শিরোনাম

ঢাকা, ২৯ জুন, ২০২৬ (বাসস) : ইসরাইলি বাহিনী রোববার দক্ষিণ লেবাননে একটি বিস্তৃত সুড়ঙ্গ ধ্বংস করেছে। এ সময় ওই এলাকায় একাধিক হামলার খবর দিয়েছে লেবাননের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম।
ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ বলেছে, এসব হামলার জবাব দেওয়ার অধিকার তারা রাখে।
শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় লেবানন ও ইসরাইল একটি ত্রিপক্ষীয় কাঠামো চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। দুই দেশের মধ্যে শান্তির পথ সুগম করা ও ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার লক্ষ্যেই এ চুক্তি হয়। এর মধ্যেই এসব ঘটনা ঘটল।
বৈরুত থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ তথ্য জানিয়েছে।
লেবাননের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা এনএনএ জানায়, রোববার দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর নাবাতিয়েহসহ কয়েকটি এলাকায় ইসরাইল হামলা চালায়।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, দক্ষিণাঞ্চলে ইসরাইলের ছোড়া একটি স্টান গ্রেনেডে দুই জন আহত হয়েছে।
ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজ ও প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, ‘দুইশ’ মিটারের বেশি দীর্ঘ ও ২৫ মিটারেরও বেশি গভীর এই সুড়ঙ্গে কয়েক শত অস্ত্র এবং ইসরাইল রাষ্ট্র ও এর বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করে হামলা চালানোর জন্য ব্যবহারের উদ্দেশে নির্মিত একাধিক উৎক্ষেপণ শ্যাফট ছিল।’
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘অবকাঠামোটি ধ্বংসের আগে ইসরাইল যুক্তরাষ্ট্র ও লেবাননে নিযুক্ত মার্কিন প্রতিনিধিকে বিষয়টি জানিয়ে দিয়েছিল।’
দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূলীয় শহর টাইরে অবস্থানরত এএফপি’র এক প্রতিবেদক জানান, মাজদাল জুন গ্রামের কাছে বিস্ফোরণের স্থান থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে তিনি ধোঁয়া উঠতে দেখেছেন।
তিনি বলেন, লেবাননের সংবাদমাধ্যমে ইসরাইল কাছাকাছি এলাকায় বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে— এমন খবর প্রচারের পর টাইরের দক্ষিণের বিভিন্ন শহরের বাসিন্দারা এলাকা ছেড়ে চলে যান।
রোববারের হামলার প্রতিক্রিয়ায় হিজবুল্লাহ এক বিবৃতিতে জানায়, ‘শত্রুপক্ষ যা করেছে, তা এখন পর্যন্ত তারা যে যুদ্ধবিরতি মেনে এসেছে তার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। তারা এসব লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো পর্যবেক্ষণ করছে। নিজেদের মাতৃভূমি ও জনগণকে রক্ষার অধিকার তারা সংরক্ষণ করে।’
-হিজবুল্লাহর ওপর চাপ-
ইসরাইলি সেনাবাহিনী জানায়, দক্ষিণ লেবাননে যুদ্ধে তাদের এক সেনা নিহত হয়েছেন।
পরে তারা জানায়, তাদের বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ানো হিজবুল্লাহর এক সদস্যকে হত্যা করা হয়েছে।
মার্চ মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নিহত হওয়ার প্রতিশোধ নিতে ইসরাইলের দিকে রকেট ছুড়ে হিজবুল্লাহ মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে লেবাননকে জড়িয়ে ফেলে।
