শিরোনাম

ঢাকা, ৭ জুলাই, ২০২৬ (বাসস) : ভেনেজুয়েলার ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দলগুলো তাদের কার্যক্রম গুটিয়ে নিচ্ছে। ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজও শুরু হয়েছে।
কিন্তু রাউল আলভারাদোর জন্য অনুসন্ধান এখনও শেষ হয়নি। স্বেচ্ছাসেবীরা তার ১২ তলা অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের ধসে পড়া ধ্বংসস্তূপে খোঁজ চালাচ্ছেন। আলভারাদো জানেন, ওই ভবনের ভেতরেই আছেন তার মা, বাবা ও বড় ভাই। ভেনেজুয়েলার কারাবাল্লেদা থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।
উপকূলীয় শহর কারাবাল্লেদার সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি ওপিপি-২৬ ভবনের তৃতীয় তলার তাদের ফ্ল্যাটটি এখন চোখের সমান উচ্চতায়। ওপর থেকে ধসে পড়া কংক্রিটের বিশাল স্তূপের নিচে সেটি সম্পূর্ণ চাপা পড়ে আছে।
গত ২৪ জুনের ওই ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা সাড়ে ৩ হাজার ছাড়িয়েছে। তবে আলভারাদোর পরিবারের মতো অসংখ্য মানুষের কাছে এখনও সবচেয়ে বড় লড়াই হলো নিখোঁজ হিসেবে তালিকাভুক্ত কয়েক হাজার মানুষের মরদেহ খুঁজে বের করা।
ভূমিকম্পের ১২ দিন পেরিয়ে গেছে। সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।
ওপিপি কমপ্লেক্সের বিভিন্ন অংশে ইতোমধ্যে খননযন্ত্র দিয়ে ধ্বংসস্তূপ সরানো হচ্ছে। এতে ধ্বংসাবশেষ কেঁপে উঠছে। একই সময় স্বেচ্ছাসেবী ও স্বজনরা প্রিয়জনদের মরদেহ উদ্ধারে ধ্বংসস্তূপ খুঁড়ে চলেছেন।
আলভারাদো বলেন, ‘শেষবার যখন তাদের দেখেছিলাম, তখন তিনজন একসঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন।’
তিনি অন্য একটি কক্ষে থাকায় নিজেই ধ্বংসস্তূপ থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছিলেন।
তিনি বলেন, ‘ভবনটি মানুষে পরিপূর্ণ ছিল। আমার পাশের ফ্ল্যাটের বাসিন্দার পাঁচ নাতি-নাতনি ছিল। তারা সবাই এখন ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়ে আছে।’
ভবনের ধসে পড়া তলাগুলোর স্তরের মধ্যে আটকে আছে একটি মাইক্রোওয়েভ ওভেন, কয়েকটি গদি এবং বিয়ারের বাক্স। এগুলোই ভবনটির আগের জীবনের একমাত্র স্মৃতিচিহ্ন।
কাছেই একটি বড় খননযন্ত্র আরেকটি ভবনের ধ্বংসস্তূপে বারবার আঘাত করছে।
জাতিসংঘের ধারণা, ল্যাটিন আমেরিকার ভয়াবহতম ভূমিকম্পগুলোর একটিতে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ নিখোঁজ হয়ে থাকতে পারেন। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো সরকারি হিসাব প্রকাশ করা হয়নি।
ওপিপি কমপ্লেক্সই একমাত্র ক্ষতিগ্রস্ত ভবন নয়। ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুটি ভূমিকম্পে প্রায় ২০০টি ভবন ধ্বংস বা সম্পূর্ণ ধসে পড়ে। এর বেশির ভাগই উপকূলীয় লা গুয়াইরা এলাকায়, যেখানে ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল ছিল।
আলভারাদোর ভবনের চারপাশজুড়েই ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র। কোনো ভবনের সামনের অংশ সম্পূর্ণ ভেঙে গেছে। কোনোটি পুরোপুরি ধসে পড়ে তলাগুলো একটির ওপর আরেকটি চেপে বসেছে। আবার কিছু ভবন পুরোপুরি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
যেখানে একসময় ওপিপি ভবনগুলো দাঁড়িয়ে ছিল, সেই ধ্বংসস্তূপের ওপর অপেক্ষা করছেন নিখোঁজদের স্বজনদের অনেকে। নিচের তলাগুলোতে পৌঁছাতে স্বেচ্ছাসেবী ও দমকলকর্মীরা কংক্রিটের স্তর ভেদ করে ছোট ছোট সুড়ঙ্গ তৈরি করছেন।
