বাসস
  ০৭ জুলাই ২০২৬, ১৫:০৩

এআই থেকে ‘ঘাতক রোবট’: বৈশ্বিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গড়ার জরুরি আহ্বান জাতিসংঘ মহাসচিবের

ঢাকা, ৭ জুলাই, ২০২৬ (বাসস) : কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির প্রেক্ষাপটে এর বৈশ্বিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, বেসামরিক ব্যবহারের জন্য তৈরি ক্রমবর্ধমান শক্তিশালী এআই চিপ এখন যুদ্ধক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হচ্ছে, যেখানে ‘ঘাতক রোবট’ ইতোমধ্যেই বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।

নিউইয়র্ক থেকে জাতিসংঘ জানায়, সোমবার জেনেভায় অনুষ্ঠিত প্রথম ‘জাতিসংঘ গ্লোবাল ডায়ালগ অন এআই গভর্ন্যান্স’-এ বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি বলেন, বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের জন্য এআই প্রযুক্তির সহজপ্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতের যেকোনো আন্তর্জাতিক চুক্তি হতে হবে ‘বৈশ্বিক আস্থার উপযোগী’, যেখানে নিরাপত্তা- বিশেষ করে শিশুদের নিরাপত্তা- সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে, যাতে তারা ডিজিটাল কারসাজি ও অপব্যবহার থেকে সুরক্ষিত থাকে।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি আনালেনা বেয়ারবকও একই আহ্বান জানিয়ে বলেন, এআইয়ের ‘অশুভ’ দিক মোকাবিলায় সম্মিলিত পদক্ষেপ প্রয়োজন।

তিনি উল্লেখ করেন, বিভিন্ন প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ডিপফেক কনটেন্টের ৯৯ শতাংশই যৌন প্রকৃতির এবং এর ৯৬ শতাংশ নারী ও কিশোরীদের লক্ষ্য করে তৈরি করা হয়।

ডিজিটাল বৈষম্য কমানোর আহ্বান

গুতেরেস বলেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এআই প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা বৈশ্বিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার অন্যতম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। পাশাপাশি ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের সব এআই ডেটা সেন্টারকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিচালিত করারও আহ্বান জানান তিনি।

তিনি বলেন, এআই ‘আমাদের সবার ভবিষ্যতের কেন্দ্রবিন্দুতে’ অবস্থান করছে। তবে এমন ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে ‘যন্ত্র তথ্য দিতে পারে, কিন্তু সিদ্ধান্ত নেবে এবং জবাবদিহি করবে মানুষ।’

তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ২০১৭ সালেই তিনি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে এআই নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিলেন। এরপর গত তিন বছরে এআই অর্থনীতি ও সমাজে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে, ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয়ভাবেই।

এই প্রেক্ষাপটে এআই নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে জাতিসংঘ সোমবার জেনেভায় প্রথম ‘গ্লোবাল ডায়ালগ অন এআই গভর্ন্যান্স’ আয়োজন করে। এতে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, গবেষক, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং শিল্পীরাও অংশ নেন। পরবর্তী বৈশ্বিক সংলাপ ২০২৭ সালের মে মাসে নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

জাতিসংঘের ডিজিটাল ও উদীয়মান প্রযুক্তিবিষয়ক বিশেষ দূত আমানদীপ সিং গিল বলেন, ‘এআই এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, এটি কয়েকজনের হাতে গড়ে ওঠা উচিত নয়। আমাদের এমন একটি বৈশ্বিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও তথ্যভিত্তিক আলোচনা প্রয়োজন।’

এআইবিষয়ক স্বাধীন আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক প্যানেলের সহসভাপতি ইয়োশুয়া বেনজিও বলেন, প্রযুক্তিটির উন্নয়নের গতি কমার কোনো লক্ষণ নেই।

তিনি সতর্ক করে বলেন, সাম্প্রতিক পরীক্ষায় দেখা গেছে, অত্যাধুনিক এআই মডেল মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করতে পারে এবং কখন তাদের পরীক্ষা করা হচ্ছে, সেটিও বুঝতে সক্ষম।

তার ভাষায়, ‘এটি শুনতে বিজ্ঞান কল্পকাহিনির মতো মনে হলেও এটি বাস্তব সম্ভাবনা। এটি এমনভাবে বিশ্বকে বদলে দিতে পারে, যার পরিণতি আমরা এখনো পুরোপুরি বুঝতে পারিনি।’

এআই নিয়ন্ত্রণের সময়রেখা

২০১৭: জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে গুতেরেস এআইয়ের সম্ভাবনা তুলে ধরার পাশাপাশি কর্মসংস্থান, বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও সমাজব্যবস্থার ওপর এর ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করেন।

২০২৩: জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের এআই উপদেষ্টা সংস্থা বৈশ্বিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার আহ্বান জানায়।

২০২৪: ‘প্যাক্ট ফর দ্য ফিউচার’ এবং ‘গ্লোবাল ডিজিটাল কমপ্যাক্ট’ এআই শাসনব্যবস্থা গঠনের ভিত্তি তৈরি করে।

জুন ২০২৬: স্বাধীন আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক প্যানেল সতর্ক করে জানায়, এআই ‘নিজে অথবা অপব্যবহারকারীদের মাধ্যমে ভয়াবহ ক্ষতির কারণ হতে পারে’ এবং প্রযুক্তিটির বিকাশ বৈজ্ঞানিক বোঝাপড়া ও সরকারের অভিযোজন সক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে।

৬–৭ জুলাই ২০২৬: জেনেভায় প্রথম ‘গ্লোবাল ডায়ালগ অন এআই গভর্ন্যান্স’ এবং ‘এআই ফর গুড’ শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। গুতেরেস বলেন, এই সম্মেলনগুলোকে বিশ্বকে ভবিষ্যতের পথনির্দেশনা দিতে হবে।

