বাসস
  ১৯ জুলাই ২০২৬, ১৫:৪৫

ইরান যুদ্ধের প্রভাবে প্লাস্টিক সংকট, মিসরের ‘গারবেজ সিটি’র ব্যবসায়ীদের রমরমা ব্যবসা

ঢাকা, ১৯ জুলাই, ২০২৬ (বাসস) : কায়রোর ‘গারবেজ সিটি’র সরু গোলকধাঁধার মতো গলিগুলোতে এখন ব্যস্ত সময় কাটছে পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক ব্যবসায়ী পিটার রোমানির।

ইরান যুদ্ধের কারণে কাঁচামালের সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হওয়ায় প্লাস্টিকের খোঁজে বিভিন্ন কারখানা এখন তাকে নিয়মিত ফোন করছে।

২৫ বছর বয়সী রোমানি মিসরের শত শত পুনর্ব্যবসায়ী ও উৎপাদনকারীর একজন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্লাস্টিক তৈরির কাঁচামাল পরিবহন ব্যাহত হওয়ার পর থেকেই চাহিদা বেড়েছে। এতে তারা ব্যবসায় বড় ধরনের সুবিধা পাচ্ছেন।

কায়রো থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।

এই প্রবৃদ্ধির কেন্দ্রবিন্দু পূর্ব কায়রোর বিস্তীর্ণ এলাকা মানশিয়েত নাসের। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এখানে আবর্জনা সংগ্রহকারীরা বিশ্বের অন্যতম উন্নত অনানুষ্ঠানিক পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন।

চাপ দিয়ে বাঁধাই করা প্লাস্টিকের বিশাল স্তূপের পাশে দাঁড়িয়ে রোমানি এএফপিকে বলেন, ‘যুদ্ধের আগে আমরাই কারখানাগুলোতে ফোন করে আমাদের মাল বিক্রির চেষ্টা করতাম।’

তিনি বলেন, ‘কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে কারখানাগুলোই আমাদের ফোন করছে। তারা জানতে চায়, কত মাল আছে? আজই সরবরাহ করা যাবে? আগে এমনটা কখনো হয়নি।"

-আবর্জনার ওপর গড়ে ওঠা জনপদ-

এক লাখ ১৫ হাজারের বেশি মানুষের বাস মানশিয়েত নাসেরে। মোকাত্তাম পাহাড়ের নিচে এবং কায়রোর ঐতিহাসিক সিটাডেলের বিপরীতে অবস্থিত এই এলাকায় মূলত কপটিক খ্রিস্টানদের বসবাস।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, কায়রোর মোট বর্জ্যের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি এই এলাকায় প্রক্রিয়াজাত করা হয়।

এখানে একই ছাদের নিচে বসবাস ও কাজ করেন পরিবারের সদস্যরা। অনেক সময় তাদের থাকার জায়গা ও আবর্জনার স্তূপের মধ্যে ব্যবধান বলতে থাকে শুধু একটি সিঁড়ি বা পর্দা। ফলে দুর্গন্ধ, প্লাস্টিকের ধোঁয়া এবং নানা স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে থাকতে হয় তাদের।

নিচতলায় পুরুষেরা প্লাস্টিক, কার্ডবোর্ড, কাগজ, ধাতু ও কাচ আলাদা করে স্তূপে সাজান। পরে এগুলো কারখানায় পাঠানো হয়।

ওপরতলায় শিশুরা পড়াশোনা করে। মায়েরা রান্না করেন। ছোট ছোট বসার ঘরে টেলিভিশন চলে। আর নিচতলায় প্লাস্টিক কুচি করার যন্ত্র ও বেলিং প্রেসের অবিরাম শব্দ শোনা যায়।

পুরো এলাকায় আবর্জনার গন্ধ ভাসতে থাকে। সরু গলিতে ধীরে ধীরে চলে পিকআপ ভ্যান ও হাতগাড়ি। দিনের সংগ্রহ করা আবর্জনা নামানো হয়। আর সেগুলোর ফাঁকেই শিশুদের ফুটবল খেলতে দেখা যায় ।

-আগাম অর্থ পরিশোধ-

রোমানি মূলত পুনর্ব্যবহারযোগ্য পলিইথিলিন নিয়ে কাজ করেন। এটি বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত প্লাস্টিকগুলোর একটি এবং প্যাকেজিং শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল।

