বাসস
  ২৯ জুন ২০২৬, ১৬:৪২

ভেনেজুয়েলায় জীবিত উদ্ধারের আশা ক্ষীণ, তল্লাশি অব্যাহত

ঢাকা, ২৯ জুন, ২০২৬ (বাসস) : ভেনেজুয়েলায় শক্তিশালী দুটি ভূমিকম্প আঘাত হানার চার দিনের বেশি সময় পরও উদ্ধার অভিযান চলছে। তবে ধ্বংসস্তূপের নিচে জীবিত কাউকে খুঁজে পাওয়ার আশা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে। এদিকে অন্তত এক হাজার ৪৫০ জনের প্রাণহানির এ দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারের ভূমিকা নিয়ে বাসিন্দাদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে।

এএফপি’র সাংবাদিকরা জানান, রোববার কারাবালেদা শহরে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে এক ব্যক্তি ও তার কিশোর ছেলেকে জীবিত উদ্ধার করেছে ফরাসি ও মার্কিন উদ্ধারকারী দল। শহরটি রাজধানী কারাকাস থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত। 

লা গুয়াইরা থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।

এই উদ্ধার অভিযানে কিছুটা আশার সঞ্চার হলেও, দেশটি এখনো গভীর মানবিক সংকটের মধ্যে রয়েছে। 

অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত ভেনেজুয়েলায় এ ভূমিকম্প নতুন বিপর্যয় ডেকে এনেছে। 

আটকা পড়াদের উদ্ধারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ৭২ ঘণ্টার সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও এখনো কয়েক হাজার মানুষের সন্ধান মেলেনি।

এছাড়া আরও কয়েক মিলিয়ন মানুষ স্যানিটেশনসহ মৌলিক নানা সেবার বাইরে রয়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এটি ল্যাটিন আমেরিকার ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ ভূমিকম্পে পরিণত হয়েছে।

জাতীয় পরিষদের প্রেসিডেন্ট হোর্হে রড্রিগেজ রোববার জানান, বুধবার সন্ধ্যায় ৭ দশমিক ২ এবং ৭ দশমিক ৫ মাত্রার পরপর দুটি ভূমিকম্পে ৭৭৪টি ভবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১৮৯টি ভবন সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে।

উপকূলীয় শহর তুকাকাসে ধসে পড়া একটি ভবনের স্তূপে আটকে পড়াদের সন্ধানে উদ্ধার কর্মীরা খোঁড়াখুঁড়ি চালিয়ে যাচ্ছেন।

উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া ২৭ বছর বয়সী লুইস সালাস এএফপিকে বলেন, ‘সবচেয়ে কঠিন মুহূর্ত ছিল, যখন আমরা সুড়ঙ্গের ভেতরে আশার আলো দেখেছি। হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়েছি, ধ্বংসস্তূপ সরিয়েছি, সর্বশক্তি ও বিশ্বাস নিয়ে কাজ করেছি। কিন্তু নির্ধারিত স্থানে পৌঁছে তাদের মৃত অবস্থায় পেয়েছি।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর প্রথম ৭২ ঘণ্টাই জীবিতদের উদ্ধারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। 

এরপর সাধারণত উদ্ধার অভিযান লাশ উদ্ধারে রূপ নেয়।

রাজধানী কারাকাসের সান বার্নারদিনো এলাকায় স্বেচ্ছাসেবীরা ধসে পড়া একটি ভবনের ওপর উঠে ড্রিল মেশিন দিয়ে কংক্রিট ভাঙছেন। পাশাপাশি সারিবদ্ধভাবে হাতে ধ্বংসস্তূপ সরাচ্ছেন।

কারাকাসের আরেক এলাকা চাকাওয়ে সাধারণত বিজ্ঞাপনের জন্য ব্যবহৃত একটি ভবনের বড় বড় ইলেকট্রনিক পর্দায় নিখোঁজ ব্যক্তিদের ছবি প্রদর্শন করা হচ্ছে।

রোববার হোর্হে রড্রিগেজ জানান, মৃতের সংখ্যা বেড়ে এক হাজার ৪৫০ জনে পৌঁছেছে। এ সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। এছাড়া অন্তত তিন হাজার ১৫০ জন আহত হয়েছেন।

-‘একা পারছি না’-

সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটিতে উপকূলীয় শহর লা গুয়াইরায় ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া পরিবারের চার সদস্যকে খুঁজতে এসেছেন হেক্টর আগুইলেরা।

