বাসস
  ২৬ জুন ২০২৬, ১৭:৫৭

আটকে পড়া নাবিকদের সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা স্থগিত জাতিসংঘের

ঢাকা, ২৬ জুন, ২০২৬ (বাসস): হরমুজ প্রণালীতে বৃহস্পতিবার একটি জাহাজে হামলার ঘটনায় আটকে পড়া নাবিকদের সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম স্থগিত করেছে জাতিসংঘ। এদিকে গুরুত্বপূর্ণ এ নৌপথ দিয়ে চলাচলের জন্য ইরান যেন কোনো ধরনের ফি আদায় না করে, সে বিষয়ে সতর্ক করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

নিউইয়র্ক টাইমসসহ কয়েকটি মার্কিন সংবাদমাধ্যম জানায়, হরমুজ প্রণালীতে একটি কন্টেইনারবাহী জাহাজে হামলা চালিয়েছে ইরান। ঘটনার পর সেখানে নৌযান চলাচল নিয়ন্ত্রণের দাবি করা ইরানি সংস্থা একটি সতর্কবার্তা জারি করেছে।

মানামা থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, পারস্য উপসাগর প্রণালী কর্তৃপক্ষ (পিজিএসএ) এক্সে দেওয়া এক বার্তায় বলেছে, ‘পিজিএসএ নির্ধারিত কাঠামোর বাইরে কোনো নৌপথ ব্যবহার করলে নিরাপদ চলাচলের নিশ্চয়তা দেওয়া হবে না।’

যুদ্ধ চলাকালে ইরান হরমুজ প্রণালীতে অবরোধ আরোপ করেছিল। এতে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা লাগে। পরে দেশটি জানায়, তারা 'সামুদ্রিক সেবা ফি' নামে একটি নতুন ফি চালুর পরিকল্পনা করছে।

এসব পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান আলোচনাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে শুরু হওয়া সংঘাতের অবসানে উভয় দেশ একটি সমঝোতা স্মারকে সই করার পর এখন চূড়ান্ত চুক্তির চেষ্টা চালাচ্ছে।

বৃহস্পতিবারের হামলার পর সমুদ্র নিরাপত্তাবিষয়ক জাতিসংঘের সংস্থা আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার (আইএমও) মহাসচিব আর্সেনিও ডোমিঙ্গেজ যুদ্ধের কারণে আটকে পড়া ৬০০টি জাহাজ ও সেগুলোর নাবিকদের সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম স্থগিতের ঘোষণা দেন।

এক বিবৃতিতে ডোমিঙ্গেজ বলেন, সরিয়ে নেওয়ার তালিকায় থাকা জাহাজগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চয়তা এখনো বহাল রয়েছে কি না, তা পুনরায় নিশ্চিত করতে তিনি পরিকল্পনাটি সাময়িকভাবে স্থগিত করেছেন।

তিনি জানান, বৃহস্পতিবার যে জাহাজটিতে হামলা হয়েছে, সেটি আইএমওর সরিয়ে নেওয়ার কাঠামোর আওতায় চলাচল করছিল না। ওই কার্যক্রম মঙ্গলবার সন্ধ্যায় শুরু হয়েছিল।

ব্রিটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ইউকেএমটিও জানায়, হরমুজ প্রণালীতে থাকা কার্গোবাহী জাহাজটির ডান পাশে অজ্ঞাত একটি প্রক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। এতে জাহাজের ব্রিজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।

সংস্থাটি জানায়, ঘটনাটি ওমান উপকূল থেকে মাত্র ৭ দশমিক ৫ নটিক্যাল মাইল বা ১৪ কিলোমিটার দূরে ঘটেছে।

হোয়াইট হাউস জানায়, তারা এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন সম্পর্কে অবগত এবং বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্পষ্ট করে বলেছেন, হরমুজ প্রণালীত অবাধ নৌচলাচল ব্যাহত করার সুযোগ ইরানকে দেওয়া হবে না।’