মূল্য নির্ধারণকারী সংস্থা ইন্ডিপেনডেন্ট কমোডিটি ইন্টেলিজেন্স সার্ভিসেস (আইসিআইএস)-এর তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্য পলিথিলিনের অন্যতম প্রধান বৈশ্বিক সরবরাহকারী। এ অঞ্চলের প্রায় ৮৫ শতাংশ রপ্তানি হরমুজ প্রণালী দিয়ে যায়।

মিসরের কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ চেম্বারের তথ্য অনুযায়ী, দেশটি প্লাস্টিক শিল্পের প্রায় ৪০ শতাংশ কাঁচামাল আমদানি করে। এর বেশির ভাগই আসে উপসাগরীয় দেশ, ইউরোপ, চীন ও দক্ষিণ কোরিয়া থেকে।

শিল্প খাতের তিনটি সূত্র এএফপিকে জানায়, কিছু পণ্যের প্যাকেজিং ও প্লাস্টিকের দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। ফলে উৎপাদনকারীরা স্থানীয়ভাবে পুনর্ব্যবহার করা প্লাস্টিকের দিকে ঝুঁকছেন।

মূলত পানীয় ও খাদ্যপণ্যের মোড়কে ব্যবহৃত পিইটি প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহারকারী রিজক ইউসুফ বলেন, যেসব কারখানা আগে অর্থ পরিশোধে দেরি করত, তারা এখন কাঁচামাল নিশ্চিত করতে আগাম টাকা দিচ্ছে।

তিনি এএফপিকে বলেন, চাহিদা তিন গুণ বেড়েছে। আর কিছু পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের দাম ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।

-সাময়িক উল্লম্ফন?-

এই সরবরাহ সংকট পুরো উৎপাদন শৃঙ্খলে স্থানীয় ব্যবসার জন্য ইতিবাচক হয়েছে।

সাদাত সিটি কেমিক্যাল ফাইবার ফ্যাক্টরির প্রধান নির্বাহী ফাইরুজ এল-সাইয়েদ বলেন, তাদের প্রতিষ্ঠান ১৬ বছর ধরে ব্যবহৃত প্লাস্টিকের বোতল থেকে পলিয়েস্টার ফাইবার তৈরি করছে।

তিনি বলেন, সর্বশেষ সংকটের পরই তারা ব্রাজিলের মতো দূরবর্তী বাজারেও প্রবেশ করতে পেরেছেন।

প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে নতুন প্যাকেজিং উপকরণ তৈরি করা প্রতিষ্ঠান ইউফ্লেক্স ইজিপ্টের জ্যেষ্ঠ বিপণন ও বিক্রয় ব্যবস্থাপক নেসমা এল-এরিফ বলেন, তাদের পুনর্ব্যবহারযোগ্য পণ্যের চাহিদা ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।

তবে শিল্পসংশ্লিষ্টদের ধারণা, সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক হলে এই ব্যবসায়িক উল্লম্ফন স্থায়ী নাও হতে পারে।

ইউসুফ বলেন, গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে আলোচনা এগোচ্ছে বলে ঘোষণা দেওয়ার পরই দাম ও চাহিদা কমতে শুরু করে।

তিনি বলেন, ‘মাত্র একটি পোস্টেই বাজার বদলে গেছে। যুদ্ধ শেষ হলে এই অবস্থা থাকবে কি না, আমি নিশ্চিত নই।’

তবে চলতি সপ্তাহে ট্রাম্প ঘোষণা দেন, যুক্তরাষ্ট্র আবারও ইরানের বন্দরগুলো অবরোধ করছে এবং হরমুজ প্রণালীর ‘নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছে।’ দুই দেশের মধ্যে নতুন করে সংঘর্ষও শুরু হয়েছে।

রোমানি ও ইউসুফ দুজনই জানিয়েছেন, এরই মধ্যে আবার অর্ডার বাড়তে শুরু করেছে।

ইউসুফ বলেন, ‘এখন আমরা এতে অভ্যস্ত। ওখানে যখনই কোনো সমস্যা হয়, ক্রেতারা আমাদের ফোন করতে শুরু করেন।’