শিরোনাম

ঢাকা, ৭ জুলাই, ২০২৬ (বাসস) : আফগানিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলীয় কান্দাহার প্রদেশে দূর-দূরান্ত থেকে আমদানি করা গাড়ির যন্ত্রাংশের একসময়কার জমজমাট বাণিজ্য দেশটির সীমান্তবর্তী অঞ্চলের সংঘাতের কারণে কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।
গত বছরের অক্টোবর মাসে প্রতিবেশী পাকিস্তানের সঙ্গে সীমান্তে সহিংসতার জেরে সীমান্ত প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরই স্পিন বোলদাক বাজারে প্রথম বড় ধাক্কা লাগে।
আফগানিস্তানের স্পিন বোলদাক থেকে এএফপি জানায়, কান্দাহার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টের উপপ্রধান আবদুল বাকি বিনা বলেন, ‘পাকিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর আমরা অনেক কষ্টে ইরানের বন্দর আব্বাস বন্দর দিয়েও পণ্য রপ্তানি করতাম। অন্তত তখনও একটি পথ খোলা ছিল।’
জাপানসহ বিভিন্ন দেশ থেকে পাকিস্তান হয়ে স্থলপথে স্পিন বোলদাকে আসা গাড়ির যন্ত্রাংশ পরে সংযুক্ত আরব আমিরাত হয়ে আনা শুরু হয়। পথটি ছিল দীর্ঘ এবং ব্যয়বহুল, তবে অন্তত ব্যবসা চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হচ্ছিল। কিন্তু ফেব্রুয়ারিতে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
বিনা বলেন, ‘এ যুদ্ধ আফগানিস্তানের জন্য অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।’
এ সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালী দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ব্যাপক বিঘ্ন সৃষ্টি হয়। নৌপরিবহন কোম্পানিগুলোও সতর্ক করে জানিয়েছে, এ গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে স্বাভাবিক কার্যক্রম পুরোপুরি ফিরিয়ে আনতে সময় লাগবে।
যুদ্ধের আগে স্পিন বোলদাকে পৌঁছানো যন্ত্রাংশ দিয়ে স্থানীয়ভাবে নতুন গাড়ি সংযোজন করা হতো অথবা সেগুলো দেশের বিভিন্ন স্থানে মেরামতের কাজে সরবরাহ করা হতো।
দুবাই ও জাপান থেকে গাড়ির যন্ত্রাংশ আমদানিকারক আসাদুল্লাহ, যিনি এক নামেই পরিচিত, বলেন, কয়েক মাস ধরে এ সংঘাত ‘ব্যবসাকে পঙ্গু করে দিয়েছে’।
নিজের কার্যালয়ে একটি ঘূর্ণায়মান বৈদ্যুতিক পাখার পাশে বসে তিনি বলেন, ‘আগে প্রতিদিন আমাদের ইয়ার্ডে দুটি করে কনটেইনার খোলা হতো।’
৪০ বছর বয়সী এ ব্যবসায়ী জানান, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর একটি কনটেইনার পরিবহনের খরচ প্রায় ২ হাজার মার্কিন ডলার (প্রায় ২ লাখ টাকা) থেকে বেড়ে ৮ হাজার মার্কিন ডলারে (প্রায় ৮ লাখ টাকা) পৌঁছেছে।
তিনি বলেন, বর্তমানে তার ৩০টিরও বেশি কনটেইনার জাপান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে আটকে আছে। এর প্রধান কারণ দুবাইয়ের জেবেল আলী বন্দরে দীর্ঘসূত্রতা, যা আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
বিশ্বব্যাংক মে মাসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে আফগানিস্তানকে ‘বহিঃস্থ ধাক্কার প্রতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ’ দেশ হিসেবে উল্লেখ করে। এতে বলা হয়, ২০২৫ অর্থবছরে দেশটির আমদানি ও রপ্তানির ব্যবধান জিডিপির ৭০ শতাংশে পৌঁছেছে।
‘এটি সম্পূর্ণ লোকসান’
জাপান থেকে যন্ত্রাংশ আমদানিকারক মাসুদ বলেন, ইরানে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে তার কোনো ব্যবসাই হয়নি।
একটি ক্যালকুলেটর ও হিসাবের খাতার পাশে বসে তিনি এএফপিকে বলেন, ‘আগে প্রতি মাসে কয়েক ডজন, এমনকি শত শত কনটেইনার আমদানি করতাম। এখন তা শূন্যে নেমে এসেছে।’
তিনি জানান, তার কিছু কনটেইনার সংযুক্ত আরব আমিরাত পর্যন্ত পৌঁছেছিল। কিন্তু গুদাম ভাড়ার খরচ বাড়তে থাকায় সেগুলো আবার জাপানে ফেরত পাঠাতে শুরু করেছেন।
পদবি প্রকাশে অনিচ্ছুক মাসুদ বলেন, ‘আমাদের সামনে আর কোনো বিকল্প নেই। অন্য কোনো পথও দেখছি না। এটি সম্পূর্ণ লোকসান।’
এ সংকটের প্রভাব পড়েছে স্পিন বোলদাক বাজারে কর্মরত হাজারো মানুষের ওপর। তাদের একজন ক্রেনচালক ২১ বছর বয়সী মোহাম্মদ নাঈম।
তিনি বলেন, ‘পরিস্থিতির উন্নতি না হলে আমাকে এ পেশা ছেড়ে অন্য কাজ খুঁজতে হবে।’
যেসব অন্ধকার কর্মশালায় একসময় গাড়ি তৈরি হতো, সেখানে এখন কর্মীরা অলস বসে থাকেন। যন্ত্রপাতি ও গাড়ির চাকা ব্যবহারহীন অবস্থায় পড়ে রয়েছে।
এক নাম ব্যবহারকারী ৩০ বছর বয়সী কর্মশালার মালিক সামিউল্লাহ বলেন, আগে তারা প্রতি সপ্তাহে পাঁচ থেকে সাতটি গাড়ি তৈরি করতেন। কিন্তু নতুন যন্ত্রাংশ না আসায় সব কাজ বন্ধ হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, ‘এভাবে চলতে থাকলে আমাদের আর কোনো কাজ থাকবে না। লোকসান দিন দিন বাড়তেই থাকবে।’ কারণ কাজ না থাকলেও তাকে কর্মীদের বেতন পরিশোধ করতে হচ্ছে।
বাজারের একটি গাড়ির শোরুমে জাপান থেকে আমদানি করা যন্ত্রাংশ দিয়ে তৈরি এক ডজন রঙিন গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে মালিক নূর আলী বলেন, ‘স্পিন বোলদাকে খুব কম কনটেইনার আসছে। ফলে ক্রেতার সংখ্যাও কমে গেছে।’
তিনি জানান, এক মাস ধরে তিনি একটি গাড়িও বিক্রি করতে পারেননি।
অবিক্রীত গাড়িগুলোর দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, ‘আশা করি, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো একটি সমঝোতায় পৌঁছাবে এবং হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি খুলে দেওয়া হবে।’