শিরোনাম

ঢাকা, ৬ জুলাই, ২০২৬ (বাসস) : চীন সোমবার একটি সাবমেরিন থেকে প্রশান্ত মহাসাগরে প্রশিক্ষণমূলক ডামি ওয়ারহেড বহনকারী একটি ‘কৌশলগত’ ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ করেছে। বেইজিংয়ের এ পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছে এ অঞ্চলের কয়েকটি দেশ।
কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারে চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবে অস্ট্রেলিয়া ও ফিজি যেদিন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করেছে, ঠিক সেদিনই নিজেদের সামরিক সক্ষমতার এ বিরল প্রদর্শন করল চীন।
বেইজিং থেকে এএফপি জানায়, নিউজিল্যান্ড এ পরীক্ষায় পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম একটি ‘দীর্ঘ-পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র’ ব্যবহারের কথা বললেও, চীনের প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এটি আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (আইসিবিএম) ছিল কি না, তা নিশ্চিত করেনি।
এর আগে ২০২৪ সালে চীনের অভিজাত রকেট ফোর্স ফরাসি পলিনেশিয়ার কাছাকাছি সমুদ্রে একটি আইসিবিএম উৎক্ষেপণ করেছিল। আন্তর্জাতিক জলসীমার ওপর দিয়ে ৪০ বছরেরও বেশি সময় পর সেটিই ছিল এ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রের প্রথম উৎক্ষেপণ।
চীনের নৌবাহিনীর এক বিবৃতিতে বলা হয়, স্থানীয় সময় দুপুর ১২টা ১ মিনিটে (গ্রিনিচ মান সময় ০৪০১) একটি পারমাণবিকচালিত সাবমেরিন থেকে প্রশিক্ষণমূলক সিমুলেশন ওয়ারহেড বহনকারী একটি ‘কৌশলগত ক্ষেপণাস্ত্র’ উৎক্ষেপণ করা হয়, যা ‘নির্ধারিত সমুদ্র এলাকায় নির্ভুলভাবে আঘাত হানে’।
চীনের সামরিক আধুনিকায়ন নিয়ে কাজ করা নৌবিশ্লেষক অ্যালেক্স লাক এএফপিকে বলেন, উৎক্ষেপিত ক্ষেপণাস্ত্রটি সম্ভবত সাবমেরিন থেকে নিক্ষেপযোগ্য উন্নত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ‘জেএল-৩’, যা চীনের জেএল-২ ক্ষেপণাস্ত্রের অধিক পাল্লার সংস্করণ।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে বেইজিংয়ে আয়োজিত সামরিক কুচকাওয়াজে জেএল-৩ প্রদর্শন করা হয়েছিল।
তবে লাক বলেন, জেএল-২ ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষাও হয়ে থাকতে পারে।
‘নিয়মিত সামরিক মহড়া’
উইচ্যাটে প্রকাশিত বিবৃতিতে চীনা নৌবাহিনীর মুখপাত্র ওয়াং শুয়েমেং বলেন, এ উৎক্ষেপণ ‘চীনের বার্ষিক সামরিক প্রশিক্ষণের নিয়মিত অংশ’ এবং এ বিষয়ে ‘সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে আগেই অবহিত করা হয়েছিল’।
নিউজিল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইনস্টন পিটার্স বলেন, উৎক্ষেপণের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে তাদের সরকারকে এ বিষয়ে জানানো হয়েছিল।
তিনি এক বিবৃতিতে বলেন, ‘প্রশান্ত মহাসাগর শান্তির মহাসাগর। দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা নিয়ে আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।’
তিনি আরও বলেন, এ ধরনের উৎক্ষেপণ ‘এ অঞ্চলের স্থিতিশীলতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়’।
অস্ট্রেলিয়াও এ উৎক্ষেপণকে ‘অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারী’ বলে মন্তব্য করেছে। জাপান জানিয়েছে, তারা এ বিষয়ে ‘গভীর উদ্বেগ’ প্রকাশ করেছে। অন্যদিকে তাইওয়ান অভিযোগ করেছে, চীন ‘ইচ্ছাকৃতভাবে তার সামরিক শক্তি প্রদর্শন করে এ অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়াচ্ছে’।
চীনের ঘনিষ্ঠ মিত্র রাশিয়া অবশ্য বেইজিংয়ের পদক্ষেপকে সমর্থন জানিয়ে বলেছে, ‘নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করা চীনের সার্বভৌম অধিকার’ এবং ‘চীন বিশ্বের কোনো দেশের জন্য হুমকি নয়’।