তিনি বলেন, ‘আমাদের পরিবারের সদস্যদের বের করে আনার মতো কোনো সহায়তা পাচ্ছি না। একা এটা সম্ভব নয়। তারা ওখানেই চাপা পড়ে আছেন। আমরা জানি যে তারা মারা গেছেন। তবুও আমরা এখানে আছি।’

উদ্ধার অভিযান চললেও কয়েকটি এলাকায় জনঅসন্তোষ বাড়ছে।

তুকাকাসের স্বেচ্ছাসেবক এডুয়ার্ডো কার্ডোজো বলেন, সময়মতো তল্লাশি চালানো হলে, কিছু মানুষকে বাঁচানো যেত। 

লা গুয়াইরা অঙ্গরাজ্যের তানাগুয়ারেনা এলাকায় এক ব্যক্তি সেনাদের উদ্দেশে বলেন, ‘দেশের আপনাদের দরকার। অস্ত্র নামিয়ে কোদাল-শাবল হাতে নিন।’

লা গুয়াইরা শহরে লুটপাটের ঘটনাও ঘটেছে। শহরের বড় অংশ এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ফার্মেসি ও সুপারমার্কেটসহ বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে লুটপাট হয়েছে। 

অনেকেই অভিযোগ করেছেন, ভূমিকম্প-পরবর্তী সরকারি সহায়তা খুব ধীরগতির ও অপ্রতুল।

ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রড্রিগেজ রোববার বলেন, যাদের বাড়িঘর ধ্বংস হয়েছে, তাদের জন্য অস্থায়ী আশ্রয়শিবির নির্মাণ করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘একই সঙ্গে এমন প্রকল্পের পরিকল্পনা শুরু হয়েছে, যার মাধ্যমে খুব অল্প সময়ের মধ্যে নতুন বাড়ি নির্মাণ করা সম্ভব হবে।’

-অর্থনৈতিক প্রভাব-

রড্রিগেজ রোববার উদ্ধারকর্মীদের প্রশংসা করে বলেন, ‘আমরা এখনো জীবিত মানুষ উদ্ধার করছি। তাই এ প্রচেষ্টা বন্ধ করা হবে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা সব সময় আশা আঁকড়ে ধরে থাকি।’

স্বেচ্ছাসেবক কার্ডোজোও আশাবাদী। 

তিনি বলেন, ‘আমরা এখনো অপেক্ষা করছি। দেখা যাক, আর কাউকে উদ্ধার করা যায় কি না।’

রদ্রিগেজ জানান, ২৪টি দেশ থেকে ৫২১ টন ত্রাণসামগ্রী এসেছে। এছাড়া ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়া মানুষ শনাক্তে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুরসহ ৮৬টি ইউনিট ও দুই হাজার ৭০০ জনের বেশি অনুসন্ধান ও উদ্ধারকর্মী পাঠানো হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সাউদার্ন কমান্ড জানায়, মার্কিন হেলিকপ্টারে ত্রাণসামগ্রী আনা হয়েছে। বিমানবন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো ও ত্রাণ কার্যক্রম জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ একটি সমুদ্রবন্দর পুনরায় চালু করতে আরও ২৩০ জন মার্কিন সামরিক সদস্য সহায়তায় আসছেন।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে কারাকাসে সামরিক অভিযানে ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করা যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে দেশটিতে ২৫০ সদস্যের একটি দুর্যোগ মোকাবিলা দল পাঠিয়েছে।

জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থা জানায়, জনসংখ্যা ও ক্ষয়ক্ষতির তথ্য অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৬৭ লাখ ৬০ হাজার মানুষ এ দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। তাদের আশ্রয়, বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন, স্বাস্থ্যসেবা ও জরুরি ত্রাণসামগ্রীর প্রয়োজন হবে।

এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে ভেনেজুয়েলার সবচেয়ে ভয়াবহ এ ভূমিকম্প এমন সময়ে আঘাত হেনেছে, যখন তেলসমৃদ্ধ দেশটি এক দশকের বেশি সময় ধরে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মধ্যে রয়েছে।

দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক সংকটে দেশটির হাসপাতাল ও জনসেবামূলক ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। এতে কয়েক লাখ মানুষ দেশ ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছে।

জাতিসংঘের হিসাবে, এ ভূমিকম্পে ভৌত অবকাঠামোর ক্ষতির পরিমাণ ৬ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। যা ভেনেজুয়েলার মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ছয় শতাংশের সমান।