বাসস
  ০৯ জুলাই ২০২৬, ১২:৩১

ভেনেজুয়েলার ভূমিকম্পে জরুরি সহায়তা চাইল জাতিসংঘ

ঢাকা, ০৯ জুলাই, ২০২৬ (বাসস): ভেনেজুয়েলার ভয়াবহ ভূমিকম্পে ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনায় প্রায় ৩০ কোটি মার্কিন ডলারের জরুরি সহায়তা চেয়ে বুধবার আবেদন জানিয়েছে জাতিসংঘ। 

এদিকে এ দুর্যোগে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৩ হাজার ৮০০ ছাড়িয়েছে।

ল্যাটিন আমেরিকার ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ এই ভূমিকম্পে হাজারো মানুষ গৃহহীন হয়েছেন। 

এছাড়াও ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগটিতে আরও হাজারো মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত লা গুয়াইরায় অনেক পরিবার এখনো ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে স্বজনদের লাশ খুঁজে চলেছে।

ভেনেজুয়েলা থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।

দুর্যোগ বিষয়ক এক বৈঠকে জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা প্রধান টম ফ্লেচার বলেন, ‘অনেক দাতা দেশ ইতোমধ্যেই সহায়তা নিয়ে এগিয়ে এসেছে। তাদের প্রতি আমি শ্রদ্ধা ও ধন্যবাদ জানাই।’

তিনি বলেন, আগামী ছয় মাসে ১৩ লাখ মানুষের জরুরি সহায়তার জন্য ২৯ কোটি ৬০ লাখ ডলার প্রয়োজন। এ লক্ষ্যেই তহবিলটির আবেদন করা হয়েছে।

এদিকে পুনরুদ্ধার কার্যক্রমে অর্থ জোগাড়ের জন্য জব্দ করা রাষ্ট্রীয় সম্পদ মুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছে কারাকাস।

জাতিসংঘের বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভান গিল বলেন, ‘যেসব দেশ ভেনেজুয়েলার সম্পদ আটকে রেখেছে, দেশটির পুনরুদ্ধার কার্যক্রমে ব্যবহারের জন্য এ সব সম্পদ ছাড়ের পরিকল্পনার গ্রহণের জন্য আমরা তাদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।’

তিনি বলেন, ‘অবৈধ নিষেধাজ্ঞার কারণে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ভেনেজুয়েলা রাষ্ট্রের মালিকানাধীন একাধিক হিসাব জব্দ রয়েছে।’

ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রড্রিগেজ জানান, যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞার আওতায় জব্দ থাকা ভেনেজুয়েলার প্রায় ৩০ টন স্বর্ণ ছাড়ের অনুরোধ জানিয়ে তিনি রাজা তৃতীয় চার্লসকে চিঠি দিয়েছেন।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে তিনি বলেন, ‘আমি ইংল্যান্ডের রাজার কাছে চিঠি পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি, যাতে ব্যাংক অব ইংল্যান্ডে রাখা স্বর্ণ ছাড় করা হয়। এই স্বর্ণ আমাদের জনগণের এবং ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে আমাদের এই স্বর্ণের প্রয়োজন।’

ত্রাণ কার্যক্রম সহজ করতে, যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে চার মাসের জন্য ভেনেজুয়েলার ওপর আরোপিত কয়েকটি অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে।

২০১৯ সাল থেকে বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার ওপর ব্যাপক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। দেশটির তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর বামপন্থী সরকারকে অবৈধ বিবেচনা করে তার ওপর চাপ সৃষ্টি করাই ছিল সেই পদক্ষেপের উদ্দেশ্য।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে মার্কিন বাহিনী মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর কারাকাসের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্কের উন্নতি হয়েছে।

ট্রাম্প প্রশাসন ডেলসি রড্রিগেজকে সমর্থন দিয়েছে। একই সঙ্গে বিশেষ করে ভেনেজুয়েলার বিশাল তেলসম্পদ উন্নয়নের সুবিধার্থে ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞাও শিথিল করেছে।

২৪ জুনের ভূমিকম্পের আগেই দীর্ঘ কয়েক দশকের অর্থনৈতিক সংকটে ভেনেজুয়েলার অবকাঠামো ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছিল।

জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, এই ভূমিকম্পে ৬৭০ কোটি ডলারের ক্ষতি হয়েছে। যা দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ছয় শতাংশের সমান।

ভূমিকম্পে কারাকাসের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখনো সেখানে বাণিজ্যিক ফ্লাইট চালু হয়নি।

৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুই দফা ভূমিকম্পের দুই সপ্তাহ পর আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দলগুলো জীবিত কাউকে খুঁজে পাওয়ার অভিযান প্রায় শেষ করেছে। তবে স্বজনরা এখনো ধ্বংসস্তূপে লাশের খোঁজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

সরকার বুধবার মৃতের সংখ্যা হালনাগাদ করে ৩ হাজার ৮১১ জনের কথা জানিয়েছে। আহত হয়েছেন প্রায় ১৭ হাজার মানুষ।

ভূমিকম্পে লা গুয়াইরার বহু আবাসিক ভবন সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে। এতে প্রায় ১৮ হাজার মানুষ গৃহহীন হয়েছেন।

লা গুয়াইরার কারাবালেদা এলাকায় বুধবার তিনটি পরিবার একটি মোড়ে বসে ত্রাণের অপেক্ষা করছিল। এর আগে তারা আশপাশে খাবার, পানি ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী খুঁজেছেন।

তারা কিছু ডায়াপার, বোতলজাত পানি, টয়লেট পেপার ও কিছু খাবার সংগ্রহ করতে পেরেছেন।

সমুদ্রসৈকতে আগে নারকেলের মিষ্টি বিক্রি করা ২৬ বছর বয়সী স্টেফানি গারাতে বলেন, ‘জানি না, আর কতদিন এভাবে থাকতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘অন্তত আজ আমাদের কিছু চাল, স্প্যাগেটি আর সারডিন দেওয়া হয়েছে।’

৩৪ বছর বয়সী হেয়ারড্রেসার জেনেসিস রামিরেজ একটি ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপে তার দুই ভাতিজার খোঁজ করছিলেন।

তিনি বলেন, ‘এই একই ভবন থেকে যখন একটি শিশুকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে, তখন আমি কীভাবে আশা ছেড়ে দিই? কীভাবে বিশ্বাস হারাই?’

তিনি আরও বলেন, ‘তাদের লাশ না দেখা পর্যন্ত আশা হারানো যায় না।’

ওপিপি আবাসন কমপ্লেক্সে, যেখানে কয়েকটি টাওয়ার পুরোপুরি ধসে পড়েছে, সেখানে প্রায় এক ডজন খননযন্ত্র ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ চালায়।

সেখানে কয়েকজন মানুষ এখনো স্বজনদের লাশ উদ্ধারের আশায় অপেক্ষা করছেন।

চারদিকে পচনধরা লাশের দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। একটি কালো লাশ বহনের ব্যাগের পাশে দাঁড়িয়ে এক নারী কান্নায় ভেঙে পড়েন।

সেখানে দায়িত্ব পালনরত এক সেনাসদস্য বলেন, ‘এখন আমাদের সামনে শুধু লাশ উদ্ধারের কাজই বাকি।’