বাসস
  ২৯ আগস্ট ২০২৬, ১২:০৫

ভেনেজুয়েলার সঙ্গে বিশাল তেল চুক্তির ঘোষণা ট্রাম্পের

ঢাকা, ২৯ আগস্ট, ২০২৬ (বাসস) : ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদের বড় একটি অংশের নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রকে দেওয়ার বিষয়ে একটি বড় ধরনের চুক্তিতে পৌঁছেছে দুই দেশ। শুক্রবার এমন ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

তিনি বলেন, এই চুক্তির আওতায় ভেনেজুয়েলার ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেল তেলসম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ পাবে যুক্তরাষ্ট্র।

খবর বার্তা সংস্থা এএফপি’র।

ট্রাম্প চুক্তিটিকে ‘বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় তেল চুক্তি’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। মার্কিন ও ভেনেজুয়েলার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এর ফলে ভেনেজুয়েলায় প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেসরকারি বিনিয়োগ আসবে।

বিশ্বের সবচেয়ে বেশি প্রমাণিত তেলসম্পদের মালিক ভেনেজুয়েলা। গত জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিনের শাসক নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত ও গ্রেপ্তার করার পর থেকে ট্রাম্প প্রশাসনের তীব্র চাপ ও ঘনিষ্ঠ নজরদারির মধ্যে রয়েছে দেশটির সরকার।

মাদুরোর ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজকে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দিয়েছে ওয়াশিংটন। তবে, তাকে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চলতে হবে।

ভেনেজুয়েলার তেল যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার আগ্রহ ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই প্রকাশ করে আসছেন। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে চুক্তি ঘোষণার পোস্টে তিনি জানান, এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের তেলের মজুত দ্বিগুণেরও বেশি হবে।

অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট রদ্রিগেজও চুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করে একে ‘ঐতিহাসিক চুক্তি’ বলে উল্লেখ করেছেন। তার ভাষায়, এই চুক্তি ‘দেশের পুনর্জাগরণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে।’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি বলেন, এই চুক্তির মাধ্যমে ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ এবং রাষ্ট্রের জন্য ২০৯ বিলিয়ন ডলারের বেশি কর রাজস্ব আসতে পারে।

ট্রাম্প জানান, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বেসরকারি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের অংশীদারত্বের মাধ্যমে রদ্রিগেজের সঙ্গে এই চুক্তিতে পৌঁছেছেন।

ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘এই চুক্তি ভেনেজুয়েলা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ইতোমধ্যে বাড়তে থাকা সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করবে।’

অনেক প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি

রুবিও বলেন, এই চুক্তি প্রমাণ করে যে ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাহসী পররাষ্ট্রনীতি ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিতে সাফল্য এনে দিচ্ছে।’ এর মাধ্যমে পশ্চিম গোলার্ধে স্থিতিশীল তেল মজুত ও কম দামের তেল নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম কমবে বলেও তিনি দাবি করেন।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিও আরও বলেন, ভেনেজুয়েলার জনগণের জন্য এই চুক্তির ফলে প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেসরকারি বিনিয়োগ আসবে, হাজার হাজার উচ্চ বেতনের কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং দেশটির অর্থনীতি পুনর্গঠনে গতি আসবে। তবে তিনি চুক্তির বিস্তারিত কিছু জানাননি।

টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্টিন ক্যাম্পাসের এনার্জি ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক জর্জ পিনন বলেন, চুক্তিটি বেশ ব্যতিক্রমী। কীভাবে তেলসম্পদের মালিকানা হস্তান্তর করা হবে, তা নিয়ে এখনো অনেক প্রশ্ন রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আমরা জানি না হস্তান্তরটি কীভাবে হবে। এটি কি বিক্রি? মালিকানার অধিকার হস্তান্তর? নাকি তেল উত্তোলন শুরু হওয়ার পরই কেবল তা হস্তান্তর করা হবে?’

এর আগে বৃহস্পতিবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছিল, দুই দেশ ১২টি উৎপাদনশীল তেলক্ষেত্র নিয়ে আলোচনা করছে। এসব তেলক্ষেত্রে প্রমাণিত প্রায় ৯০ বিলিয়ন ব্যারেল তেল রয়েছে, যা ভেনেজুয়েলার মোট প্রমাণিত ৩০০ বিলিয়ন ব্যারেল তেলসম্পদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।

অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রকে মালিকানার অংশ দেওয়ার বিনিময়ে বেসরকারি কোম্পানিগুলো তেলক্ষেত্রগুলোর উন্নয়ন করবে। এর মধ্যে মার্কিন কোম্পানিও রয়েছে। এর মাধ্যমে ভেনেজুয়েলা আরও বেশি তেল রাজস্ব পাবে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের তেলের মজুত দ্বিগুণেরও বেশি করতে পারে। এমন সময়ে এই চুক্তি হচ্ছে, যখন দেশটির কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুত প্রায় ৪০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির উচ্চ দাম ট্রাম্পের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠেছে। নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তার জনপ্রিয়তার সূচক কমেছে। এর মধ্যে ইরানে যুদ্ধ শুরু করার পর বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছে।

ট্রাম্প প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন কোম্পানিগুলোকে ভেনেজুয়েলায় বিনিয়োগে উৎসাহিত করে আসছে। তবে দেশটির জরাজীর্ণ অবকাঠামো এবং অতীতে কারাকাস সরকারের বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সম্পদ দখলের ঘটনা মার্কিন কোম্পানিগুলোকে এখনো সতর্ক করে রেখেছে।

মাদুরো ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার সময় ভেনেজুয়েলায় কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া একমাত্র মার্কিন তেল কোম্পানি ছিল শেভরন। কোম্পানিটি জুলাইয়ে জানিয়েছিল, তারা দৈনিক অপরিশোধিত তেল উৎপাদন বাড়িয়ে ২ লাখ ৮০ হাজার ব্যারেলে নিয়েছে। ২০২৮ সালের শেষ নাগাদ উৎপাদন আরও ৫০ শতাংশ বাড়ানোর পরিকল্পনাও জানিয়েছে তারা।

এগেইন ক্যাপিটালের জ্বালানি বিশেষজ্ঞ জন কিলডাফ বলেন, ভেনেজুয়েলায় কোম্পানিগুলোর ব্যবসা পরিচালনার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো তাদের বিনিয়োগের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা।

তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি এখন তেলক্ষেত্রগুলোর নিয়ন্ত্রণ বা মালিকানা নেয়, তাহলে লক্ষ্য হতে পারে এমন একটি বিশেষ অঞ্চল তৈরি করা, যেখানে মার্কিন কোম্পানিগুলো নির্বিঘ্নে গিয়ে কার্যক্রম চালাতে পারবে। এর মাধ্যমে ভেনেজুয়েলায় বিনিয়োগের সঙ্গে থাকা রাজনৈতিক ঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে বলে তিনি মনে করেন।