বাসস
  ০৯ মার্চ ২০২৬, ০৯:২৬
আপডেট : ০৯ মার্চ ২০২৬, ১৮:৫০

সংকোচ নয়, দায়িত্ববোধ গড়ে তুলতে যৌন সচেতনতা প্রয়োজন : ডা. নুসরাত জাহান দৃষ্টি

ডা. নুসরাত জাহান দৃষ্টি। ছবি: বাসস

রাইদা কাইয়ূম

ঢাকা, ৯ মার্চ, ২০২৬ (বাসস): হাল-আমলের অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে কোনো দিক থেকেই পিছিয়ে নেই বাংলাদেশ। হাতে হাতে মুঠোফোন, ঘরে ঘরে ডিজিটাল বিপ্লব নীরবে বিস্তৃত হচ্ছে। তবুও যৌন স্বাস্থ্যের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ও জরুরি বিষয় নিয়ে খোলামেলা কথা বলা এখনো অনেকের কাছে অস্বস্তিকর, লজ্জাজনক কিংবা সংকোচের। দিনশেষে এই নিরবতার কারণে দেশের অসংখ্য মানুষ ভুল তথ্য ও কুসংস্কারের ফাঁদে পড়ে চরম স্বাস্থ্যঝুঁকির শিকার হচ্ছেন।

সমাজে যৌনতা নিয়ে কথা বলা এখনো অনেকটা নিষিদ্ধের মতো, অথচ বিজ্ঞানভিত্তিক ও সম্মানজনক ভাষায় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেই যৌনশিক্ষা ছড়িয়ে দেওয়া গেলে মানুষ নিজের শরীর, সম্পর্ক ও স্বাস্থ্যের বিষয়ে আরো সচেতন ও দায়িত্বশীল হতে পারে— ঠিক এই বিশ্বাস থেকেই সংবেদনশীল বিষয়টিতে সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য বিগত প্রায় ছয় বছরের বেশি সময় ধরে আন্দোলন করছেন চর্ম ও যৌনরোগ বিশেষজ্ঞ, ক্লিনিক্যাল কাউন্সেলর এবং যৌনশিক্ষা শিক্ষাবিদ ডা. নুসরাত জাহান দৃষ্টি।

ডা. নুসরাত জাহান দৃষ্টি। ছবি: বাসস

দিনাজপুরের পার্বতীপুরে কৃষি গবেষক বাবা ও নারী উদ্যোক্তা মায়ের ঘরে জন্ম ড. নুসরাত জাহান দৃষ্টির। এমবিবিএস করেছেন সিবিএমসিবি, ময়মনসিংহ থেকে। সেইসঙ্গে, আয়ারল্যান্ডের রয়েল কলেজ অব ফিজিশিয়ান থেকে ডিপ্লোমা ইন ডার্মাটোলজি; জে এস এস, মাইসুর, ইন্ডিয়া থেকে সাইকোসেক্সুয়াল মেডিসিন নিয়ে ফেলোশিপ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা বিভাগ থেকে অর্জন করেছেন মাস্টার্স ইন ক্লিনিক্যাল সোশ্যাল ওয়ার্ক ডিগ্রিও।

সমাজে যৌনস্বাস্থ্য নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা দূর করার লক্ষ্যেই তিনি বই লিখেছেন এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নিয়মিত সচেতনতামূলক কনটেন্ট তৈরি করছেন। তার ইউটিউব চ্যানেল ‘সেক্সএডু উইথ ড. দৃষ্টি’ ইতোমধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে এবং ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ইউটিউবের সিলভার প্লে বাটন অর্জন করেছে। আন্তর্জাতিক নারী দিবসের এই দিনে তার সাহস, সংগ্রাম এবং স্বপ্নের গল্প অনুপ্রেরণার এক উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে। বাসস-এর সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় তিনি শুনিয়েছেন তার অদম্য ইচ্ছাশক্তি দিয়ে বাধাকে ভাঙার আর সংকোচকে শিক্ষা ও সচেতনতার পথ দেখানোর গল্প—

জীবনের ঠিক কোন গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত আপনাকে এ রকম একটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য ভাবতে বাধ্য করেছিল?