কেউ অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে বসে আছেন। আবার কেউ জেনারেটরচালিত ড্রিল ও গাঁইতি দিয়ে ধ্বংসস্তূপ খুঁড়ছেন। একটি সুড়ঙ্গের ভেতরে চুনে ঢাকা পড়া এক কিশোরীর মরদেহ আটকে থাকতে দেখা গেছে।
একটি সুড়ঙ্গে কাজ করা স্বেচ্ছাসেবী আলনি পাচেকো বলেন, ভূমিকম্পের পর থেকে তারা ১২টি মরদেহ উদ্ধার করেছে। সোমবার তার দল আরও একটি মরদেহ খুঁজে পেয়েছে।
-অনলাইনে নিখোঁজদের খোঁজ-
ভূমিকম্পের পর নিখোঁজদের সন্ধানে একাধিক অনলাইন নিবন্ধন প্ল্যাটফর্ম চালু হয়েছে। এর মধ্যে ‘ভেনেজুয়েলা আর্থকোয়েক ডিসঅ্যাপিয়ার্ড’-এ এখনও ৩০ সহস্রাধিক মানুষ নিখোঁজ হিসেবে তালিকাভুক্ত রয়েছেন। আরেকটি প্ল্যাটফর্ম ‘ভেনেজুয়েলা লুকস ফর ইউ’ জানায়, ২৫ হাজার মানুষকে ইতোমধ্যে খুঁজে পাওয়া গেছে। তবে সেখানে এখনও ১৮ হাজার ১০০ জন নিখোঁজ রয়েছেন।
জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয় কার্যালয়ের (ওসিএইচএ) উপ-মুখপাত্র জেন্স লায়েরকে এএফপিকে বলেন, ‘অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতে নিখোঁজ হিসেবে যাদের নাম রয়েছে, তাদের সংখ্যা উদ্বেগজনক হলেও বিশ্বাসযোগ্য।’
তিনি বলেন, ‘এর অর্থ এই নয় যে তারা সবাই ধ্বংসস্তূপের নিচে আছেন। তবে এটি পরিবারগুলোর দুর্ভোগ কতটা কঠীন, তা স্পষ্ট করে।’
জাতীয় পরিষদের সভাপতি জর্জ রড্রিগেজ বলেন, ড্রোনের ছবি, নিবন্ধন তথ্য ও পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, লা গুয়াইরায় প্রায় ৩০ হাজার মানুষ ছিলেন। তাদের মধ্যে প্রায় ১৯ হাজার ৮০০ জন পালিয়ে যেতে পেরেছেন বা উদ্ধার হয়েছেন।
তবে বাকি প্রায় ১০ হাজার মানুষের অবস্থান সম্পর্কে তিনি কিছু বলেননি। এ সংখ্যার মধ্যে নিশ্চিত মৃতদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে কি না, সেটিও জানাননি।
কানাডার ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির ভূবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাতসু গোদা বলেন, পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প এবং রড-রিইনফোর্সড কংক্রিট নির্মাণের সম্ভাব্য দুর্বলতা মিলেই এত বেশি মানুষ নিখোঁজ হওয়ার অন্যতম কারণ হতে পারে।
তিনি এএফপিকে বলেন, প্রথম ভূমিকম্পে অনেক ভবন দুর্বল হয়ে পড়েছিল। এরপর দ্বিতীয় ভূমিকম্পে বাসিন্দারা বেরিয়ে আসার আগেই আরও বেশি ভবন ধসে পড়ে। ফলে ক্ষয়ক্ষতি বহুগুণ বেড়ে যায়।
তিনি বলেন, ‘রড-রিইনফোর্সড কংক্রিটের ভবন ধসে পড়লে বিপুল পরিমাণ ঘন ধ্বংসস্তূপ তৈরি হয়। এগুলোতে তল্লাশি চালানো অত্যন্ত কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ।’
তিনি আরও বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রে ভবন একের পর এক তলা ধসে 'প্যানকেক' আকৃতিতে বসে যায়। এতে বাসিন্দারা চাপা ধ্বংসস্তূপের স্তরের মধ্যে আটকে পড়েন। ফলে উদ্ধারকাজ ও মরদেহ শনাক্ত করা বিশেষভাবে কঠিন হয়ে পড়ে।’
তিনি বলেন, এত বড় দুর্যোগে ২০১০ সালের হাইতির ভূমিকম্পের মতো অনেক মানুষকে দীর্ঘ সময় নিখোঁজ হিসেবে তালিকাভুক্ত থাকতে হতে পারে।
ওপিপি ভবনের একটি ব্লকে বোন, ভাগনি ও ভগ্নিপতির খোঁজ করা ড্যানিয়েলা আলভারেজ বলেন, সময় দ্রুত শেষ হয়ে আসছে।
তিনি বলেন, ‘মানুষ এখনও ধ্বংসস্তূপের নিচে আছে কি না, তা নিশ্চিত না হয়েই কীভাবে তারা সবকিছু গুঁড়িয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে?’
তিনি বলেন, ‘আমাদের স্বজনদের দেহ খণ্ড-বিখণ্ড অবস্থায় বের করে আনতে হবে।’