বাসস
  ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২১:৩৬

জলাবদ্ধতা নিরসন, হাসপাতাল নির্মাণ ও মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের প্রতিশ্রুতি বিএনপি প্রার্থী তানভীর আহমেদের

ঢাকা-৪ আসনে বিএনপি প্রার্থী তানভীর আহমেদ। ফাইল ছবি

ঢাকা, ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৪ আসনে ধানের শীষ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রার্থী তানভীর আহমেদ। 

এলাকায় দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা, স্বাস্থ্যসেবার অভাব, মাদক ও সন্ত্রাসের বিস্তার এবং কর্মসংস্থানের সংকটকে এলাকার প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন তিনি।  

নির্বাচনে জয়ী হলে এসব সমস্যা সমাধানে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের পাশাপাশি সরকারি হাসপাতাল নির্মাণ, খাস জমি উদ্ধার, পাঠাগার স্থাপন এবং শিল্পকারখানা পুনরায় চালুর মাধ্যমে স্থানীয় যুবকদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তানভীর আহমেদ। 

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জাতীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ঢাকা-৪ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী তানভীর আহমেদ এই প্রতিশ্রুতির কথা জানান। 

ঢাকা-৪ আসনটি ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ৪৭, ৫১, ৫২, ৫৩, ৫৪, ৫৮, ৫৯, ৬০ ও ৬১ নং ওয়ার্ড এবং শ্যামপুর থানা, কদমতলী থানা নিয়ে গঠিত।

বাসস : নির্বাচনী এলাকার ভোটারদের জন্য আপনার প্রতিশ্রুতি কী?

তানভীর আহমেদ : ঢাকা-৪ আসনে দুইটি থানা এবং নয়টি ওয়ার্ড রয়েছে। মোট জনসংখ্যা কমপক্ষে ১০ লাখের কাছাকাছি। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে এই এলাকাটি ছিল যেন একেবারেই প্রত্যন্ত গ্রাম। বেগম খালেদা জিয়া এবং আমার বাবা সাবেক সংসদ সদস্য সালাউদ্দিন আহমেদ ১৯৯১ সালে এই এলাকাকে শহরে রূপান্তরের কাজ শুরু করেন। তবে ২০০৮ সালের নির্বাচনে এলাকা ভাগ হয়ে ঢাকা-৪ ও ঢাকা-৫ গঠিত হয়। বর্তমানে আমি ঢাকা-৪ আসনে বিএনপি থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছি।

তিনি বলেন, আমাদের এলাকার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো জলাবদ্ধতা। বিগত সরকারের আমলে হাজার হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ ও ব্যয় করা হলেও এলাকার মানুষ কোনো সুফল পায়নি। আমি মনে করি, এসব অর্থ মূলত লুটপাট হয়েছে; কোনো কার্যকর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়নি।

তানভীর আহমেদ বলেন, আমি নির্বাচিত হলে এই সকল সমস্যা সমাধানে একটি সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করবো। এই এলাকার একটি ছোট অংশের পানি বুড়িগঙ্গা নদীতে নিষ্কাশিত হয়, যা আমার বাড়ির পেছন দিয়েই প্রবাহিত। কিন্তু প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকার পানি নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ হয়ে শীতলক্ষ্যা নদীতে যায়। গত ২০ বছরে এলাকাটি অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে। অনেক জায়গায় রাস্তা পাকা করা হলেও ড্রেন নির্মাণ করা হয়নি। আবার কোথাও ড্রেন নির্মাণ করা হলেও একটির সঙ্গে আরেকটির সংযোগ নেই। কিছু জায়গায় ড্রেন যথেষ্ট প্রশস্ত নয়। খালগুলো সময়মতো পরিষ্কার না করায় অনেক জায়গায় খাল প্রায় ভরাট হয়ে গেছে। সম্প্রতি সেনাবাহিনী খাল পরিষ্কার করেছে, তবে খালের প্রশস্ততা আরও বাড়াতে হবে এবং দখল হওয়া অংশ উদ্ধার করতে হবে।