ড. দৃষ্টি : কোভিড-১৯ চলাকালীন যখন বহির্বিভাগে চিকিৎসা সেবা ও পরামর্শ দিয়েছিলাম, তখন একদিন প্রায় ৮৫ ছুঁইছুঁই এক প্রবীণ ব্যক্তি তার যৌনস্বাস্থ্য সমস্যার জন্য আমার কাছে এসেছিলেন। প্রথমে খুবই অবাক হয়েছিলাম, যে সময়টাতে সাধারণ মানুষ ঘরের বাইরে আসতে ভয় পাচ্ছে, সেই সময়টাতে তিনি যৌনরোগের চিকিৎসাসেবা নিতে হাসপাতালে এসেছিলেন; এটিই প্রমাণ করে যে অন্যান্য যেকোনো শারীরিক অসুস্থতার থেকে এটি কোনো অংশেই কম গুরুত্বপূর্ণ নয়, এ সংক্রান্ত যেকোনো সমস্যা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চিকিৎসা সেবা পাওয়ার যোগ্য। অবাক হয়েছিলাম যে, যৌনস্বাস্থ্য যে আমাদের জীবনেরই একটি অংশ, সেটি তার মতো বয়স্ক একজন মানুষ উপলব্ধি করতে পেরেছে, যেটা আমাদের দেশের অনেক তরুণ-তরুণী সারাজীবনেও উপলব্ধি করতে পারেন না।

যৌনস্বাস্থ্য সম্পর্কে খোলাখুলি কথা বলার সময় আপনি কি কোনো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছিলেন?

ড. দৃষ্টি : প্রথম দিকে উচ্চ ও নিম্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারী থেকে শুরু করে, শিক্ষক, সহকর্মী, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব— সকল ক্ষেত্রেই নেতিবাচক মন্তব্যের শিকার হয়েছি। চাকরি ছাড়তে এমনকি চেম্বারে প্র্যাকটিস বন্ধ করতে বলা হয়েছিল। বিভিন্ন পরিচয়ে অনেকে হুমকিও দিয়েছিলেন। তাই, একটা পর্যায়ে দেশ ছাড়ার পরিকল্পনা করেছিলাম। পরবর্তীতে মনে হয়েছে, আমাকে দেশ ও দেশের মানুষের জন্য ভালো কিছু করতে হবে, তা যতই কষ্টের হোক না কেন। আল্লাহর প্রতি আমি কৃতজ্ঞ যে, আমার পরিবার ও শুভাকাঙ্ক্ষীগণের সহযোগিতা ও ভালোবাসায় আজ আমি এখানে পৌঁছেছি।

যৌনস্বাস্থ্য সম্পর্কে মানুষের সবচেয়ে সাধারণ ভুল ধারণাগুলো কী কী?

ড. দৃষ্টি : যৌনস্বাস্থ্য সম্পর্কে মানুষের সবচেয়ে বড় চারটি ভুল ধারণা হলো— যৌনস্বাস্থ্য শুধু সহবাস বা শারীরিক সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, যৌনস্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলা লজ্জার বিষয় বা পাপ, যৌনস্বাস্থ্য সম্পর্কিত সমস্যা তেমন কোনো গুরুতর সমস্যার বিষয় নয় এবং যৌনস্বাস্থ্য সমস্যা নিজে থেকেই ঠিক হয়ে যায়। দুঃখজনকভাবে এর সবগুলোই ভুল।

ভুল তথ্য এবং লজ্জা বিশেষ করে নারীদের স্বাস্থ্যকে কীভাবে প্রভাবিত করে?

