শিরোনাম

ঢাকা, ২ জুলাই, ২০২৬ (বাসস) : মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের অবসান ঘটাতে কূটনৈতিক তৎপরতা ধীরে ধীরে এগিয়ে চলার মধ্যে ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির দাফন সম্পন্ন হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরবর্তী পরোক্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে বলে বৃহস্পতিবার জানিয়েছেন মধ্যস্থতাকারীরা।
বুধবার দোহায় দুই দেশের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা শেষে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং মধ্যস্থতাকারী কাতার ও পাকিস্তান কূটনৈতিক অগ্রগতির ইঙ্গিত দিলেও চলতি সপ্তাহে উভয় পক্ষের মধ্যে বিচ্ছিন্ন হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনাও ঘটেছে।
হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া এবং যুদ্ধবিরোধী অন্তর্র্বতী সমঝোতা হলেও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু এখনও আলোচনার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা বাকি রয়েছে।
দোহা থেকে এএফপি জানায়, পাকিস্তান বৃহস্পতিবার জানায়, ‘বুধবার দোহায় কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং এতে ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে।’
ইসলামাবাদ আরও জানায়, ‘দুই পক্ষ ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতার শেষকৃত্যানুষ্ঠান ও দাফনের পর যত দ্রুত সম্ভব পরবর্তী বৈঠকের সময় নির্ধারণে সম্মত হয়েছে।’
৮৬ বছর বয়সী আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি যুদ্ধের প্রথম দিন ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে তাাঁর বাসভবনে নিহত হন। এরপর দ্রুত তাঁর ছেলে মোজতবা খামেনির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়।
শনিবার তেহরানের কেন্দ্রীয় প্রার্থনা ও রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানস্থলে তাঁর রাষ্ট্রীয় শেষকৃত্যানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। আগামী ৯ জুলাই জন্মস্থান উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর মাশহাদের ইমাম রেজার মাজারে তাঁকে দাফন করা হবে।
ইরানের প্রতিনিধি দলের প্রধান উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি বলেন, বুধবারের আলোচনায় সমঝোতা স্মারকের সম্ভাব্য লঙ্ঘনের অভিযোগ জানানো ও নথিভুক্ত করার জন্য বৃহস্পতিবারের মধ্যে একটি যোগাযোগব্যবস্থা চালুর বিষয়ে দুই পক্ষ একমত হয়েছে।
তেহরান আগেই স্পষ্ট করে দিয়েছিল, দোহায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো প্রত্যক্ষ আলোচনা হবে না।
বুধবার এয়ার ফোর্স ওয়ানে ওঠার আগে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘সবকিছু যেভাবে এগোচ্ছে, তাতে ইরানের পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ ভালোভাবেই এগোচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা তাদের ওপর খুব কঠোর আঘাত হেনেছিলাম... কিন্তু এখন আমরা খুব ভালোভাবেই এগোচ্ছি।’
যোগাযোগব্যবস্থা জোরদার
পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কূটনীতিক এএফপিকে জানান, দোহার নিম্নপর্যায়ের এই বৈঠকের মূল লক্ষ্য ছিল সমঝোতা স্মারকের বাস্তবায়ন এগিয়ে নেওয়া এবং ‘লেক লুসার্ন সম্মেলনে’ অর্জিত অগ্রগতির ভিত্তিতে আলোচনা এগিয়ে নেওয়া।