তিনি বলেন, সমন্বিত উদ্যোগের মূল বিষয় হলো- আমাদের এলাকার খাল ও ড্রেন পরিষ্কার থাকলেও নারায়ণগঞ্জ অংশে যদি তা পরিষ্কার না থাকে, তাহলে পানি আমাদের এলাকাতেই জমে থাকবে। এজন্য ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন, দুই সিটির মেয়র ও কাউন্সিলরবৃন্দ, ঢাকা ওয়াসা, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং সড়ক ও জনপদ নিয়ে একটি সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। সময়মতো সব খাল ও ড্রেন পরিষ্কার রাখা গেলে জলাবদ্ধতা অনেকাংশে কমে যাবে এবং দ্রুত পানি নিষ্কাশন হবে।

তানভীর আহমেদ আরও বলেন, আরেকটি বড় সমস্যা হলো-এই এলাকা মাদকের অভয়ারণ্য ও সন্ত্রাসী আখড়া হিসেবে পরিচিত হয়ে গেছে। বিগত সরকারের আমলে গুন্ডা ও কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতায় অনেক মানুষ নির্যাতিত হয়েছে, বিশেষ করে নারী ও কন্যাশিশুরা নানা হয়রানির শিকার হয়েছেন। এসবের পেছনে রাজনৈতিক নেতা, প্রভাবশালী ব্যক্তি বা পরিবারের মদদ রয়েছে। আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, নির্বাচিত হলে এসব ব্যক্তিকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হবে এবং সন্ত্রাস ও মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হবে।

বিএনপির এই প্রার্থী বলেন, পুরান ঢাকার মতো এলাকায় খেলার মাঠ, কমিউনিটি সেন্টার ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র থাকলেও আমাদের নয়টি ওয়ার্ডে কার্যকর কোনো স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র নেই। ৫৪ নম্বর ওয়ার্ডে একটি থাকলেও তা কার্যত অচল। গত ১৮ বছরে এখানে একটি সরকারি হাসপাতালও নির্মিত হয়নি। তাই আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, নির্বাচিত হলে সর্বপ্রথম একটি সরকারি হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করবো। এলাকায় প্রচুর খাস জমি রয়েছে। সেগুলো উদ্ধার করে খেলার মাঠ, কমিউনিটি সেন্টার অথবা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। কদমতলীতে একটি কবরস্থান এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি। পাশাপাশি এখানে সরকারি ঈদগাহ নির্মাণের দাবিও রয়েছে।

তিনি বলেন, এ এলাকায় আরেকটি বড় সমস্যা হলো গ্যাস সংকট। তিতাস গ্যাসের লাইনের জটিলতার কারণে মানুষ রান্না করতে পারছে না, অথচ নিয়মিত গ্যাস বিল দিতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ, এলপিজি ও জ্বালানি কাঠের অতিরিক্ত খরচে মানুষের জীবনযাত্রা ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। আমি ইতোমধ্যে তিতাস গ্যাসের এমডির সঙ্গে এলাকার মুরুব্বিদের নিয়ে বৈঠক করেছি। পুরোনো লাইনের সংস্কার ও মেইনটেন্যান্স জোরদার করার বিষয়ে তিনি আশ্বাস দিয়েছেন। আমি বিষয়টি তদারকির মধ্যে রাখব। এলাকায় কর্মসংস্থানের অভাব প্রকট। অনেক ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন থাকা সত্ত্বেও বর্তমানে অর্ধেকেরও কম শিল্পকারখানা চালু রয়েছে। বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় এলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে মালিক-শ্রমিক সমন্বয়ে শিল্পকারখানা পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে, যাতে স্থানীয় যুবকদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত হয়। 

নির্বাচিত হলে প্রতিটি এলাকায় একটি করে পাঠাগার নির্মাণ করা হবে জানিয়ে তানভীর আহমেদ বলেন, পাঠাগার শুধু জ্ঞানচর্চার স্থান নয়, বরং সাংস্কৃতিক, কারিগরি ও প্রযুক্তি প্রশিক্ষণের কেন্দ্র হবে। এতে কিশোররা মাদক ও গ্যাং কালচার থেকে দূরে থাকবে।

