শিরোনাম

।। নাজিউর রহমান সোহেল।।
ঢাকা, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : পানিসম্পদ মন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি এমপি বলেছেন, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ঐতিহাসিক খাল খনন কর্মসূচিকে একটি সামাজিক বিপ্লব ও আন্দোলনে রূপ দিতে দেশব্যাপী ব্যাপক কর্মযজ্ঞ শুরু করেছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন নব গঠিত সরকার।
তিনি বলেন, বিএনপি’র নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আগামী পাঁচ বছরে সারাদেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও জলাশয় পুনঃখননের এক মহাপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই মহাযজ্ঞের প্রথম ধাপে পাইলটিং কর্মসূচির আওতায় ১৮০ দিনের মধ্যে এক হাজার কিলোমিটার খালের খনন কাজ সম্পন্ন হবে। যা খুব দ্রুতই দৃশ্যমান হবে। প্রাথমিক সুফল পাবে মানুষ। কৃষি সমৃদ্ধি, মৎস্য সম্পদের উন্নয়ন এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সরকারের এই পদক্ষেপকে দেশের জলজ বাস্তুসংস্থানের জন্য নতুন এক মাইলফলক হিসেবে দেখছেন পানিসম্পদ মন্ত্রী।
সম্প্রতি বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা’কে (বাসস) দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব তথ্য জানিয়েছেন পানিসম্পদ মন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রীর নিজ দপ্তরে এই সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়।
সাক্ষাৎকারে তিনি সরকারের স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা, খাল খননে অবৈধ দখলদারিত্বের চ্যালেঞ্জ এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেন।
সাক্ষাৎকারের শুরুতেই পানিসম্পদ মন্ত্রী খাল খনন কর্মসূচিকে একটি বিপ্লব হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, ‘শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তাঁর জীবদ্দশায় এই কর্মসূচিটি শুরু করেছিলেন এবং জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে তা অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন কারণে এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হয়নি।’
তিনি আরো বলেন, ‘বর্তমান সরকার জনগণের নির্বাচিত সরকার। আমাদের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্বাচনী ইশতেহারে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে ক্যাটাগরিক্যালি বলেছেন যে, আমরা ২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও জলাশয় পুনঃখনন করব। এটি কেবল একটি সরকারি প্রকল্প নয়, এটি জনগণের বেঁচে থাকার লড়াই। বর্তমান সরকার জিয়াউর রহমানের সেই অসমাপ্ত কাজকে পূর্ণতা দিতে বদ্ধপরিকর।’
পানিসম্পদ মন্ত্রী জানান, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকার ১৮০ দিনের একটি ‘প্রায়োরিটি বেসিস’ অ্যাকশন প্ল্যান গ্রহণ করেছে। ইশতেহার অনুযায়ী সারা দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন কর্মসূচি বিএনপি সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার (টপ-প্রায়োরিটি)।
খাল খননের চলমান কার্যক্রম প্রসঙ্গে পানি সম্পদ মন্ত্রী বলেন, ‘ইতিমধ্যে খাল খনন কাজ শুরু করে দিয়েছি। মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, মাঠ পর্যায়ে তদারকি শুরু হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘ইতোমধ্যে আমরা ঢাকার কেরানীগঞ্জের শুভাঢ্যা, চুনকুটিয়া ও আটি জয়নগর খাল খননের কাজ পরিদর্শন করেছি। এখানে চলমান একটি প্রকল্পের মাধ্যমে পুরোদমে কাজ শুরু হয়েছে। এর বাইরে আমরা সিলেটের জৈন্তাপুর যাচ্ছি, সেখানে ৫-৬টি গুরুত্বপূর্ণ খাল খননের কাজ দেখা হবে। এরপর সুনামগঞ্জের হাওর অঞ্চলে বাঁধ ও জলাশয় সংস্কারের কাজগুলো দেখা হবে, যা বর্ষা মৌসুমে বন্যার হাত থেকে ফসল রক্ষায় অতি জরুরি।’
তিনি বলেন, ‘প্রাথমিক পর্যায়ে পাইলটিং প্রকল্পের আওতায় ১৮০ দিনে এক হাজার কিলোমিটার খাল খনন সম্পন্ন করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। পাইলটিং কর্মসূচি সম্পন্ন করার পর দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্পের কাজ ধরা হবে।
এজন্য আমরা একটি প্রকল্পের ডিপিপি প্রণয়ন করব। যার মাধ্যমে আমাদের মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে।’
‘খাল খনন বাস্তবায়নে প্রধান বাধাগুলো কী ?’- এমন প্রশ্নের জবাবে শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেন, ‘এটি একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ। আমরা দেখেছি অনেক জায়গায় খালগুলো ভরাট করে বাড়িঘর, মার্কেট ও বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। ময়লা-আবর্জনা ও বর্জ্য ফেলে খালের নাব্যতা পুরোপুরি নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। কোথাও কোথাও খালের ওপর বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ করা হচ্ছে। আমরা অত্যন্ত কঠোরভাবে বলছি, জনস্বার্থে এসব বাধা অপসারণ করা হবে। যেখানে যে পদক্ষেপ নেওয়া দরকার, সেখানেই তা নেওয়া হবে। এই মুহূর্তে মৃত খালগুলোকে উদ্ধার করে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনাই হচ্ছে বড় চ্যালেঞ্জ।’
এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি কৃষি, স্থানীয় সরকার এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় একযোগে কাজ করবে বলেও জানান পানিসম্পদ মন্ত্রী।
বৃক্ষরোপণ প্রসঙ্গে মন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেন, ‘খাল খননের সাথে সাথে পরিবেশ রক্ষায় আগামী ৫ বছরে পাঁচ কোটি বৃক্ষরোপণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিছু কাজ সরাসরি কায়িক শ্রমের (ম্যানুয়ালি) মাধ্যমে করা হবে। আর বড় কাজগুলো টেন্ডার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন করা হবে। ইতিমধ্যে নতুন একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্পের ডিপিপি প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত প্রভাব বিষয়ে সাক্ষাৎকারে মন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, ‘খালগুলো খনন হলে একদিকে যেমন জলাবদ্ধতা দূর হবে, অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে সেচের পানির সংস্থান হবে। এতে কৃষি উৎপাদন কয়েকগুণ বাড়বে। এছাড়া এই খালগুলোতে দেশীয় মাছের চাষ করা হবে, যা আমিষের চাহিদা মেটাবে। আমরা এমনভাবে কাজের সমন্বয় করছি— যাতে প্রতিটি নাগরিকের দোরগোড়ায় এই প্রকল্পের সুবিধা পৌঁছে যায়।’
তিনি সংশ্লিষ্ট সকল মন্ত্রণালয়কে দ্রুত কর্মপরিকল্পনা জমা দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘বর্তমান সরকার জনগণের নির্বাচিত সরকার। মানুষের জীবন-জীবিকা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য আমরা কাজ শুরু করেছি। এই মহা-আন্দোলনে আমি দেশের সাধারণ মানুষের পূর্ণ সহযোগিতা প্রত্যাশা করছি।’