল সম্পর্কে তিনি যুদ্ধ সময়েই মানুষের মুখে মুখে শুনেছেন বলে জানান।

জাতীয় সংকটের মুহূর্তে বারবার জিয়াউর রহমান জাতির সামনে ত্রাতা হিসেবে হাজির হয়েছিলেন দাবি করে ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, ‘জিয়াউর রহমান ছিলেন ইতিহাসের সেই নায়ক—যিনি বারবার জাতীয় সংকটের মুহূর্তে ত্রাতা হিসেবে হাজির হয়েছেন। ১৯৭১ সালের সেই ঘোষণা যেমন জাতিকে দিশা দিয়েছিল, তেমনি ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের সিপাহী-জনতার বিপ্লব তাঁকে আবারও জনগণের আস্থার জায়গায় প্রতিষ্ঠিত করেছিল। জিয়াউর রহমানের উত্থান ছিল মূলত ইতিহাসের এক অনিবার্য প্রয়োজন। তাই নতুন প্রজন্মের কাছে সত্য ইতিহাস তুলে ধরা আজ সময়ের দাবি। পক্ষপাতহীনভাবে যদি ইতিহাসের পাতা ওলটানো হয়, তবে দেখা যাবে জিয়াউর রহমানের সেই ঘোষণা ও রণাঙ্গনের লড়াই ছাড়া বাংলাদেশের স্বাধীনতার পূর্ণাঙ্গ চিত্র আঁকা অসম্ভব।’

বিগত বছরগুলোতে জিয়াউর রহমানের এই অবদানকে যেভাবে অস্বীকার করার চেষ্টা করা হয়েছে তা এক কলঙ্কিত অধ্যায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘শেখ হাসিনার সরকার মুক্তিযুদ্ধকে নিজের দলের সম্পদে পরিণত করতে গিয়ে ইতিহাসকে যেভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে, তা ৫৫ বছরের ইতিহাসে বড় একটি ক্ষতি। মুক্তিযুদ্ধের যার যা ভূমিকা ছিল, তাকে সেই প্রাপ্য মর্যাদা না দেওয়াটা চরম অকৃতজ্ঞতা। এ কারণেই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিতর্ক হয়, তখন সেটি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য চরম রক্তক্ষরণের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই বিএনপি কখনোই মুক্তিযুদ্ধকে কোনো নির্দিষ্ট দলের সম্পদ মনে করে না; এটি ছিল একটি সর্বজনীন যুদ্ধ।’