শিরোনাম

ঢাকা, ২৮ জুন, ২০২৬ (বাসস) : যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ পুনরায় শুরু করতে বাধ্য হলে ইরানের ‘অস্তিত্ব আর থাকবে না’ বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শনিবার তিনি তেহরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগও তোলেন।
হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলে হামলার পাল্টাপাল্টি ঘটনার ধারাবাহিকতায় শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী ইরানের ‘একাধিক’ লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর কথা জানানোর পর ট্রাম্প এ হুমকি দেন।
ওয়াশিংটন থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।
ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, ‘যুদ্ধবিরতি চুক্তি আবারও লঙ্ঘনের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সংরক্ষণাগার ও উপকূলীয় রাডার স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে!’
তিনি আরও লেখেন, ‘এই আঘাত এমন এক সময় আসতে পারে, যখন আমাদের আর সংযত থাকার সুযোগ থাকবে না। তখন আমরা যে অভিযান অত্যন্ত সফলভাবে শুরু করেছি, তা সামরিকভাবে সম্পন্ন করতে বাধ্য হব। আর যদি তাই হয়, তবে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের আর অস্তিত্ব থাকবে না।’
সাম্প্রতিক এ সংঘর্ষ ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল শুরু করা যুদ্ধের অবসান ঘটাতে চলমান আলোচনায় নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে।
এতে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল ও অন্যান্য পণ্য পরিবহন পথগুলোর একটির নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, শনিবারের হামলা ছিল পানামার পতাকাবাহী তেলবাহী জাহাজ ‘কিকু’-তে ইরানের ড্রোন হামলার জবাব। জাহাজটিতে প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ছিল।
মার্কিন সেনাবাহিনী জানায়, সর্বশেষ এ হামলায় নজরদারি অবকাঠামো, যোগাযোগ ব্যবস্থা, আকাশ প্রতিরক্ষা স্থাপনা, ড্রোন সংরক্ষণাগার ও মাইন পেতে রাখতে সক্ষম— এমন বিভিন্ন সক্ষমতাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
ইরানের গণমাধ্যম জানায়, দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের সিরিক ও কেশম এলাকায় কয়েকটি বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে।
শুক্রবারও যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালায়। ওয়াশিংটনের দাবি, ‘এভার লাভলি’ নামের একটি জাহাজে ইরানের আরেকটি হামলার জবাব হিসেবে ওই অভিযান পরিচালনা করা হয়।
ইরান শনিবার দাবি করেছে, এর পাল্টা জবাবে তারা উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে।
বাহারাইন জানায়, শনিবার ভোরে দেশটিকে লক্ষ্য করে ইরান কয়েকটি ড্রোন পাঠিয়েছে।
তারা তেহরানের বিরুদ্ধে শান্তি প্রচেষ্টা নস্যাৎ করার অভিযোগ তুলেছে।
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী জানিয়েছে, ‘হামলার পুনরাবৃত্তি হলে, আমাদের জবাব আরও ব্যাপক হবে।’
এদিকে ইসরাইল লেবাননে হামলা চালিয়েছে। একই সময়ে হিজবুল্লাহর প্রধান নাইম কাসেম ওই সংঘাতের অবসান ঘটাতে প্রস্তাবিত একটি চুক্তি প্রত্যাখ্যান করেছেন। এতে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি প্রচেষ্টাও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ইরান এ ‘নৃশংস হামলাকে’ অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতি চুক্তির ‘স্পষ্ট লঙ্ঘন’ বলে আখ্যা দিয়েছে।
হরমুজে উত্তেজনা
সাম্প্রতিক সহিংসতা হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চলমান টানাপোড়েনকে আরও স্পষ্ট করেছে।
