শিরোনাম

ঢাকা, ১৯ জুন, ২০২৬ (বাসস) : ২০২৪ সালের জুলাইয়ে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতার অবসান ঘটানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর একের পর এক নীতিগত অবস্থান পরিবর্তন ও নানা বিতর্কে জড়িয়ে তিনি ভোটারদের ক্ষোভের মুখে পড়েছেন।
লন্ডন থেকে এএফপি জানায়, স্টারমার এখন জনপ্রিয় দলীয় নেতা অ্যান্ডি বার্নহ্যামের সম্ভাব্য নেতৃত্ব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন। গ্রেটার ম্যানচেস্টরের মেয়র বার্নহ্যাম উত্তর-পশ্চিম ইংল্যান্ডের একটি উপনির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পাওয়ার পর তার নেতৃত্বে চ্যালেঞ্জ আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
২০২৪ সালের ৫ জুলাই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথম ভাষণে স্টারমার ‘সেবামূলক’ সরকারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ১৪ বছরের রক্ষণশীল শাসন, ব্রেক্সিট ও দলীয় কোন্দলে জর্জরিত রাজনীতির পর তার সরকার মানুষের জীবনে ‘কম হস্তক্ষেপকারী’ হবে।
সাবেক রক্ষণশীল প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন ও লিজ ট্রাসের আদর্শিক ও আক্রমণাত্মক রাজনীতির বিপরীতে নিজেকে বাস্তববাদী ও প্রশাসনিক দক্ষতাসম্পন্ন নেতা হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছিলেন তিনি।
সাংবাদিক প্যাট্রিক ম্যাগুয়ের ও গ্যাব্রিয়েল প্রোগরুন্ড রচিত গেট ইন বইয়ে উল্লেখ করা হয়, স্টারমার একবার সহকর্মীদের বলেছিলেন, ‘স্টারমারবাদ বলে কিছু নেই, ভবিষ্যতেও থাকবে না।’
তবে ডাউনিং স্ট্রিটে প্রবেশের পর তিনি যে স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্য নেতৃত্বের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা ধরে রাখতে হিমশিম খেতে থাকেন। একই সঙ্গে সুস্পষ্ট আদর্শিক অবস্থান ও ব্যক্তিগত আকর্ষণের অভাবে তিনি দেশকে কোথায় নিয়ে যেতে চান, সে বিষয়ে জনগণকে আশ্বস্ত করতেও ব্যর্থ হন।
শুক্রবার তিনি বলেন, ‘এখনো অনেক কাজ বাকি আছে এবং আমি সেদিকেই মনোযোগ দিচ্ছি।’ একই সঙ্গে লেবার পার্টির প্রায় ৪০০ এমপির একটি অংশ তাকে পদত্যাগের আহ্বান জানিয়েছে, যাতে বার্নহ্যাম বা অন্য কোনো প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে তিক্ত নেতৃত্ব প্রতিযোগিতা এড়ানো যায়।
সফল পেশাজীবন থেকে রাজনীতিতে
১৯৬২ সালের ২ সেপ্টেম্বর জন্ম নেওয়া স্টারমার লন্ডনের উপকণ্ঠের একটি ছোট সেমি-ডিট্যাচড বাড়িতে বেড়ে ওঠেন। তার মা দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত অসুস্থ ছিলেন এবং তার বাবা আবেগগতভাবে ছিলেন খুবই দূরে। তবে তিনি ছিলেন প্রাণীপ্রেমী; তিনি গাধা উদ্ধার করতেন।
বিশ্ববিদ্যালয়জীবন শেষে তিনি মানবাধিকার আইনজীবী এবং পরে প্রধান সরকারি কৌঁসুলি হিসেবে সফল কর্মজীবন গড়ে তোলেন। এ অবদানের জন্য তৎকালীন রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ তাকে ‘নাইট’ উপাধিতে ভূষিত করেন।
বংশীবাদনপ্রেমী ও আর্সেনাল ফুটবল ক্লাবের সমর্থক স্টারমার ২০১৫ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০২০ সালে তিনি বামপন্থী নেতা জেরেমি করবিনের স্থলাভিষিক্ত হয়ে লেবার পার্টির নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। এর আগে ১৯৩৫ সালের পর সবচেয়ে খারাপ নির্বাচনী পরাজয়ের মুখে পড়েছিল দলটি।