এর জবাবে ইসরাইল ব্যাপক বিমান হামলা ও স্থল অভিযান চালায়।
লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন শনিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে জানান, চুক্তি বাস্তবায়নে তার দেশ ‘নিজেদের দায়িত্ব পালন করবে।’
চুক্তি অনুযায়ী, লেবাননের সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রণ নেবে— এমন ‘পাইলট জোন’ গঠন করে বৈরুত হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার পরই কেবল অধিকৃত লেবাননের ভূখণ্ড থেকে ইসরাইল সেনা প্রত্যাহার করবে।
ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এ চুক্তিকে তার দেশের জন্য ঐতিহাসিক ও তেহরানের জন্য বড় ধাক্কা বলে আখ্যা দেন।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইেল কাৎজ জোর দিয়ে বলেন, যতদিন হিজবুল্লাহর কাছে অস্ত্র থাকবে, ততদিন ইসরাইলি সেনারা লেবাননে অবস্থান করবে।
-'অভ্যন্তরীণ সংঘাত'-
শুরু থেকেই ইসরাইলের সঙ্গে আলোচনার বিরোধিতা করে আসছে হিজবুল্লাহ। সংগঠনটি এ চুক্তিও প্রত্যাখ্যান করেছে।
হিজবুল্লাহ প্রধান নাইম কাসেম শনিবার বলেন, তাদের কাছে এ চুক্তি ‘বাতিল ও অকার্যকর।’
রোববার এএফপি’র এক প্রতিবেদক জানান, শহরের হিজবুল্লাহ-নিয়ন্ত্রিত দক্ষিণ উপশহরের পাশ দিয়ে যাওয়া বৈরুত বিমানবন্দর সড়কে ‘লেবানন ফার্স্ট’ লেখা একটি সাইনবোর্ডে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর আগে সেখান থেকে ‘ধন্যবাদ ইরান’ লেখা বিলবোর্ড সরিয়ে ফেলা হয়েছিল।
হিজবুল্লাহর সংসদ সদস্য হাসান ফাদলাল্লাহ রোববার বলেন, ‘কর্তৃপক্ষ যা করেছে, তা দেশকে বিশৃঙ্খলার দিকে ঠেলে দেওয়া ও শত্রুর সঙ্গে সংঘাতকে অভ্যন্তরীণ সংঘাতে রূপ দেওয়ার উদ্দেশ্যে উসকানির শামিল।’
লেবাননের পার্লামেন্টের স্পিকার ও হিজবুল্লাহর মিত্র নাবিহ বেরি বলেন, বর্তমান অবস্থায় এ চুক্তি পাস হবে না।
তিনি এটিকে এমন একটি চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত বলে অভিহিত করেন, যা ‘লেবাননের অধিকার’ সংরক্ষণ করে না।
নাবিহ বেরি রাজনৈতিকভাবে এর মোকাবিলার অঙ্গীকার করেন এবং অভ্যন্তরীণ সংঘাতের বিষয়ে সতর্ক করেন।
তিনি বলেন, ‘এটি ১৯৮৩ সালের ১৭ মে স্বাক্ষরিত চুক্তির চেয়েও দশ গুণ খারাপ।’
নাবিহ বেরি লেবানন ও ইসরাইলের মধ্যে সর্বশেষ শান্তি চুক্তির উল্লেখ করেন।
ওই চুক্তি পর সিরিয়া ও তাদের লেবাননি মিত্রদের চাপে বাতিল করা হয়।
হিজবুল্লাহ বারবার লেবাননের কর্তৃপক্ষকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ অবসানের জন্য ইরানের আলোচনার সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ত করার আহ্বান জানিয়েছে।
অন্যদিকে তেহরান জোর দিয়ে বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের যেকোনো যুদ্ধবিরতির মধ্যে লেবাননকেও অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে।
নাবিহ বেরির সঙ্গে টেলিফোনে আলাপকালে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার ও তেহরানের আলোচক দলের প্রধান মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য লেবাননের যুদ্ধের অবসান ঘটানো, শরণার্থীদের নিজ নিজ বাড়িতে ফিরিয়ে আনা, দখলদারিত্বের অবসান ও লেবাননের ভূখণ্ড থেকে জায়নবাদী শাসনের প্রত্যাহার নিশ্চিত করা।’