শিরোনাম

ঢাকা, ৯ জুলাই, ২০২৬ (বাসস) : হরমুজ প্রণালীতে জাহাজে হামলা অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে বলে সতর্ক করে বুধবার ইরানে নতুন করে হামলার নির্দেশ দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প|
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) নতুন দফা হামলার ঘোষণা দেওয়ার পর ইরানের দক্ষিণ উপকূলজুড়ে একাধিক স্থানে বিস্ফোরণ ঘটেছে|
তেহরান থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে|
ইরানের সরকারি বার্তা সংস্থা ইরনার খবরে বলা হয়, কিশ দ্বীপের আকাশে যুদ্ধবিমানের শব্দ শোনা যায়| বন্দর আব্বাস, কোনারাক ও চাবাহার বন্দরনগরী বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে| এর মধ্যে চাবাহারের একটি অংশে বিদ্যুৎ সরবরাহ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়|
ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে বলেন, ‘গতকাল ইরানের জাহাজে বোমা হামলার প্রতিশোধ হিসেবে এই হামলা চালানো হয়েছে|’ তিনি বলেন, ‘এ ধরণের ঘটনা আবার ঘটলে তার পরিণতি হবে আরও ভয়াবহ|’
তেহরানের বিরুদ্ধে পাল্টা হামলার নির্দেশ দিলেও বুধবারের দিনের শুরুতে ট্রাম্প বলেন, সর্বশেষ সামরিক উত্তেজনা দ্রুত শেষ হবে বলে তিনি আশা করছেন| একই সঙ্গে তিনি আরও আলোচনার পথও খোলা রাখেন|
সেন্টকম জানায়, হরমুজ প্রণালীতে নৌ-চলাচলের স্বাধীনতার জন্য হুমকি সৃষ্টি করার সক্ষমতা দুর্বল করতেই এই হামলা চালানো হয়েছে| বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহনের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ সাধারণত এই প্রণালী দিয়ে যায়|
এক্সে দেওয়া এক পোস্টে সেন্টকম জানায়, ‘বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক অযৌক্তিক হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে দায়ী করছে|’
অন্যদিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার সামরিক উপদেষ্টা মোহসেন রেজায়ি এক্সে লেখেন, ‘আগ্রাসী শত্রু ও তাদের সহযোগীদের কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে|’
নতুন হামলার নির্দেশ দেওয়ার আগে ট্রাম্প বলেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি শেষ হয়ে গেছে| এরপরই মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান, কাতার এবং জাতিসংঘ উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান জানায়|
বুধবার গভীর রাতে এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ইরানের পক্ষ থেকে "কিছুক্ষণ আগে’ ফোন করা হয়েছে| তারা ‘খুবই মরিয়া হয়ে একটি চুক্তি করতে চায়|’
তবে কে ফোন করেছিলেন, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত জানাননি| একই সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তির কার্যকারিতা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করে তিনি ইরানিদের ‘কিছুটা পাগলাটে’ বলে মন্তব্য করেন|
বৃহস্পতিবার ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির দাফনের ঠিক আগে এই নতুন হামলা চালানো হলো| গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর সময় তিনি নিহত হন|
হামলার পর থেকে তেহরান হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখার ওপর জোর দিয়ে আসছে| তারা জানায়, প্রণালী ব্যবহারকারী জাহাজের কাছ থেকে ফি নেওয়া হবে| অনুমোদিত পথ ছেড়ে চলাচলকারী জাহাজে হামলারও হুমকি দিয়েছে|
সাম্প্রতিক কয়েক দিনে ইরানের সামরিক বাহিনী অন্তত তিনটি জাহাজে হামলা চালায়| এর জবাবে মঙ্গলবার ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ব্যাপক হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র| পরে ইরান উপসাগরীয় কয়েকটি দেশে পাল্টা হামলা চালায়|
আঙ্কারায় ন্যাটো সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, ‘আজ রাতে আমরা তাদের ওপর জোরালো হামলা চালাব| তারা প্রতিদিনই চুক্তি লঙ্ঘন করছে|’