তিনি বলেন, পরিবেশ দূষণও আমাদের বড় সমস্যা। স্থানীয় মুন্সিখোলা এলাকায় খোলা ট্রাকে নির্মাণসামগ্রী পরিবহনের কারণে ব্যাপক পরিবেশ দূষণ হচ্ছে। আমি চাই, সরকারিভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে সব নির্মাণসামগ্রী কাভার্ড ভ্যানে পরিবহন বাধ্যতামূলক করা হোক। এই এলাকাটা আগে গ্রামের মতো ছিলো, তখন গাছপালা অনেক ছিলো কিন্তু বর্তমানে নাই। তাই সবুজায়নের জন্য বিনামূল্যে গাছের চারা বিতরণ ও ব্যাপক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে।

বাসস : নির্বাচনী আচারণবিধি পালনে নেতা-কর্মীদের প্রতি আপনার নির্দেশনা কী?

তানভীর আহমেদ : বহু বছরের লড়াই-সংগ্রাম শেষে এখন এমন একটি সুযোগ এসেছে, যেখানে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এই পরিস্থিতিতে আমাদের নৈতিক দায়িত্ব রয়েছে। একজন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী হিসেবে আমিও মনে করি, আমার নেতাকর্মীদের নির্বাচন আচরণবিধি সম্পর্কে জানানো আমার নৈতিক দায়িত্ব। আমরা ইতোমধ্যেই সে কাজটি করেছি। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করব, যাতে কোনোভাবেই কোনো ধরনের আচরণবিধি লঙ্ঘন না হয়।

বাসস : জুলাই সনদ বিষয়ক গণভোটে আপনার অবস্থান কী?

তানভীর আহমেদ : আমরা দীর্ঘ সময় ধরে লড়াই-সংগ্রাম করে আসছি। আমরা দেশের পরিবর্তন চাই। একজন তরুণ প্রার্থী হিসেবে এবং বিএনপির একজন কর্মী হিসেবে আমিও বিএনপির অবস্থানের সঙ্গে একমত। আমরা ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে কথা বলছি। আমরা চাই মানুষের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটুক। একই সঙ্গে আমরা এটাও চাই, যেন কোনোভাবেই মানুষের মনের ইচ্ছা প্রকাশে বাধা সৃষ্টি না হয়। বিএনপির নেতৃবৃন্দসহ আমরা সবাই দেশের মানুষের ইচ্ছার প্রতিফলন দেখতে চাই।

বাসস : আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে আপনার প্রত্যাশা কী?

তানভীর আহমেদ : একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন চাই, যার মাধ্যমে দেশের মানুষ তাদের পছন্দের প্রার্থীকে নির্বাচিত করে একটি দায়বদ্ধ সরকার প্রতিষ্ঠা করতে পারে। সেই দায়বদ্ধ সরকার যেন স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে, দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলে এবং দেশের অর্থনীতিকে নতুন করে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করায়। আমরা চাই বাংলাদেশের অগ্রগতি হোক, একটি সমৃদ্ধ ও পূর্ণাঙ্গ বাংলাদেশ গড়ে উঠুক এবং দেশের মানুষের জীবনে সত্যিকারের পরিবর্তন আসুক।

ঢাকা-৪ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৫৮ হাজার ৬৮৫ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৮৩ হাজার ৫০৯ জন, নারী ভোটার ১ লাখ ৭৫ হাজার ১৭১ জন, তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ৫ জন। পোস্টাল ব্যালট পেপারে ভোট প্রদানের জন্য নিবন্ধন করেছেন ৩ হাজার ৮২১ জন। আসনে ভোট কেন্দ্রের সংখ্যা ১১৫ টি। 

আসনটিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী অন্য প্রার্থীরা হলেন- বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী মোহাম্মদ ফিরোজ আলম (কাস্তে), স্বতন্ত্র প্রার্থী মোহাম্মদ মিজানুর রহমান (ফুটবল), জনতার দল প্রার্থী মো. আবুল কালাম আজাদ (কলম), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ প্রার্থী মো. জাকির হোসেন (মই), বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের (মুক্তিজোট) প্রার্থী সাহেল আহম্মেদ সোহেল (ছড়ি), বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সৈয়দ জয়নুল আবেদীন (দাঁড়িপাল্লা) ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী সৈয়দ মো. মোসাদ্দেক বিল্লাহ (হাতপাখা)।