দলের ভেতরে ইহুদিবিদ্বেষের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া, করবিনকে কার্যত দল থেকে সরিয়ে দেওয়া এবং লেবারকে মধ্যপন্থায় ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে তিনি দলকে দুই দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে বড় নির্বাচনী জয় এনে দেন।
প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর স্টারমার অর্থনৈতিক স্থবিরতা, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং রক্ষণশীল সরকারের কৃচ্ছ্রসাধন নীতিতে দুর্বল হয়ে পড়া জনসেবামূলক খাতগুলো সংস্কারের অঙ্গীকার করেন। তবে তিনি সতর্ক করে দিয়েছিলেন, পুনরুদ্ধারের পথ হবে ‘দীর্ঘ ও কঠিন’।
বিতর্ক ও নীতিগত পিছু হটা
স্টারমারের শাসনের শুরুতেই তার সরকার লাখো প্রবীণ নাগরিকের শীতকালীন জ্বালানি ভাতা বন্ধের ঘোষণা দেয়, যা লেবারের নির্বাচনী ইশতেহারে ছিল না। ব্যাপক সমালোচনার মুখে পরে সরকার এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে।
এ ছাড়া কল্যাণ ভাতা সংস্কার, কৃষকদের উত্তরাধিকার কর এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপর বেতনভিত্তিক কর ও ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি নিয়েও তাকে পিছু হটতে হয়।
ক্ষমতার প্রথম কয়েক মাস ‘বিনামূল্যে উপহার’ গ্রহণসংক্রান্ত বিতর্কেও তিনি সমালোচিত হন। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সম্পত্তি কর কম দেওয়ার অভিযোগে উপপ্রধানমন্ত্রী অ্যাঞ্জেলা রেইনার পদত্যাগ করেন।
একই মাসে মার্কিন যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের অভিযোগে ওয়াশিংটনে যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূত পিটার ম্যান্ডেলসনকে বরখাস্ত করেন স্টারমার।
এ নিয়োগের জন্য পরে তাকে ক্ষমা চাইতে হয়। ঘটনাটি তার দুই ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সর্বোচ্চ পর্যায়ের এক কর্মকর্তার বিদায়ের কারণ হয়।
স্টারমার নিজে পদত্যাগে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তবে এ কেলেঙ্কারি এবং গত মে মাসে স্থানীয় নির্বাচনে লেবারের হতাশাজনক ফলাফল তার ওপর চাপ আরও বাড়িয়েছে।
বার্নহ্যামের চ্যালেঞ্জ
ইরান যুদ্ধের বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরোধিতা এবং ইউক্রেনের পক্ষে ইউরোপীয় সমর্থন ধরে রাখার জন্য প্রশংসিত হলেও দেশে বামপন্থী গ্রিন পার্টি ও কট্টর ডানপন্থী সংস্কারবাদী দল রিফর্ম ইউকের উত্থান ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছেন স্টারমার।
নাইজেল ফারাজের নেতৃত্বাধীন রিফর্ম ইউকের প্রার্থীর বিরুদ্ধে উত্তর ইংল্যান্ডে উপনির্বাচনে বড় জয় পাওয়ার পর জনপ্রিয় লেবার নেতা অ্যান্ডি বার্নহ্যাম নেতৃত্ব চ্যালেঞ্জ জানাতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জনমত জরিপ সংস্থা ইউগভের সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, স্টারমারের জনপ্রিয়তার হার মাত্র ১৯ শতাংশ, যা ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর ইতিহাসে সর্বনিন্ম হারগুলোর একটি।
শুক্রবার তিনি বলেন, নেতা হিসেবে তিনি ‘পালিয়ে যাবেন না’ এবং নেতৃত্বের লড়াই হলে তাতে অংশ নেবেন। তবে তার মতে, এমন প্রতিযোগিতা দেশকে ‘বিশৃঙ্খলার’ দিকে ঠেলে দেবে।