ড. দৃষ্টি : ভুল তথ্য ও সামাজিক লজ্জা নারীদের সময়মতো সঠিক চিকিৎসা নিতে বাধা দেয়। ফলে আজ যে সমস্যাটি ছোট তা কাল একটি বড় রোগে পরিণত হয়।

এমন কিছু স্বাস্থ্যকর অভ্যাসে কথা বলুন যা নারীদের অবশ্যই অনুশীলন করা উচিত।

ড. দৃষ্টি : নারীদের জন্য সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যকর অভ্যাস দুটি হলো— নিজের শরীরের বিষয়ে সচেতন থাকা, ও এ বিষয়ে সঠিক তথ্য জেনে সুস্বাস্থ্য বজায় রাখার জন্য যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া। যেমন, পরিস্কার পরিচ্ছন্ন থাকা, স্বাস্থ্যকর জীবন যাপন করা, শারীরিক যেকোনো পরিবর্তনের দিকে লক্ষ্য রাখা ও এরকম হলে সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়া।

মানুষ আপনাকে জিজ্ঞাসা করতে সবচেয়ে বেশি সংকোচ বোধ করে এমন প্রশ্ন কোনটি?

ড. দৃষ্টি : এমন একটি না, শত শত প্রশ্ন রয়েছে। তবে, সব প্রশ্নের একটি জায়গায় মিল রয়েছে তা হলো— কীভাবে ব্যক্তির যৌন স্বাস্থ্য সমস্যার জন্য পারিবারিক জীবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা পরবর্তীতে বিভিন্নভাবে তার জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

আপনার ইউটিউব চ্যানেলে কোন ভিডিওটিতে দর্শকের কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি প্রতিক্রিয়া পেয়েছেন?

ড. দৃষ্টি : আমার ইউটিউব চ্যানেলে সবচেয়ে বেশি প্রতিক্রিয়া পাওয়া ভিডিওটি ছিল ‘নারীর যৌন স্বাস্থ্য ও সচেতনতা’ নিয়ে করা একটি ভিডিও। সেটি দেখে দর্শকরা মন্তব্যে জানিয়েছেন, ভিডিওটি দেখার পর থেকে তারা এখন নিজেদের শারীরিক, মানসিক ও যৌনস্বাস্থ্য নিয়ে আগের তুলনায় অনেক বেশি সচেতনতা অনুভব করছেন, যা প্রমাণ করে যে— সঠিক শিক্ষা ও সচেতনতা সমাজে পরিবর্তন আনে। সেইসঙ্গে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার একে সহজে ছড়িয়ে দিতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও পালন করে।

অনলাইনে আপনি কি সমালোচনা বা নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার শিকার হয়েছেন? যদি হয়ে থাকেন তাহলে কীভাবে তা মোকাবিলা করেন?

ড. দৃষ্টি : অনলাইনে সমালোচনা ও প্রতিক্রিয়াকে আমি মনে করি আমার চলার পথের জন্য অমূল্য শিক্ষা। ডিজিটাল যুগের কল্যাণে এ ধরনের দরকারি শিক্ষা সহজলভ্য হলেও অনেকে এটার গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারেননি, খুব সহজে কটাক্ষ বা একটি বিদ্রুপাত্মক মন্তব্য করে বসেন। আমি চেষ্টা করি গঠনমূলক সমালোচনাকে গুরুত্ব দিতে এবং ভুল তথ্য থাকলে তা সংশোধন করতে। অযৌক্তিক মন্তব্য এড়িয়ে চলি, ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে নতুন করে কাজ করার প্রেরণা গ্রহণ করি।

দেশের স্কুলগুলোতে যৌনস্বাস্থ্য শিক্ষা চালু হলে প্রথমেই কোন তিনটি বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা উচিত বলে আপনি মনে করেন?

