শিরোনাম

ঢাকা, ৭ জুলাই, ২০২৬ (বাসস) : ভেনেজেলায় ভয়াবহ ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য দেশটির সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে সহায়তা কার্যক্রম আরও জোরদার করছে জাতিসংঘ ও এর সহযোগী সংস্থাগুলো। একই সঙ্গে জাতিসংঘের এক প্রাথমিক মূল্যায়নে সরাসরি ভৌত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (৩ হাজার ৭০০ কোটি ডলার) বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
জাতিসংঘ জানায়, সোমবার নিউইয়র্কে নিয়মিত ব্রিফিংয়ে জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র স্তেফান দুজারিক বলেন, ‘আমরা এবং আমাদের সহযোগী সংস্থাগুলো সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য সহায়তা কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণ করছি।’
গত ২৪ জুন ভেনেজেলার উত্তর-মধ্যাঞ্চলে মাত্র ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে ৭ দশমিক ২ এবং ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে।
জাতিসংঘের দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসবিষয়ক কার্যালয় (ইউএনডিআরআর)-এর প্রাথমিক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, আবাসন ও অবকাঠামোর সরাসরি ভৌত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
এর মধ্যে বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও সরকারি স্থাপনাসহ বিভিন্ন ভবনের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (২ হাজার ৪০০ কোটি ডলার)।
অবকাঠামোগত ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (১ হাজার ৩০০ কোটি ডলার)।
অবকাঠামো খাতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থায়, যার পরিমাণ প্রায় ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (৫০০ কোটি ডলার)। এরপরই রয়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা এবং সড়ক অবকাঠামো।
জাতিসংঘ জানিয়েছে, এ হিসাব মাঠপর্যায়ের সরাসরি পরিদর্শনের ভিত্তিতে নয়; বরং ঝুঁকি বিশ্লেষণভিত্তিক মডেল ব্যবহার করে প্রস্তুত করা হয়েছে। এতে সেবা ব্যাহত হওয়া, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ক্ষতি, জরুরি সাড়া দেওয়ার ব্যয়, সরবরাহব্যবস্থার বিঘ্ন কিংবা পুনর্গঠনের ব্যয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ফলে সামগ্রিক অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে শিশু
জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) জানিয়েছে, এ দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে রয়েছে শিশুরা। সংস্থাটির হিসাবে, প্রায় ৬ লাখ ৫০ হাজার মানুষের মানবিক সহায়তা প্রয়োজন, যার মধ্যে ২ লাখ ৩৪ হাজারই শিশু।
রাজধানী কারাকাসসহ ক্যাপিটাল ডিস্ট্রিক্টের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বিদ্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় হাজারো শিক্ষার্থীর শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে।
ইউনিসেফ জরুরি সাড়া প্রদানকারী দল মোতায়েন করেছে এবং ৬৮ টন ত্রাণসামগ্রী পাঠিয়েছে। এসবের মধ্যে রয়েছে চিকিৎসাসামগ্রী, নিরাপদ পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন-সংক্রান্ত সরঞ্জাম এবং প্রয়োজনীয় গৃহস্থালি সামগ্রী।
সংস্থাটি স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি, নিরাপদ পানি, শিশুসুরক্ষা ও শিক্ষা কার্যক্রম সম্প্রসারণের জন্য ৫ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার (৫২০ মিলিয়ন টাকা নয়, ৫ কোটি ২০ লাখ ডলার) তহবিলের আবেদন জানিয়েছে।
মাঠপর্যায়ে ত্রাণ কার্যক্রম
জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয় কার্যালয় (ওসিএইচএ) জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় অনুসন্ধান ও উদ্ধারকাজ এখনো অব্যাহত রয়েছে।
চিকিৎসক, প্রকৌশলীসহ বিশেষজ্ঞ দলগুলো ধারাবাহিকভাবে দুর্গত এলাকায় পৌঁছাচ্ছে। একই সঙ্গে মানবিক চাহিদা নিরূপণের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এর ভিত্তিতে হালনাগাদ ত্রাণ পরিকল্পনা ও অর্থায়নের নতুন আবেদন তৈরি করা হবে।
ভেনেজেলা সরকার জানিয়েছে, এ পর্যন্ত ৩ হাজার ৩৪০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন ১৬ হাজার ৭৪০ জনেরও বেশি এবং প্রায় ১৭ হাজার মানুষ গৃহহীন হয়েছেন।
দুজারিক বলেন, কারাকাসের কর্তৃপক্ষ বাস্তুচ্যুত মানুষের সহায়তা এবং জরুরি মানবিক প্রয়োজন মেটানোর কাজে নেতৃত্ব দিচ্ছে।
এ পর্যন্ত স্টেডিয়াম ও ক্রীড়া কমপ্লেক্সে অন্তত ৭৯টি অস্থায়ী আশ্রয়শিবির খোলা হয়েছে। সেখানে বাস্তুচ্যুত মানুষ আশ্রয় নেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সহায়তা পাচ্ছেন।
জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা ইতোমধ্যে তিনটি আশ্রয়শিবিরে সরাসরি সেবা দিচ্ছে এবং আরও কয়েকটি শিবিরে সহায়তা সম্প্রসারণের সম্ভাবনা যাচাই করছে।
স্বাস্থ্যখাতের অংশীদার সংস্থাগুলো প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, মানসিক স্বাস্থ্য ও মনোসামাজিক সহায়তা এবং প্রয়োজনীয় যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্যসেবা প্রদান করছে।
মানবিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে নিরাপদ পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিধি-সংক্রান্ত কিট বিতরণ এবং স্যানিটেশন অবকাঠামো সম্প্রসারণের কাজও চলছে।
ভেনেজেলার জন্য জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা পরিকল্পনার আওতায় এ পর্যন্ত ২৭ কোটি ৪০ লাখ মার্কিন ডলার (২৭৪ মিলিয়ন ডলার) অর্থ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া বেসরকারি খাতের দাতাদের কাছ থেকে ৩ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলারের (৩২ মিলিয়ন ডলার) বেশি সহায়তা এবং বিভিন্ন পণ্য ও সেবার আকারে অতিরিক্ত অনুদান পাওয়া গেছে।