বাসস
  ১০ জুলাই ২০২৬, ২০:২৩
আপডেট : ১১ জুলাই ২০২৬, ০০:৫২

ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামকে ‘আসক্তি তৈরির ছক’ পাল্টানোর নির্দেশ ইইউর, না হলে জরিমানার হুঁশিয়ারি

ঢাকা, ১০ জুলাই, ২০২৬ (বাসস) : ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের ‘আসক্তি তৈরির ছক’ (অ্যাডিকটিভ ডিজাইন) পরিবর্তনের জন্য মেটাকে নির্দেশ দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। তা না হলে প্রতিষ্ঠানটিকে বড় অঙ্কের জরিমানার মুখোমুখি হতে হবে বলে শুক্রবার সতর্ক করা হয়েছে।

ব্রাসেলস থেকে এএফপি জানায়, ইইউর অভিযোগ, মার্কিন প্রযুক্তি জায়ান্ট মেটা বিশেষ করে শিশু ও ঝুঁকিপূর্ণ প্রাপ্তবয়স্ক ব্যবহারকারীদের জন্য প্ল্যাটফর্ম দুটির ঝুঁকি কমাতে ব্যর্থ হয়েছে। কারণ, ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য রাখা হয়েছে, যা ব্যবহারকারীদের দীর্ঘ সময় ধরে প্ল্যাটফর্মে আটকে রাখার জন্য তৈরি।

এসব বৈশিষ্ট্যের মধ্যে রয়েছে অবিরাম স্ক্রল (ইনফিনিট স্ক্রল), অত্যন্ত ব্যক্তিকেন্দ্রিক নিউজ ফিড এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভিডিও চালু (অটোপ্লে) হওয়ার ব্যবস্থা।

ইইউর প্রযুক্তিবিষয়ক প্রধান হেনা ভিরক্কুনেন এক বিবৃতিতে বলেন, ‘ইউরোপের মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষা করা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।’

অনলাইনে ব্যবহারকারী, বিশেষ করে শিশুদের সুরক্ষা জোরদারে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বিগ টেক কোম্পানিগুলোর ওপর চাপ বাড়িয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন।

শুক্রবার প্রকাশিত প্রাথমিক মূল্যায়নে ইউরোপীয় কমিশন জানায়, ইইউর ডিজিটাল কনটেন্টবিষয়ক বিধি লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়ায় মেটাকে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের ডিজাইনে পরিবর্তন আনতে হবে।

কমিশনের মতে, পরিবর্তনের মধ্যে থাকতে পারে- ডিফল্টভাবে ‘অটোপ্লে’ ও ‘ইনফিনিট স্ক্রল’ বন্ধ রাখা, কার্যকর ‘স্ক্রিন টাইম বিরতি’ চালু করা এবং ব্যবহারকারীদের সম্পৃক্ততা বাড়ানোর পরিবর্তে সুপারিশভিত্তিক (রেকমেন্ডার) অ্যালগরিদমকে কম নির্ভরশীল করা।

তবে মেটা জানিয়েছে, তারা কমিশনের পর্যবেক্ষণের সঙ্গে একমত নয়। তারপরও বিষয়টি নিয়ে ইইউর সঙ্গে ‘গঠনমূলকভাবে’ কাজ চালিয়ে যাবে।

কমিশনের এই প্রাথমিক সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হলে, ইইউ মেটার বৈশ্বিক বার্ষিক আয়ের সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ পর্যন্ত জরিমানা করতে পারবে।

এক জ্যেষ্ঠ ইইউ কর্মকর্তা বলেন, ব্রাসেলসের উদ্দেশ্য কোম্পানিগুলোকে শাস্তি দেওয়া নয়।

তিনি বলেন, ‘আমরা পরিবর্তন চাই। আর যদি প্রতিশ্রুতির মাধ্যমেই সেই পরিবর্তন আনা যায়, তাহলে সেটিই আমাদের জন্য সবচেয়ে সন্তোষজনক হবে।’

