বাসস
  ০৮ জুলাই ২০২৬, ১৪:১০

নতুন করে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলা

ঢাকা, ৮ জুলাই, ২০২৬ (বাসস) : হরমুজ প্রণালীতে জাহাজে হামলার জেরে ইরানে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এর জবাবে বুধবার উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে হামলার দাবি করেছে ইরানের বিপ্লবী গার্ড (আইআরজিসি)।

উভয় পক্ষই জানিয়েছে, নতুন করে শুরু হওয়া এ সংঘাতে তারা কয়েক ডজন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। এতে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ অবসানে হওয়া অন্তর্বর্তী চুক্তি নতুন করে চাপের মুখে পড়েছে। তেহরানে একই সঙ্গে তেলের দাম দুই সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল বিক্রির ওপর দেওয়া নিষেধাজ্ঞা শিথিলের সুবিধা প্রত্যাহার করে। এরপর সামরিক স্থাপনাগুলোতে নতুন হামলা চালায়। মার্কিন সামরিক বাহিনীর ভাষ্য, হরমুজ প্রণালীতে তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের হামলার জবাবেই এ অভিযান চালানো হয়েছে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, হরমুজ প্রণালীর আশপাশে একাধিক বিস্ফোরণ হয়েছে। এর মধ্যে কেশম দ্বীপে ছয়টি, সিরিক শহরে সাতটি ও গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী বন্দর আব্বাসে আরও কয়েকটি বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে।

ইরানের পাল্টা জবাবও দ্রুত আসে। দেশটির রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবিতে প্রচারিত এক বিবৃতিতে আইআরজিসি দাবি করেছে, তারা বাহরাইন ও কুয়েতে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক ডজন সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, তাদের বাহিনী ৮০টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে ছিল ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, উপকূলীয় রাডার কেন্দ্র ও আইআরজিসি’র ৬০টি ছোট নৌযান।

সেন্টকম জানায়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক নৌপথে হামলা চালানোর ইরানের সক্ষমতা দুর্বল করাই ছিল এ অভিযানের উদ্দেশ্য।

ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র দুই দেশের সমঝোতা স্মারক ‘গুরুতরভাবে’ লঙ্ঘন করেছে। তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল ও হরমুজ প্রণালীতে ইরানের নেওয়া নতুন ব্যবস্থার লঙ্ঘনকে তিনি এর উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন।

বুধবার ভোরে বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও কুয়েতের সেনাবাহিনী জানায়, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়েছিল। তবে কোনো ধরণের ক্ষয়ক্ষতির তথ্য তারা জানায়নি।

চূড়ান্ত সমঝোতার লক্ষ্যে আলোচনা চলার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেলের ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা শিথিলের সুবিধা প্রত্যাহার করে। এতে তেহরানের ওপর চাপ আরও বেড়ে যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা এএফপিকে বলেন, ‘হরমুজ প্রণালীতে ইরানের কর্মকাণ্ড যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। এর পরিণতি তাদের ভোগ করতে হবে।’

তবে তিনি বলেন, চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছাতে মার্কিন আলোচকরা ‘সৎ উদ্দেশ্যে’ কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

-হরমুজে জাহাজে হামলা-

ব্রিটেনের সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ইউকেএমটিও জানায়, মঙ্গলবার হরমুজ প্রণালীর কাছে একটি ট্যাংকারে ‘অজ্ঞাত একটি ক্ষেপণাস্ত্র’ আঘাত হানে। এতে আগুন ধরে যায়। পরে আরও দুটি জাহাজে হামলা হয়। এর অন্তত একটিতে ড্রোন দিয়ে আঘাত করা হয়।

সেন্টকম জানায়, হামলার শিকার জাহাজগুলো হলো মার্শাল দ্বীপপুঞ্জের পতাকাবাহী আল-রেকাইয়াত, সৌদি আরবের পতাকাবাহী ওয়েদিয়ান ও লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী সাইপ্রাস প্রসপারিটি।

তিনটি জাহাজই ওমান উপকূলের কাছে আক্রান্ত হয়। ওমান নিজ উপকূলঘেঁষা একটি অস্থায়ী নৌপথ ব্যবহারের প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু হরমুজ প্রণালী ব্যবহারকারী জাহাজের কাছ থেকে ফি আদায়ের চেষ্টা করা ইরান ওই উদ্যোগের বিরোধিতা করে।

আল-রেকাইয়াত কাতারের জাহাজ। আন্তর্জাতিক নৌপরিবহনের ওপর এ ‘অগ্রহণযোগ্য’ হামলার নিন্দা জানিয়েছে দোহা। 

একই সঙ্গে তারা ইরানের উপ-রাষ্ট্রদূতকে তলব করে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জানিয়েছে।
রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনায় প্রকাশিত এক বিবৃতিতে কাতারের অভিযোগে ‘দুঃখ প্রকাশ’ করেছে ইরান। তারা এসব অভিযোগকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলেছে।

নতুন হামলার ঘটনায়, বুধবার এশিয়ার লেনদেনের শুরুতেই তেলের দাম ২ শতাংশের বেশি বেড়ে দুই সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এতে বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতার স্থায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

লন্ডনের কিংস কলেজের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ আন্দ্রেয়াস ক্রিগ এএফপিকে বলেন, ‘এখন আমরা এমন এক সংবেদনশীল সময়ে রয়েছি, যখন ইরানের টোল বা ফি ব্যবস্থার সম্ভাব্য বিকল্পগুলো নিয়ে আলোচনা চলছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ইরান স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে, কোনো বিকল্পই তারা মেনে নেবে না।’

ক্রিগের মতে, ইরানের কাছে নিবন্ধন না করে, ওমানের প্রস্তাবিত নৌপথ ব্যবহার করতে চাইলে, ট্যাংকারগুলোকে শাস্তির মুখে পড়তে হবে। 

তিনি এ হামলাকে যুদ্ধবিরতি চুক্তি এবং আন্তর্জাতিক আইনের ‘স্পষ্ট লঙ্ঘন’ বলে মন্তব্য করেন।

গত মাসে ওয়াশিংটন ও তেহরান সমঝোতা স্মারকে সই করার পর ধীরে ধীরে নৌযান চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করেছিল। 

তবে ইরান আগেই জানিয়েছিল, যুদ্ধ-পূর্ব পরিস্থিতিতে আর ফেরা হবে না। অর্থাৎ, আগের মতো জাহাজ অবাধে হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচল করতে পারবে না।

১৪ দফা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালীর তীরবর্তী দেশ ইরান ও ওমানকে উপসাগরীয় অন্য দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনায় বসে এ জলপথের ভবিষ্যৎ প্রশাসন ও সামুদ্রিক সেবার কাঠামো নির্ধারণ করতে হবে।

এর আগে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের হামলার জবাবে উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর ইরান নজিরবিহীন আকাশপথে হামলা চালানোর সময় মধ্যস্থতায় রাজি হয়নি কাতার।

তবে এরপর থেকে দোহা আরও সক্রিয় ভূমিকা নিচ্ছে। গত সপ্তাহে কাতারই ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনার আয়োজন করে।