বাসস
  ০২ জুলাই ২০২৬, ১৫:৪৫

দক্ষিণ আফ্রিকা ছেড়ে ফিরে এসে নতুন করে জীবন গড়ার লড়াইয়ে অভিবাসন প্রত্যাশীরা

ঢাকা, ২ জুলাই, ২০২৬ (বাসস): মালাউইয়ের প্রত্যন্ত গ্রামের বাড়িতে ফিরে দক্ষিণ আফ্রিকায় বিদেশিবিরোধী স্বেচ্ছাসেবী গোষ্ঠীর হামলার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করছিলেন আহামাদি আসসানি। ওই হামলার পর কয়েকটি ব্যাগ ছাড়া আর কিছুই সঙ্গে নিতে পারেননি তিনি। বাধ্য হয়ে দেশটি ছেড়ে পালিয়ে আসেন। 

মালাউইর সালিমা থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, অবৈধ অভিবাসীরা তাদের চাকরি ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দখল করে নিচ্ছে। এ অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে অবৈধ অভিবাসীদের দেশ ছাড়ার জন্য অনানুষ্ঠানিকভাবে ৩০ জুন পর্যন্ত সময় বেঁধে দেওয়া হয়। এ সময়সীমা ঘিরেই বিদেশিদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হয়।

মালাউইয়ের মনাম্বা গ্রামের বাসিন্দা আসসানি এএফপিকে বলেন, ‘প্রাণের ভয়ে আমরা ঘরের ভেতরে লুকিয়ে ছিলাম।’ মাটির ইটের তৈরি, অসমান মেঝে ও জীর্ণ দেয়ালের ওই গ্রামটি গ্রামীণ মালাউইয়ের একটি সাধারণ জনপদ।

তিনি জানান, এরপর একদল হামলাকারী দক্ষিণ আফ্রিকার পিটারম্যারিটজবার্গ শহরে তাঁর বাসায় ঢুকে দরজা ভেঙে ফেলে এবং বাসিন্দাদের ওপর হামলা চালায়।

আসসানি পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও তাঁর দাবি, ওই ঘটনায় দুই মালাউই নাগরিক নিহত এবং আরও দুজন আহত হন।

তবে দক্ষিণ আফ্রিকার পুলিশ অস্থিরতার ওই সময় থেকে এ পর্যন্ত একজন মালাউই নাগরিক, দুজন মোজাম্বিকের নাগরিক এবং একজন ইথিওপীয় নাগরিক নিহত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

৩৩ বছর বয়সী আসসানি বলেন, ‘এটি ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে দেওয়া অন্যতম অভিজ্ঞতা।’

তিনি বলেন, ‘আমরা কিছুই সঙ্গে আনতে পারিনি।’ রাজধানী লিলংওয়ে থেকে ১২০ কিলোমিটার পূর্বে সালিমা জেলার এই গ্রামে ফিরে আসা প্রায় ১৫ জনের একজন তিনি।
‘আর কখনো ফিরব না’-

কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নির্ধারিত সময়সীমার আগে ১৫  সহস্রাধিক মালাউই নাগরিক দক্ষিণ আফ্রিকা ছেড়েছেন। 

এছাড়া ঘানা, নাইজেরিয়া ও জিম্বাবুয়েসহ বিভিন্ন দেশের হাজারো নাগরিকও দেশটি ছেড়ে গেছেন।

তাদের অনেককেই নিজ নিজ সরকার সহায়তা করেছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় সময়ে সময়ে বিদেশিবিরোধী সহিংসতা ঘটলেও এবারই প্রথম একাধিক দেশের সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে নিজ নিজ নাগরিকদের দেশে ফিরিয়ে নেয়।

এক বছরের বেশি সময় আগে আসসানি দক্ষিণ আফ্রিকায় গিয়েছিলেন। বহু দশক ধরে হাজারো মালাউই নাগরিককে যেমন কাজ, আয় এবং পরিবারের জন্য ভালো ভবিষ্যতের আশায় সীমান্ত পাড়ি দিতে দেখা গেছে, তাঁরও লক্ষ্য ছিল একই।

তিনি এক ইথিওপীয় নাগরিকের মালিকানাধীন একটি দোকানে কাজ পান। সামান্য সেই বেতনই তাঁর জীবনে বড় পরিবর্তন এনে দিয়েছিল।

তিনি বলেন, ‘আমি বাড়িভাড়া দিতে পেরেছি, দেশে থাকা স্বজনদের সহায়তা করতে পেরেছি এবং সন্তানদের স্কুলের খরচ চালাতে পেরেছি।’

তবে সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতার পর তিনি আর কখনো দক্ষিণ আফ্রিকায় ফিরতে চান না।