ড. দৃষ্টি : বাংলাদেশের স্কুলে যৌন শিক্ষা চালু হলে প্রথমে শরীর ও প্রজনন স্বাস্থ্য, সীমা ও সম্মতি শেখা, এবং নিরাপদ সম্পর্ক ও যৌনতা নিয়ে সঠিক তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা উচিত বলে আমি মনে করি। এটি কেবল জ্ঞান দেয় না, বরং শিক্ষার্থীদের নিজের শরীর ও অনুভূতির প্রতি সম্মান শেখায়। সঠিক শিক্ষা ভবিষ্যতের নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য নিশ্চিত করে। যৌনতা নিয়ে অজানা ভয় ও কৌতূহল কমায়। সমাজে সচেতন, সুরক্ষিত, এবং আত্মবিশ্বাসী যুব সমাজ গঠনে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

যেসব কিশোর-কিশোরী বা তরুণ-তরুণী এ সম্পর্কে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে লজ্জাবোধ করে তাদের আপনি কী পরামর্শ দেবেন?

ড. দৃষ্টি : লজ্জা না পেয়ে বিশ্বস্ত উৎস থেকে তথ্য নেওয়া খুবই জরুরি। আপনার প্রশ্নগুলো নিরাপদ পরিবেশে, বিশ্বাসযোগ্য উৎস বা স্বাস্থ্যকর্মীর কাছে করুন, পরিবারের কাছে প্রশ্ন করুন। পরিবারের সদস্যদের বলবো— লজ্জা ভেঙে সচেতনতা তৈরি করতে এগিয়ে আসুন। সচেতনতাই সুরক্ষা ও আত্মবিশ্বাস বাড়ায়, লজ্জা নয়।

আপনার পরবর্তী লক্ষ্য কী?

ড. দৃষ্টি : আমার পরবর্তী লক্ষ্য হলো— বাংলাদেশের প্রতিটি পরিবারের কাছে বই, ডিজিটাল শিক্ষা এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রোগ্রামের মাধ্যমে জ্ঞান পৌঁছে দেওয়া। আমি চাই প্রতিটি শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক নর-নারী সমানভাবে যৌনস্বাস্থ্য শিক্ষার সুযোগ পাক। আধুনিক প্রযুক্তির সময় ডিজিটাল সামগ্রী ব্যবহার করে আমরা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষকেও সংযোগ করতে পারি।

যৌনস্বাস্থ্য শিক্ষার ক্ষেত্রে আগামীতে আপনি বাংলাদেশে কী পরিবর্তন দেখতে চান?

ড. দৃষ্টি : আগামী ১০ বছরে বাংলাদেশের স্কুল-কলেজে নিরাপদ ও বিজ্ঞানভিত্তিক যৌন শিক্ষা বাধ্যতামূলক হবে, তরুণরা নিজেদের স্বাস্থ্য ও সীমা বোঝার ক্ষেত্রে সচেতন হবে, মিথ ও কুসংস্কার কমে সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে, লিঙ্গভিত্তিক সমতা ও সম্মানের ধারণা সব বয়সের মানুষের মধ্যে গড়ে উঠবে, লজ্জা বা ভুল ধারণা থেকে দেশের একজন মানুষও স্বাস্থ্য সেবা থেকে বঞ্চিত হবে না— এগুলো বাস্তবায়িত হতে দেখাই আমার স্বপ্ন।

আন্তর্জাতিক নারী দিবসে আপনি সকল নারীদের উদ্দেশ্যে কী বার্তা দিতে চান?

ড. দৃষ্টি : শক্তি, সাহস ও অদম্য সম্ভাবনার প্রতীক নারীদের প্রতি আমার আহ্বান— সকলে নিজের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও স্বপ্নকে সর্বদা অগ্রাধিকার দিন। একজন সচেতন নারী মা, বোন, স্ত্রী বা বন্ধুর ভূমিকায় থেকে শুধু নিজেকে নয়, পরিবার ও সমাজকে তথা একটি গোটা প্রজন্মকে সুস্থ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। তাই, আপনারা সচেতন হোন, অন্যদেরকেও সচেতন করার ব্যাপারে এগিয়ে আসুন।