বাসস
  ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩:০৮

বন্যা নিয়ে অনলাইন গুজব মোকাবিলায় চীন ও নেপালের ভিন্ন কৌশল

ঢাকা, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ (বাসস) : হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যার পর তথ্য প্রকাশ ও নিয়ন্ত্রণে ভিন্ন ভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে চীন ও নেপাল। 

এর ফলে এক হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটানো এই দুর্যোগ সম্পর্কে সাধারণ মানুষ কী তথ্য দেখতে ও জানতে পারছে- তা নিয়ে বড় ধরনের পার্থক্য তৈরি হয়েছে।

খবর বার্তা সংস্থা এএফপি’র।

গত ২৬ আগস্ট চীন-নেপাল সীমান্তে একটি হিমবাহ ও পাহাড় ধসে সুনামির মতো পানির ঢল, কাদা ও ধ্বংসাবশেষ নেমে আসে। এতে পাঁচ হাজার ৬৫০ জনের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছে, যাদের মধ্যে কয়েকশ বিদেশিও রয়েছে।

বন্যা নিয়ে ছড়ানো ভুয়া ও বানোয়াট পোস্টের বিরুদ্ধে চীন ও নেপাল- দুই দেশই ব্যবস্থা নিয়েছে।

তবে বেইজিং আরও কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ধারণ করা ভিডিও ছড়িয়ে পড়া ঠেকানো ও সরকারি হিসাব নিয়ে প্রশ্ন তোলা ব্যক্তিদের শাস্তি দেওয়ার মাধ্যমে চীন তথ্য নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। 

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, দেশটির এমন পদক্ষেপ অতীতের পরিচিত তথ্য-নিয়ন্ত্রণ নীতিরই ধারাবাহিকতা।

চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে বন্যা নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে নিখোঁজদের স্বজনদের বক্তব্য খুব কমই উঠে এসেছে। বরং তিব্বতে উদ্ধারকাজে নিয়োজিত কর্মীদের তৎপরতার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

তিব্বতে বিদেশি সাংবাদিকদের অবাধে ও স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ নেই।

অন্যদিকে নেপাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমগুলোকে বানোয়াট ছবি ও ভিডিও সরিয়ে নিতে চাপ দিয়েছে। এর মধ্যে এএফপির ফ্যাক্ট-চেকারদের যাচাইয়ে ভুয়া প্রমাণিত কিছু ছবিও রয়েছে। 

তবে কাঠমান্ডু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত মৃতের সংখ্যা প্রকাশ করছে। মৃতদের পরিবারের সদস্যদের সরাসরি বক্তব্যও অনলাইন ও অফলাইনে সহজেই পাওয়া যাচ্ছে।

নেপালের স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা প্রেস কাউন্সিল নেপালের চেয়ারম্যান উমেশ শ্রেষ্ঠ জানান, তারা ১০০টিরও বেশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্টকে ওই কনটেন্ট সরিয়ে নিতে বলেছে। অধিকাংশ অ্যাকাউন্টই তাদের নির্দেশ মেনে কনটেন্ট সরিয়ে নিয়েছে।

উমেশ বলেন, ‘বিষয়গুলো খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।’

ত্রাণ তহবিলে অনুদান দেওয়ার নামে একটি ভুয়া পোস্ট শেয়ার করে নিজের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট প্রচারের অভিযোগে নেপালি পুলিশ একজনকে গ্রেফতার করেছে।

আগের সরকার পতনের এক বছর পূর্তির ঠিক আগে এই দুর্যোগ ঘটে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে দুর্নীতিবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল, যার একপর্যায়ে আগের সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়।

চীনের জননিরাপত্তা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, অনলাইনে মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর অভিযোগে দেশটিতে ১০ জনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

তাদের মধ্যে এমন ব্যক্তিরাও রয়েছেন, যারা সরকারি হিসাবের চেয়ে প্রকৃত মৃতের সংখ্যা বেশি বলে দাবি করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অবশ্য দাবি করেছে, দুর্যোগ নিয়ে তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে ‘উন্মুক্ত, স্বচ্ছ ও সময়োপযোগী’ ভাবে। একই সঙ্গে তারা তথাকথিত ‘বিদ্বেষপূর্ণ অপপ্রচার ও চাঞ্চল্যকর প্রচারণার’ সমালোচনা করেছে।

এ ছাড়া চীন অল্পসংখ্যক বিদেশি সাংবাদিকের জন্য দুর্যোগের কেন্দ্রস্থল তিব্বত সফরেরও আয়োজন করেছে।

এএফপির ফ্যাক্ট-চেকাররা একাধিক ভাষায় বন্যা নিয়ে ছড়ানো কয়েক ডজন দাবিকে মিথ্যা বলে শনাক্ত করেছেন।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ও এক্সে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দাবি করা হয়েছিল, এতে বন্যার কারণ হয়ে দাঁড়ানো হিমবাহ ও পাহাড় ধসের দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। কিন্তু যাচাই করে দেখা যায়, ভিডিওটি তার কয়েক দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কার কলাম্বিয়া হিমবাহ এলাকায় ধারণ করা হয়েছিল।

গুগলের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি আরেকটি ভিডিওতে নদীর বাঁধ উপচে পানি রাস্তায় ঢুকে পড়ার দৃশ্য দেখানো হয়। ভিডিওটি অনলাইনে হাজার হাজার মানুষের প্রতিক্রিয়া পেয়েছে।

নেপালের অনুসন্ধানী সাংবাদিক এবং প্রেস কাউন্সিল নেপালের সদস্য রবি রাজ বারাল বলেন, ‘দুর্যোগের সময় মানুষের মধ্যে আতঙ্ক অনেক বেশি থাকে।’

তবে নেপাল ও চীন শুধু বানোয়াট তথ্যের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেয়নি; প্রকৃত ঘটনার ভিডিও শেয়ার করা কিছু পোস্টের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

নেপালের কর্তৃপক্ষ এআই-নির্মিত কনটেন্ট, ভয়াবহ দৃশ্যের ছবি ও ভুয়া ত্রাণ সহায়তার প্রচারণা দ্রুত সরিয়ে ফেলতে মেটা ও টিকটকের সঙ্গে আলোচনা করেছে।

ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্য শনাক্ত করতে এই দুই প্ল্যাটফর্মই এএফপিকে ফ্যাক্ট-চেকিংয়ের জন্য অর্থ দেয়।

নেপালের সীমান্তবর্তী গিয়রং বন্দরে ভয়াবহ পানির ঢল আছড়ে পড়ার দৃশ্য দেখানো একটি ভিডিও এএফপি যাচাই করে সত্য বলে নিশ্চিত করেছিল। কিন্তু চীনা ইন্টারনেট থেকে ওই ভিডিও ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ধারণ করা অন্যান্য অনেক ভিডিও পরে প্রায় সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে যায়।

এর পরিবর্তে ডুইন ও ওয়েইবোর মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উদ্ধার অভিযান নিয়ে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের ব্যাপক প্রতিবেদন প্রচার করা হয়েছে। 

তবে নিখোঁজ ব্যক্তিদের নাম প্রকাশ করা হয়নি এবং তাদের পরিবারের প্রতিক্রিয়ার দৃশ্যও খুব একটা দেখানো হয়নি।