-'যেকোনো মূল্যে নয়'-

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত উপসাগরীয় মিত্রদের আশ্বস্ত করতে আঞ্চলিক সফরের অংশ হিসেবে বাহরাইনে অবস্থানরত মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র একটি চুক্তি চায়, ‘কিন্তু যেকোনো মূল্যে নয়।’

তিনি বলেন, ‘আমরা নিশ্চিত করতে চাই, এই চুক্তির এমন কোনো অংশ থাকবে না, যা উপসাগরীয় অঞ্চলে আমাদের কোনো অংশীদারের নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা বা সমৃদ্ধিকে কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।’

রুবিও হরমুজ প্রণালীতে চলাচলের জন্য তেহরানকে ফি আদায়ের সুযোগ দেওয়ার ধারণাও নাকচ করে দেন। তার ভাষায়, এতে ‘সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খলা’ সৃষ্টি হবে।

গত সপ্তাহে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সই হওয়া সমঝোতা স্মারকে বলা হয়েছে, আগামী ৬০ দিন বাণিজ্যিক জাহাজগুলো কোনো ফি ছাড়াই হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচল করতে পারবে। তবে এর পর কী ব্যবস্থা থাকবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

ইরান ও ওমানের মাঝখানে অবস্থিত সরু জলপথ হরমুজ প্রণালী আরব সাগর ও ভারত মহাসাগরের সঙ্গে সংযুক্ত। উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে জ্বালানি রপ্তানির ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নৌপথ।

রোববার সুইজারল্যান্ডে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহন নিয়ে কেন্দ্রিক হওয়ার কথা। এ নৌপথে ইরান এর আগেও একাধিকবার বেসামরিক জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করেছে।

তবে উপসাগরীয় দেশগুলো ও ইসরাইল দীর্ঘদিন ধরেই এ অঞ্চলে ইরানের মিত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন এবং দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। এসব বিষয় আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত হবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

রুবিও জ্বালানি সমৃদ্ধ উপসাগরীয় দেশগুলোকে আশ্বস্ত করে বলেন, বহু দশক ধরে যেসব দেশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানিতে হরমুজ প্রণালীর ওপর নির্ভর করছে, তাদের জন্য এ নৌপথে কোনো টোল আরোপ করা হবে না।

উপসাগরীয় দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা যৌথ বিবৃতিতে বলেছেন, হরমুজ প্রণালীতে ‘অবাধ, নিঃশর্ত ও বাধাহীন নৌচলাচল’ নিশ্চিত করা এ অঞ্চলের জন্য অত্যাবশ্যক।

-নতুন নৌপথ-

ওমান বুধবার নিজেদের উপকূলঘেঁষা একটি নতুন অস্থায়ী নৌপথের মানচিত্র প্রকাশ করেছে। দেশটি জানায়, হরমুজ প্রণালীর এ পথটি আইএমওর সঙ্গে সমন্বয় করে নির্ধারণ করা হয়েছে।

পরে ইরানের বিপ্লবী গার্ড এক বিবৃতিতে নতুন এ নৌপথের সমালোচনা করে। তবে সেখানে ওমানের নাম উল্লেখ করা হয়নি।

এদিকে ওয়াশিংটনে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরাইল ও লেবাননের মধ্যে যে আলোচনা বৃহস্পতিবার শেষ হওয়ার কথা ছিল, তা আরও এক দিন চলবে।

দপ্তরটি জানায়, এ সপ্তাহে শুরু হওয়া পঞ্চম দফার আলোচনা শুক্রবার সকালে আবার শুরু হবে। এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘আমরা আলোচনা এগিয়ে নিতে সহায়তা করে যাচ্ছি। ইসরাইল ও লেবাননের আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।’

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ধারাবাহিকতায় ইসরাইল ও ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর মধ্যে যে ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে, এ আলোচনা তারই প্রেক্ষাপটে হচ্ছে। আর সেই সংঘাতের চূড়ান্ত অবসানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান পৃথকভাবে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।