‘একবিংশ শতাব্দীর মহাসমতা-বিধানকারী’

গুতেরেস বলেন, যথাযথভাবে ব্যবহার ও সবার মধ্যে সমভাবে ছড়িয়ে দেওয়া গেলে এআই কয়েক দশকের উন্নয়নকে কয়েক বছরের মধ্যে এনে দিতে পারে এবং এটি ‘একবিংশ শতাব্দীর মহাসমতা-বিধানকারী’ হয়ে উঠতে পারে।

তবে এর আগে প্রযুক্তিটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং আইনি জবাবদিহির কাঠামো নির্ধারণ করতে হবে।

তিনি বলেন, ‘দেশগুলো যখন পরীক্ষার পদ্ধতি, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং দায়বদ্ধতা নির্ধারণে একমত হয়, তখন নিরাপত্তাও প্রযুক্তির সঙ্গে এগিয়ে যায়। কিন্তু তা না হলে বিচ্ছিন্ন নিয়মকানুন ব্যয় বাড়ায়, বিশ্বকে বিভক্ত করে এবং কাউকেই সুরক্ষা দিতে পারে না।’

শিশুদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব

গুতেরেস ভবিষ্যতের যেকোনো বৈশ্বিক এআই চুক্তিতে শিশুদের নিরাপত্তা ও কল্যাণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান এবং দেশগুলোকে ‘এআই চাইল্ড সেফটি প্লেজ’ গ্রহণের আহ্বান জানান।

তার ভাষায়, ‘কোনো শিশুই যেন নিয়ন্ত্রণহীন এআইয়ের পরীক্ষাগারের নমুনায় পরিণত না হয়। আমরা যেমন কোনো ওষুধ শিশুর কাছে পৌঁছানোর আগে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করি, প্রতিটি খেলনা পরীক্ষা করি, অথচ এআই শিশুদের শিক্ষা, বন্ধুত্ব এবং তাদের সবচেয়ে ব্যক্তিগত প্রশ্নের জগতে পৌঁছে গেছে—এর প্রভাব কী হবে, তা যাচাই করার আগেই।’

এই অঙ্গীকার অনুযায়ী—

শিশুদের জন্য উন্মুক্ত কোনো এআই ব্যবস্থা চালুর আগে শিশু-নির্দিষ্ট নিরাপত্তা পরীক্ষা ও স্বাধীন তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।

শিশুদের যৌন নিপীড়নসংক্রান্ত কোনো ছবি তৈরি, শনাক্ত বা প্রচারে শূন্য সহনশীলতা নীতি অনুসরণ করতে হবে।

কোনো শিশু মানসিক সংকটের লক্ষণ দেখালে এআইকে মানবিক সহায়তার সঙ্গে তাকে যুক্ত করতে হবে।

তিনি বলেন, ‘কোনো শিশু ক্ষতিগ্রস্ত হলে উত্তর হতে পারে না—এটি অ্যালগরিদম করেছে।’

মানবাধিকার অগ্রাধিকার

এআই নিয়ন্ত্রণের দ্বিতীয় প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে গুতেরেস বলেন, মানবাধিকার কোনোভাবেই আপসযোগ্য নয়।

তিনি বলেন, ‘এআই কখনো মানুষের মর্যাদা কেড়ে নিতে পারে না কিংবা বৈষম্যকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারে না। বিচার, স্বাস্থ্যসেবা বা আইনশৃঙ্খলার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে যন্ত্র তথ্য দিতে পারে, কিন্তু সিদ্ধান্ত নেবে এবং তার জবাবদিহি করবে মানুষ।’

সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান

গুতেরেস বলেন, বর্তমানে এআই অবকাঠামোতে বেসরকারি বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৫০০ ট্রিলিয়ন ডলার হলেও উন্নয়নশীল দেশগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে সরকারি বিনিয়োগ তুলনামূলকভাবে ‘অতি সামান্য’।

এই বৈষম্য কমাতে জাতিসংঘের উদ্যোগে ‘এআই সক্ষমতা উন্নয়নে বৈশ্বিক বিনিময় ও সহযোগিতা নেটওয়ার্ক’ গঠনের প্রস্তাবকে ২০টিরও বেশি দেশ সমর্থন করেছে বলে তিনি জানান।

তিনি বলেন, ‘আমরা ডিজিটাল বৈষম্যকে এআই বৈষম্যে এবং এআই বৈষম্যকে উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের বৈষম্যে পরিণত হতে দিতে পারি না।’

পরিবেশগত স্বচ্ছতার আহ্বান

গুতেরেস আবারও বিশ্বের বড় বড় এআই কোম্পানিগুলোকে তাদের ব্যবস্থার কার্বন, পানি ও ভূমি ব্যবহারের পূর্ণ পরিবেশগত প্রভাব প্রকাশ করার আহ্বান জানান। পাশাপাশি ২০৩০ সালের মধ্যে সব ডেটা সেন্টারকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিচালিত করারও আহ্বান জানান তিনি।

তিনি বলেন, ‘এআইকে হয়তো বিমূর্ত মনে হতে পারে, কিন্তু এর পরিবেশগত প্রভাব মোটেও বিমূর্ত নয়।’

তার ভাষায়, ‘২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের ডেটা সেন্টারগুলো বিশ্বের মাত্র পাঁচটি দেশ ছাড়া বাকি সব দেশের চেয়ে বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে পারে। একই সঙ্গে এগুলোর বার্ষিক পানির চাহিদা হতে পারে সাব-সাহারান আফ্রিকার ১৩০ কোটি মানুষের এক বছরের পানির প্রয়োজনের সমান।’