ট্রাম্প আগে আলোচনা প্রত্যক্ষ হবে বলে যে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, তা প্রত্যাখ্যান করে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকাই বলেন, ‘আগামী কয়েক দিনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো পর্যায়েই আলোচনার পরিকল্পনা ইরানের নেই।’
গারিবাবাদি জানান, আলোচনায় ইরানের জব্দ করা সম্পদও উঠে এসেছে। যেকোনো চূড়ান্ত সমঝোতার অংশ হিসেবে এসব সম্পদ মুক্ত করার দাবি জানিয়েছে তেহরান।
তিনি বলেন, প্রাথমিক ৬০০ কোটি মার্কিন ডলারের একটি অংশ কীভাবে ব্যবহার করা হবে, তা পর্যালোচনা করা হয়েছে এবং ইরানের প্রয়োজনীয় পণ্য কেনা ও সরবরাহের বিষয়ে সম্মতি হয়েছে।
ওই কূটনীতিক জানান, মঙ্গলবার কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আল থানির সঙ্গে বৈঠকের পর যুক্তরাষ্ট্রের দূত জ্যারেড কুশনার ও স্টিভ উইটকফ দোহার কারিগরি পর্যায়ের আলোচনায় অংশ নেননি।
বুধবার কাতারের আমিরের দপ্তর জানায়, কুশনার ও উইটকফ দেশটির আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানির সঙ্গেও বৈঠক করেছেন।
হরমুজ নিয়ে নতুন বাকযুদ্ধ
গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা হওয়ার পরও উপসাগরীয় অঞ্চলে দুই পক্ষের মধ্যে হামলা-পাল্টা হামলা অব্যাহত রয়েছে।
তেহরান অভিযোগ করে, অনুমোদিত পথ ছেড়ে যাওয়ায় একটি বাণিজ্যিক জাহাজকে লক্ষ্য করে তারা হামলা চালায়। এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, তারা ইরানের ১০টি সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে।
পরে ইরান কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালায়। কুয়েত ও বাহরাইন উভয়েই এ হামলার নিন্দা জানায়।
বুধবার সেন্টকম জানায়, বাহরাইনে তাদের আয়োজিত এক আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংলাপে উপসাগরীয় অঞ্চলসহ ১২টি দেশের প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা অংশ নেন।
সেন্টকম এক্সে জানায়, ‘হরমুজ প্রণালি দিয়ে অবাধ বাণিজ্যিক নৌযান চলাচল নিশ্চিত করার বিষয়ে নেতারা তাঁদের অভিন্ন অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন।’
এর জবাবে বৃহস্পতিবার গারিবাবাদি বলেন, ‘হরমুজ প্রণালী সেন্টকমের নয়, ইরানের নিয়ন্ত্রণাধীন।’
তিনি বলেন, ‘বাহরাইনে অনুষ্ঠিত কোনো সামরিক সম্মেলন পারস্য উপসাগরের নিরাপত্তা ও আইনগত শৃঙ্খলা নির্ধারণ করতে পারে না।’
গারিবাবাদির ভাষায়, ‘এই অঞ্চলে বিদেশি হস্তক্ষেপের অবসান, যুক্তরাষ্ট্রের সেনা প্রত্যাহার, দেশগুলোর সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান এবং নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা মেনে নেওয়ার মাধ্যমেই আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে—যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ছাতার মাধ্যমে নয়।’
ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ মঙ্গলবার বলেন, ‘এ ধরনের বড় যুদ্ধের অবসান হলে বাস্তবায়ন পর্যায়ে চ্যালেঞ্জ, বিচ্ছিন্ন ঘটনা এবং মতপার্থক্য থাকবেই, বিশেষ করে ইসরাইলের মতো পক্ষ জড়িত থাকলে।’
এদিকে লেবানন সীমান্তেও ইসরাইল ও ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর মধ্যে সংঘর্ষ তুলনামূলকভাবে শান্ত রয়েছে।
মার্চ মাসে ইসরাইলে রকেট হামলা চালিয়ে হিজবুল্লাহ লেবাননকে বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলে। এর জবাবে ইসরাইল বিমান হামলা ও স্থল অভিযান শুরু করে।
তেহরান বরাবরই বলে আসছে, যেকোনো চূড়ান্ত সমঝোতার অংশ হিসেবে লেবানন সংঘাতের অবসান এবং দক্ষিণ লেবাননের দখলকৃত এলাকা থেকে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহার নিশ্চিত করতে হবে।