তবে পরে তিনি বলেন, ‘যাই ঘটুক না কেন, খুব দ্রুতই এর সমাপ্তি হবে|’
যুদ্ধবিরতি ‘শেষ’ বলে ট্রাম্পের মন্তব্যের পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আট শতাংশ বেড়ে যায়|
সর্বোচ্চ সংযমের আহ্বান-
এদিকে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সব পক্ষকে ‘সর্বোচ্চ সংযম’ প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছেন| যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার অন্যতম মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানও একই আহ্বান জানায়|
ইরান জানায়, বুধবার দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি ও কাতারের প্রধানমন্ত্রী ফোনে কথা বলেন| তারা আঞ্চলিক সমস্যা সমাধানে কূটনৈতিক উপায় ব্যবহারের গুরুত্বের ওপর জোর দেন|
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—উভয় দেশই জানিয়েছে, প্রাথমিক দফার হামলায় তারা কয়েক ডজন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে| ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের দাবি, এতে দেশটির আটজন সামরিক সদস্য নিহত হয়েছেন|
সেন্টকম জানায়, মঙ্গলবার তাদের বাহিনী ৮০টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে| এর মধ্যে ছিল ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, উপকূলীয় রাডার কেন্দ্র এবং ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) ৬০টি ছোট নৌযান|
আইআরজিসি দাবি করেছে, তারা কুয়েত ও বাহরাইনে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক ডজন সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে|
কুয়েত জানায়, তারা দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ১৩টি ড্রোন ভূপাতিত করেছে| অন্যদিকে ইরানের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা বাহরাইনের শেখ ইসা বিমানঘাঁটিতে অবস্থানরত মার্কিন বাহিনীতেও হামলা চালিয়েছে|
এক মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা বুধবার জানান, ইরানের সর্বশেষ হামলায় কোনো মার্কিন নাগরিক হতাহত হয়নি এবং কোন স্থাপনার বড় ধরণের ক্ষতিও হয়নি|
তিনি এএফপিকে বলেন, ‘ইরান থেকে ছোড়া সব ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হয় প্রতিহত করা হয়েছে, নয়তো বড় ধরনের ক্ষতি করতে ব্যর্থ হয়েছে|’
বাহরাইনের সরকারি কর্মকর্তা নাওয়াল সাদ বলেন, ‘যুদ্ধের ছায়া আবারও ঘনিয়ে আসছে|’ তিনি বলেন, ‘ভয় ও উদ্বেগের সেই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে আমি আর যেতে চাই না|’
সমুদ্রে আটকা নাবিকরা-
বাহরাইন ও কুয়েতে হামলার পাশাপাশি জাহাজে হামলার নিন্দা জানিয়েছে হরমুজ প্রণালীর অপর পারে অবস্থিত ওমান| তবে তারা এ জন্য ইরানকে দায়ী করেনি|
সাবেক এই মধ্যস্থতাকারী পুরো যুদ্ধজুড়েই হামলার ঘটনায় ইরানকে দায়ী করা থেকে বিরত থেকেছে| হরমুজের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে তেহরানের সঙ্গে আলোচনায় নিজেদের নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখতেই তারা এ অবস্থান নিয়েছে|
ওয়াশিংটন হরমুজে জাহাজের অবাধ চলাচল চায়| কিন্তু ইরান চলাচলের জন্য ফি আরোপে অনড় রয়েছে| একই সঙ্গে ওমানের জলসীমা ব্যবহার করেও জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে|
সম্প্রতি হামলার শিকার হওয়া তিনটি জাহাজই ওমান উপকূলের কাছ দিয়ে চলাচল করছিল| ওমান তাদের উপকূল ঘেঁষে অস্থায়ী একটি নৌপথ চালুর প্রস্তাব দিয়েছিল|
গত মাসে যুদ্ধ বন্ধে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে চুক্তি হওয়ার পর সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচল ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছিল|
তবে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার (আইএমও) মহাসচিব আর্সেনিও ডোমিঙ্গেজ বুধবার জানিয়েছেন, এখনো প্রায় ছয় হাজার নাবিক ওই এলাকায় আটকা পড়ে আছেন|