আসসানি বলেন, ‘দক্ষিণ আফ্রিকায় ফিরে যাওয়ার চেয়ে আমি বরং এখানেই দারিদ্র্েযর মধ্যে মারা যেতে চাই।’
‘আর সেখানে আমাদের চাওয়া হচ্ছে না’-

৩২ বছর বয়সী হাওয়া ত্রোকো আট মাস বয়সী সন্তানকে পিঠে বেঁধে এবং যতটুকু বহন করা সম্ভব, শুধু ততটুকু জিনিসপত্র নিয়েই সালিমায় ফিরে আসেন।

স্বামী দক্ষিণ আফ্রিকায় থেকে গেলেও তিনি ফিরে আসেন।

ত্রোকো বলেন, ‘শুনেছিলাম অনেকের ওপর হামলা হচ্ছে, তাদের সম্পদ লুট করা হচ্ছে, এমনকি কেউ কেউ নিহতও হচ্ছেন।’

সরকারি বাসে আসন পাওয়ার আগে তাঁকে পাঁচ দিন একটি অস্থায়ী শিবিরে থাকতে হয়। পরে তিনি দেশে ফিরে আসেন। কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকায় গিয়ে যেসব সমস্যার সমাধান চেয়েছিলেন, সেই ক্ষুধা, বেকারত্ব ও দারিদ্র্যই আবার তাঁর সামনে ফিরে আসে।

৩১ বছর বয়সী ত্বাইবু হুসেইনের জন্য মালাউইয়ে ফিরে আসার অর্থ ছিল ডারবানে কাটানো এক দশকের জীবনের ইতি টানা। সেখানে তিনি দর্জি ও আসবাবপত্র নির্মাতা হিসেবে কাজ করতেন।  

এ বছর পরিস্থিতি বদলে যায়।

হুসেইন এএফপিকে বলেন, ‘বিদেশিবিদ্বেষ এখন বড় একটি সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনকি পুলিশ কর্মকর্তারাও কর্মস্থলে এসে লোকজনকে ধরে শিবিরে নিয়ে যাচ্ছিলেন। এতে স্পষ্ট হয়ে যায়, বিদেশিদের আর সেখানে চাওয়া হচ্ছে না।’

তিনি জানান, নিজ দেশে ফেরার জন্য যে ডারবান শিবিরে তিনি অপেক্ষা করছিলেন, সেখানে ১০ সহস্রাধিক মানুষ ছিলেন।

তিনি বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত একটি টিকিট পাওয়া ছিল অলৌকিক ঘটনার মতো।’ জায়গা পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠা ফেরত যেতে চাওয়া মানুষের মধ্যে বিরোধের কথাও তুলে ধরেন তিনি।
হুসেইন বলেন, ‘আমরা না খেয়ে ছিলাম। গোসল করতে পারিনি। অনেক মানুষ অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন।’

‘নিজের জীবনের জন্য ভয় পেয়েছিলাম’-

জিম্বাবুয়েতে ফিরে আসার পর গত দুই সপ্তাহ ধরে প্রায় প্রতিদিন বিকেলে রাজধানী হারারের উপকণ্ঠের চিতুংউইজায় শীতের রোদে অন্য বেকার পুরুষদের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন টাকেসুরে নিয়াও।

তিন সন্তানের ৪৫ বছর বয়সী এই বাবা এএফপিকে বলেন, ‘আমি ঘুমাতে পারি না।’

তিনি জানান, গত ১৩ জুন দক্ষিণ আফ্রিকার কোয়াজুলু-নাটাল প্রদেশে তাঁর বাড়িতে একদল যুবক এসে তাঁকে সেখান থেকে চলে যেতে বলে।

পেশায় কাঠমিস্ত্রি নিয়াও বলেন, ‘তারা আমার জিনিসপত্র নিয়ে যেতে শুরু করে। প্রথমে ফ্রিজ নিয়ে যায়, তারপর টেলিভিশন। এরপর তারা আমার কাজের সরঞ্জামের দিকে যায়।’

তিনি বলেন, ‘যখন তারা বিছানাটি নিতে আবার ফিরে আসতে চাইল, তখন আমি দরজা বন্ধ করে দিই। কারণ তাদের হাতে বড় বড় ছুরি ছিল। আমি নিজের জীবন এবং আমার সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে ভীত ছিলাম।’

পরদিন তিনি স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে শুধু একটি কাপড়ের ব্যাগ এবং কয়েকটি ছোটখাটো জিনিস সঙ্গে নিয়ে পালিয়ে যান। পেছনে রেখে আসেন আসবাবপত্র, কাঠের কাজের যন্ত্রপাতি এবং ক্রেতাদের কাছে পাওনা অর্থ।