ইরান প্রণালী দিয়ে উপসাগরে প্রবেশ বা সেখান থেকে বের হওয়ার ক্ষেত্রে অনুমতি নিতে জাহাজগুলোকে সতর্ক করলেও জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়নি। এর মধ্যে কয়েকটি জাহাজ তেহরানের অনুমোদনহীন পথও ব্যবহার করেছে।
লন্ডনভিত্তিক থিংক ট্যাংক রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের এইচ এ হেলিয়ার বলেন, ‘আন্তর্জাতিক নৌপরিবহনের ওপর স্থায়ী চাপ সৃষ্টি করতে, ইরান সম্ভবত হরমুজ প্রণালী ও এর আশপাশে সীমিত মাত্রার পরিকল্পিত চাপ প্রয়োগ অব্যাহত রাখবে, তবে তা বৃহত্তর সংঘাত এড়িয়ে।’
তিনি আরও বলেন, নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী কংগ্রেস নির্বাচন সামনে থাকায় ওয়াশিংটনের জন্য দ্রুত সমঝোতায় পৌঁছানোর প্রণোদনা রয়েছে। অন্যদিকে ইরানের জন্য প্রণালীতে নিয়ন্ত্রিত চাপ বজায় রেখে দীর্ঘায়িত আলোচনা সুবিধাজনক হতে পারে।
সর্বশেষ উত্তেজনা সত্ত্বেও হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হবে— এমন আশায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানির প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ এ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়।
ইরানের অর্থনীতিতে এর প্রভাব এখনো স্পষ্ট নয়।
তবে শনিবার দেশটির পরিসংখ্যান সংস্থা জানায়, দেশটিতে বার্ষিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৮৮ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছেছে। ফেব্রুয়ারিতে এ হার ছিল ৬৮ শতাংশ।
লেবানন ঘিরে নতুন সংকট
মার্চের শুরুতে ইরানের সমর্থনে হিজবুল্লাহ ইসরাইলের দিকে রকেট নিক্ষেপ করলে লেবাননও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। এর জেরে ইসরাইল লেবাননে অভিযান চালায়।
যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে ইসরাইল ও লেবানন শুক্রবার দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করে।
তবে একদিন পর হিজবুল্লাহ প্রধান নাইম কাসেম চুক্তিটি প্রত্যাখ্যান করেন।
তিনি এটিকে ‘অপমানজনক, লজ্জাজনক ও সার্বভৌমত্ব বিসর্জন’ বলে মন্তব্য করেন।
এর পরিবর্তে তিনি ওয়াশিংটনের সঙ্গে তেহরানের হওয়া চুক্তি পুরোপুরি বাস্তবায়নের আহ্বান জানান। ওই চুক্তির মধ্যে লেবাননে যুদ্ধ বন্ধের বিষয়টিও রয়েছে।
হিজবুল্লাহ বারবার দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরাইলের পূর্ণ সেনা প্রত্যাহারের দাবি জানালেও, ওয়াশিংটনের চুক্তিতে সে ধরণের কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি।
ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু জোর দিয়ে বলেছেন, হিজবুল্লাহ নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত দক্ষিণ লেবাননের দখলকৃত তথাকথিত নিরাপত্তা অঞ্চলে ইসরাইলি সেনারা অবস্থান করবে। এ সময় সাধারণ মানুষকে সেখানে ফিরতে দেওয়া হবে না।
শনিবার নেতানিয়াহু চুক্তিটিকে ‘ঐতিহাসিক’ এবং ‘ইরান ও হিজবুল্লাহর জন্য বড় ধাক্কা’ বলে মন্তব্য করেন।
তবে তার কট্টর ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গাভির চুক্তিটিকে ‘বড় ভুল’ বলে আখ্যা দেন।
তিনি বলেন, কেবল ইসরাইলি বাহিনীর পক্ষেই হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করা সম্ভব।
ইসরাইলি সেনাবাহিনী জানায়, শনিবার তারা দক্ষিণ লেবাননে সন্দেহভাজন যোদ্ধাদের লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালিয়েছে। ওয়াশিংটন দুই দেশের মধ্যে চুক্তির ঘোষণা দেওয়ার পর এটিই প্রথম এ ধরণের হামলা।
এরপর শনিবার সন্ধ্যার শুরুতে লেবাননের জাতীয় বার্তা সংস্থা জানায়, ইসরাইল দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে নতুন করে হামলা চালিয়েছে।
পরে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, নাবাতিয়েহ আল-ফাওকায় ইসরাইলি বিমান হামলায় অন্তত একজন নিহত ও দুজন আহত হয়েছেন।