বাসস
  ০৮ জুলাই ২০২৬, ১৯:৪৮

খামেনির শোক মিছিলে মুখর ইরাকের পবিত্র শহরগুলো

ছবি : সংগৃহীত

ঢাকা, ৮ জুলাই, ২০২৬ (বাসস) : ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির শেষকৃত্য উপলক্ষে বুধবার ইরাকের পবিত্র শহর নাজাফের রাস্তায় এবং ঐতিহাসিক ইমাম আলীর মাজারের প্রাঙ্গণে লাখো শোকাহত মানুষের ঢল নামে।

শনিবার থেকে ইরানে খামেনির স্মরণে ছয় দিনের রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠান শুরু হয়েছে। এর অংশ হিসেবে বুধবার প্রতিবেশী ইরাকে বিশেষ শোকানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ ইরাকের সঙ্গে তেহরানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে এবং দেশটিতে শিয়া মুসলমানদের সবচেয়ে পবিত্র ধর্মীয় স্থাপনাগুলো অবস্থিত।

ইরাকের নাজাফ খেবে এএফপি জানায়, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান আশা করছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় গত ২৮ ফেব্রুয়ারি খামেনি ও তাঁর পরিবারের কয়েকজন সদস্য নিহত হওয়ার পর আয়োজিত এই দীর্ঘ শোকানুষ্ঠান দেশটির শক্তি ও জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে বিশ্ববাসীর কাছে প্রতিফলিত হবে।

৩০ বছর বয়সী মোহাম্মদ আল-বায়াতি বলেন, ‘যিনি আমেরিকা ও ইসরাইলের শক্তির বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিলেন, তাঁর শেষকৃত্য আমি কোনোভাবেই মিস করতে পারি না।’

দক্ষিণ ইরাক থেকে রাতভর ভ্রমণ করে নাজাফে আসা ২৭ বছর বয়সী মুরতাদা আল-মালিকি বলেন, ‘খামেনি দায়েশের (ইসলামিক স্টেট) বিরুদ্ধে আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন এবং ইসরাইলকে নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলেন।’

এদিকে খামেনির শোকযাত্রা চলাকালেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে আবারও উত্তেজনা বেড়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালীতে তিনটি জাহাজে ইরানের হামলার জবাবে তারা ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় ব্যাপক হামলা চালিয়েছে। পরে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) দাবি করে, তারা বাহরাইন ও কুয়েতে মার্কিন সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে।

ইরানের পবিত্র নগরী কোমে বিশাল শোকমিছিল শেষে মঙ্গলবার রাতে খামেনির মরদেহ ইরাকে আনা হয়। এ উপলক্ষে ইরাক সরকার বুধবার সরকারি ছুটি ঘোষণা করে।

ভোর থেকেই প্রচণ্ড গরম উপেক্ষা করে অসংখ্য মানুষ নাজাফের রাস্তায় ভিড় জমান। অনেকেই ধীরে ধীরে ট্রাকে বহন করা খামেনির কফিন স্পর্শ করার চেষ্টা করেন। কফিনটি ইমাম আলীর মাজারের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। ইমাম আলী ছিলেন মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জামাতা এবং শিয়া মুসলমানদের প্রথম ইমাম।

মাজারের বিশাল প্রাঙ্গণে আজানের ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হওয়ার সময় সাদা ও কালো পাগড়ি পরিহিত শত শত আলেম ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেন খামেনির মরদেহের জানাজায় অংশ নেওয়ার জন্য।

মাজারের ভেতরে হাজারো মানুষ কফিনের কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করেন। নাজাফে শেষ আনুষ্ঠানিকতা শেষে মরদেহটি অপর পবিত্র শহর কারবালায় নেওয়া হবে।

বৃহস্পতিবার উত্তর-পূর্ব ইরানের নিজ শহর মাশহাদে খামেনিকে দাফনের মধ্য দিয়ে তাঁর শেষকৃত্যের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হবে।

পবিত্র মাজার
খামেনির সঙ্গে নিহত তাঁর পরিবারের সদস্যদের, যাদের মধ্যে তাঁর নাতনিও রয়েছেন, কফিনও বুধবার ভোরে নীরবে নাজাফ ও কারবালার পবিত্র মাজারে নিয়ে যাওয়া হয়।

নাজাফ শিয়া ধর্মীয় শিক্ষার প্রধান কেন্দ্র এবং এটি ইরাকের সর্বোচ্চ শিয়া ধর্মীয় নেতা গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ আলী সিস্তানির আবাসস্থল।

খামেনির পূর্বসূরি আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনিসহ বহু জ্যেষ্ঠ শিয়া আলেম নাজাফে অধ্যয়ন, শিক্ষকতা কিংবা বসবাস করেছেন।

নাজাফের পর আরেকটি শোকযাত্রা কারবালায় অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে ইমাম হুসাইন ও তাঁর ভাই আব্বাসের মাজারে কর্মসূচির সমাপ্তি ঘটবে।

সপ্তম শতাব্দীতে তৃতীয় শিয়া ইমাম হুসাইনের শাহাদাত শিয়া ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এ কারণে প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখো ধর্মপ্রাণ মানুষ কারবালা ও নাজাফে সমবেত হন।

গভীর সম্পর্ক
শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ ইরাক ও প্রতিবেশী ইরানের সম্পর্ক ধর্মীয় ও রাজনৈতিক উভয় ভিত্তিতেই গভীর। তবে এই সম্পর্ক সবসময় এমন ছিল না।

১৯৮০-এর দশকে ইরাকের সাবেক শাসক সাদ্দাম হোসেন, যিনি দেশের শিয়া জনগোষ্ঠীর ওপর দমন-পীড়ন চালিয়েছিলেন, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেন।

কিন্তু ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন আগ্রাসনে সাদ্দাম সরকারের পতন এবং বাগদাদে শিয়া নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর দুই দেশের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ মিত্রতায় রূপ নেয়।

বর্তমানে ইরান ইরাকের প্রভাবশালী রাজনৈতিক শক্তির পাশাপাশি বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকেও সমর্থন দেয়। এসব গোষ্ঠীর কিছু খামেনির মৃত্যুর পর ইরানের সমর্থনে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে যুক্ত হয়ে ইরাকে মার্কিন স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে।

অন্যদিকে ইরাকের আরেক গুরুত্বপূর্ণ মিত্র যুক্তরাষ্ট্র। ফলে ধারাবাহিক সরকারগুলোকে দীর্ঘদিন ধরেই দুই প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির মধ্যে সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখতে হচ্ছে।

বর্তমানে সেই চ্যালেঞ্জ আরও বেড়েছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র ইরাকের ওপর চাপ বাড়িয়েছে, যাতে দেশটি ইরানের প্রভাব কমায় এবং তেহরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে নিরস্ত্র করে।

শোকযাত্রায় অংশ নেওয়া হায়দার জাফর বলেন, ‘ইরাকে ইরানের নীতির সঙ্গে আমি একমত নই। কিন্তু ইসরায়েলি শত্রুর বিরুদ্ধে আমি ইরানের পাশে আছি।’

তিনি বলেন, ‘যারা ইরানের রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে একমত নন, তারাও আজ এখানে এসেছেন। কারণ খামেনি ইসরাইল-আমেরিকার হাতে নিহত হয়েছেন।’