এ প্রতিক্রিয়াগুলোর বিষয়ে জানতে চাইলে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং বলেন, এ উৎক্ষেপণ ‘কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা লক্ষ্যবস্তুকে উদ্দেশ্য করে করা হয়নি’।
তিনি বলেন, ‘আশা করি সংশ্লিষ্ট দেশগুলো বিষয়টিকে অতিরঞ্জিতভাবে ব্যাখ্যা করবে না।’
প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন তার পারমাণবিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেছে এবং প্রতিরক্ষা ব্যয়ও বাড়িয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের মে মাস পর্যন্ত চীনের কাছে ৫০০টির বেশি কার্যকর পারমাণবিক ওয়ারহেড ছিল এবং ২০৩০ সালের মধ্যে এ সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার দিনই পূর্বাঞ্চলীয় গুরুত্বপূর্ণ নৌঘাঁটি ও সমুদ্রতীরবর্তী শহর ছিংতাওয়ের উপকূলে রাশিয়ার সঙ্গে বার্ষিক যৌথ নৌমহড়াও শুরু করেছে চীন।
রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, মহড়ায় অংশ নেওয়া যুদ্ধজাহাজগুলো যৌথ গোয়েন্দা নজরদারি, আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা এবং অস্ত্রের বাস্তব ব্যবহারের প্রশিক্ষণ পরিচালনা করবে।
এর আগে সোমবার পাপুয়া নিউগিনির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং নিউজিল্যান্ড সরকারের একটি সূত্র এএফপিকে জানিয়েছিল, চীন প্রশান্ত মহাসাগরে পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম একটি ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
পাপুয়া নিউগিনির পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাস্টিন টকাচেঙ্কো বলেন, ‘হ্যাঁ, চীন আমাকে এ বিষয়ে অবহিত করেছে। চীনের রাষ্ট্রদূত ব্যক্তিগতভাবে আমাকে ফোন করেছিলেন।’
আইসিবিএম পরীক্ষা নিয়ে উদ্বেগ
ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের পর নিউজিল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইনস্টন পিটার্স বলেন, ‘এটি এখন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে, যা আমাদের জন্য উদ্বেগের বিষয়।’
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালের আইসিবিএম পরীক্ষায় চীন সম্ভবত তাদের উন্নত ‘ডং ফেং-৩১’ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছিল, যা তাপ-পারমাণবিক ওয়ারহেড বহনে সক্ষম।
ওই দীর্ঘ-পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রটি আন্তর্জাতিক চুক্তির আওতায় পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত অঞ্চল হিসেবে ঘোষিত প্রশান্ত মহাসাগরের একটি অংশে গিয়ে পড়েছিল।
গত মাসে এএফপির হাতে আসা নিউজিল্যান্ড প্রতিরক্ষা বাহিনীর একটি অভ্যন্তরীণ নথিতে সতর্ক করে বলা হয়, প্রশান্ত মহাসাগরে চীনের নৌতৎপরতা এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা ভবিষ্যতে এ অঞ্চলের ‘স্থায়ী বৈশিষ্ট্যে’ পরিণত হবে।
বিশ্লেষক অ্যালেক্স লাক বলেন, ‘গত কয়েক বছরে চীনের পারমাণবিকচালিত সাবমেরিন বহরের আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘এ প্রবণতার ধারাবাহিকতায় ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার সংখ্যা এবং পরীক্ষার ঘনত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলেই আশা করা যায়।’
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী কয়েক দশকে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের পারমাণবিক পরীক্ষার কারণে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপ রাষ্ট্রগুলো এখনো গভীর ক্ষত বহন করছে।
এদিকে, নতুন হাসপাতাল, আধুনিক সড়ক ও দৃষ্টিনন্দন ক্রীড়া অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে এ অঞ্চলে নিজের প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছে চীন।