শিরোনাম

ঢাকা, ১৫ জুলাই, ২০২৬ (বাসস) : টানা চতুর্থ দিনের মতো মঙ্গলবার ইরানে নতুন করে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে দেশটির বন্দরগুলোতে জাহাজ চলাচল ঠেকাতে আবারও নৌ অবরোধ আরোপ করেছে ওয়াশিংটন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের ওপর উচ্চ কর আরোপের হুমকি থেকে সরে এসেছেন। তবে, তিনি সতর্ক করে বলেছেন, তেহরান কোনো সমঝোতায় না এলে আগামী সপ্তাহে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতুগুলোতে হামলা চালানো হবে।
তেহরান থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।
ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘আগামী সপ্তাহে তাদের জন্য পরিস্থিতি খুবই খারাপ হবে। কারণ, তখন বিদ্যুৎকেন্দ্রের পালা আসবে। এরপর আসবে সেতুর পালা।’
তিনি বলেন, ‘তারা আলোচনায় বসে সমঝোতায় না এলে আমরা তাদের সব বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংস করে দেব। সব সেতুও ধ্বংস করে দেব।’
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, সর্বশেষ হামলার লক্ষ্য ছিল হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলায় ব্যবহৃত ইরানের সক্ষমতা দুর্বল করে দেওয়া। উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল ও গ্যাস পরিবহনের এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে তেহরান বারবার বেসামরিক জাহাজে হামলা চালিয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, হরমুজ প্রণালীর কাছে উপসাগরীয় দ্বীপ কেশমের বন্দরনগরী বন্দর আব্বাস ও আরও কয়েকটি এলাকায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।
পরে রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনা জানায়, জর্ডানে অবস্থিত একটি সামরিক ঘাঁটিতে ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরানের বাহিনী। ওই ঘাঁটিতে মার্কিন যুদ্ধবিমান রয়েছে।
নতুন করে আরোপ করা মার্কিন নৌ অবরোধ মঙ্গলবার গ্রিনিচ মান সময় রাত ২০-০০টায় কার্যকর হয়। এর এক ঘণ্টা আগেই যুক্তরাষ্ট্র হামলা শুরু করে।
ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, এই পদক্ষেপ কার্যত ওয়াশিংটনের সঙ্গে সংঘাত স্থগিত রেখে শান্তি আলোচনার জন্য হওয়া চুক্তিকে ভেঙে দিয়েছে।
উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি বলেন, নৌ অবরোধ পুনর্বহালের মার্কিন সিদ্ধান্ত ‘এক অর্থে ইসলামাবাদ স্মারককে ভেঙে দিয়েছে।’
সেন্টকম প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে বলেন, গত এক সপ্তাহে ইরান ইচ্ছাকৃতভাবে এ অঞ্চলের বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। বাণিজ্যিক সাতটি জাহাজে হামলায় প্রায় এক ডজন নাবিক নিহত, নিখোঁজ বা আহত হয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘নিরপরাধ মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলা এই অযৌক্তিক আগ্রাসনের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে জবাবদিহির আওতায় আনছে।’
এর আগে মঙ্গলবার ইরান জানায়, আগের দফার মার্কিন হামলায় কেশম দ্বীপ লক্ষ্যবস্তু হয়েছিল। স্থানীয় কর্তৃপক্ষও জানায়, ইরানের একমাত্র বেসামরিক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থাকা বুশেহরের চারটি স্থানে এবং ইরাক ও কুয়েত সীমান্তসংলগ্ন একটি এলাকায়ও মার্কিন বাহিনী হামলা চালিয়েছে। এর জবাবে ইরান হরমুজ প্রণালীতে দুটি জাহাজে হামলা চালায়। আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার (আইএমও) তথ্য অনুযায়ী, এতে দুই নাবিক নিহত হন।
এদিকে, ওমান উপকূলের কাছে মঙ্গলবার ভোরে অজ্ঞাত একটি বিস্ফোরক যন্ত্রের আঘাতে একটি নরওয়েজিয়ান তেলবাহী জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে সংকট মোকাবিলা সংস্থা এমটিআই নেটওয়ার্ক।
কুয়েতও জানিয়েছে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় তাদের একটি নৌজাহাজে আঘাত লাগে। এতে চার নৌসদস্য আহত হন।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড মঙ্গলবার জানায়, তারা বাহরাইনে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এতে মার্কিন বাহিনীর জন্য ব্যবহৃত একটি আবাসিক ভবন এবং অন্যান্য স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
বাহরাইন জানায়, তারা ইরানের ছোড়া ‘বেশ কয়েকটি বিশ্বাসঘাতকতাপূর্ণ আকাশপথের হামলা’ প্রতিহত করেছে। মানামায় একাধিকবার বিস্ফোরণ ও সাইরেন শোনার পর দেশটি তেহরানের বিরুদ্ধে বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ আনে।
তেহরান এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য মিত্র দেশেও হামলা চালিয়েছে।
জর্ডান মঙ্গলবার জানিয়েছে, তারা ইরান থেকে ছোড়া চারটি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে।
ইরানের কথিত পারমাণবিক কর্মসূচির কট্টর বিরোধী ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু মঙ্গলবার সতর্ক করে বলেন, ইরান যদি তার দেশে হামলা চালায়, তাহলে তেহরানকে কঠোর জবাব দেওয়া হবে।
ইসরাইলের ঘোষণাবহির্ভূত পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডারের অবস্থান বলে ব্যাপকভাবে বিশ্বাস করা হয়—এমন দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর দিমোনা থেকে তিনি বলেন, ‘আপনারা যদি আমাদের ওপর হামলা করেন, তাহলে পরিস্থিতি শান্ত থাকবে—এমনটা ভাববেন না।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের ওপর কেউ হামলা করবে আর আমরা পাল্টা কঠোর জবাব দেব না—সেই দিন শেষ।’
-জাহাজে কর প্রত্যাহার-
এ দিকে ট্রাম্প বলেছেন, সোমবার ঘোষিত হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের ওপর আরোপের পরিকল্পিত কর তিনি বাতিল করছেন। এর পরিবর্তে উপসাগরীয় মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ চুক্তি করা হবে।
নিজের ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি ২০ শতাংশ 'ইউনাইটেড স্টেটস রিইমবার্সমেন্ট ফি' প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এর পরিবর্তে উপসাগরীয় বিভিন্ন দেশ যুক্তরাষ্ট্রে যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ চুক্তি করবে, তা গ্রহণ করা হবে।’
গত সপ্তাহ থেকে নতুন করে শুরু হওয়া মার্কিন হামলায় ইরানে অন্তত ২৮ জন নিহত হয়েছেন। ইরানের গণমাধ্যম ও সরকারি ঘোষণার ভিত্তিতে এএফপির হিসাব থেকে এ তথ্য জানা গেছে।