শিশু সুরক্ষায় উদ্বেগ

সোমবার ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লায়েনের গঠিত বিশেষজ্ঞ প্যানেল অনলাইনে শিশুদের অনুপযুক্ত কনটেন্ট থেকে আরও ভালোভাবে সুরক্ষার সুপারিশ জমা দেওয়ার কথা রয়েছে। এর আগেই এ প্রাথমিক মূল্যায়ন প্রকাশ করা হলো।

অস্ট্রেলিয়ায় ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তের পর ফ্রান্সসহ কয়েকটি সদস্যরাষ্ট্র ইইউজুড়ে একই ধরনের নিষেধাজ্ঞার দাবি জানিয়েছে।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে একই ধরনের সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল টিকটককেও। তখনও ইইউ প্ল্যাটফর্মটির নকশা পরিবর্তনের নির্দেশ দিয়ে বড় অঙ্কের জরিমানার হুঁশিয়ারি দিয়েছিল।

তবে এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, টিকটকের সঙ্গে মেটার কিছু পার্থক্য রয়েছে, কারণ ‘মেটা অনলাইনে অপ্রাপ্তবয়স্কদের সুরক্ষায় সবসময়ই কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করেছে।’

বিদ্যমান ব্যবস্থা পর্যাপ্ত নয়

ডিজিটাল সার্ভিসেস অ্যাক্ট (ডিএসএ) আইনের আওতায় ২০২৪ সালে মেটার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে ইইউ।

শুক্রবারের মূল্যায়নে কমিশন জানায়, ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের স্ক্রিন টাইম নিয়ন্ত্রণের সরঞ্জামগুলো সহজেই উপেক্ষা করা যায়। এছাড়া অভিভাবকীয় নিয়ন্ত্রণ (প্যারেন্টাল কন্ট্রোল) কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে প্রযুক্তিগত জ্ঞান প্রয়োজন হয়।

কমিশনের আরও অভিযোগ, শিশুরা রাতে কতক্ষণ অ্যাপ ব্যবহার করছে কিংবা রিলস ও স্টোরিজের মতো ফিচার কীভাবে অতিরিক্ত বা বাধ্যতামূলক ব্যবহারকে উৎসাহিত করছে—এসব তথ্য মেটা যথাযথভাবে বিবেচনায় নেয়নি।

তবে মেটার দাবি, ইইউর মূল্যায়নে কিশোর-কিশোরীদের সুরক্ষায় তাদের নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপগুলো যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি।

প্রতিষ্ঠানটি জানায়, তদন্ত শুরুর পর তারা ‘টিন অ্যাকাউন্ট’ চালু করেছে, যেখানে অভিভাবকরা রাতে ইনস্টাগ্রাম ব্যবহার বন্ধ রাখতে এবং দৈনিক স্ক্রিন টাইম ১৫ মিনিটে সীমিত রাখতে পারেন।

একই তদন্তের অংশ হিসেবে গত এপ্রিলে ইইউ অভিযোগ করেছিল, ১৩ বছরের কম বয়সী শিশুদের ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম ব্যবহার ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছে মেটা, ফলে তারা অনুপযুক্ত কনটেন্টের সংস্পর্শে আসতে পারে।

এছাড়া, অ্যালগরিদমের মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের ক্রমেই আরও চরমপন্থী বা একই ধরনের কনটেন্টের দিকে নিয়ে যাওয়ার তথাকথিত ‘র‌্যাবিট হোল’ প্রভাবও তদন্ত করে দেখছে ইইউ।

যুক্তরাষ্ট্রেও মেটা একই ধরনের নজরদারির মুখে পড়েছে। চলতি বছরের এক মামলায় আদালত রায় দেন, মেটার প্ল্যাটফর্ম ও ইউটিউব ব্যবহারকারীদের জন্য ক্ষতিকরভাবে আসক্তি তৈরি করে।