বাসস
  ১৮ জুন ২০২৬, ১৯:২৫
আপডেট : ১৮ জুন ২০২৬, ২০:০০

মার্কিন গণমাধ্যমে ইরান চুক্তি নিয়ে ট্রাম্পের ‘প্রচার কৌশল’-এর সমালোচনা

ঢাকা, ১৮ জুন, ২০২৬ (বাসস) : যুদ্ধ শুরুর আগের লক্ষ্য পরিত্যাগ, ইরানের প্রভাব বৃদ্ধি এবং বেশ কয়েক বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের পরও যুদ্ধের অবসান ঘটাতে করা চুক্তিতে ইরানকে ব্যাপক ছাড় দেওয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমালোচনায় প্রায় একবাক্যে সরব হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যম।

মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়া যুদ্ধ এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিকে নাড়িয়ে দেওয়া সংঘাতের ইতি টানতে ট্রাম্প বুধবার প্যারিসের বাইরে মোমবাতির আলোয় আয়োজিত এক নৈশভোজে সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেন।

তবে বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে ট্রাম্পকে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে। যুদ্ধের সমর্থক ও বিরোধী—উভয় পক্ষ থেকেই তার বিরুদ্ধে সমালোচনার ঝড় উঠতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ওয়াশিংটন থেকে এএফপি জানায়, ট্রাম্প-সমর্থক হিসেবে পরিচিত মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজও সমালোচকদের উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, এই চুক্তিতে ইরানকে ‘বিপুল আর্থিক সুবিধা’ দেওয়া হয়েছে, অথচ তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি ভেঙে ফেলার কোনো বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়নি।

চুক্তিটি মূলত একটি অস্থায়ী ব্যবস্থা, যার উদ্দেশ্য ইরানের দীর্ঘমেয়াদি পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার জন্য সময় বের করা। দীর্ঘদিন ধরেই ওয়াশিংটনের অভিযোগ, তেহরান গোপনে পারমাণবিক বোমা তৈরির কর্মসূচি পরিচালনা করছে।

চুক্তি অনুযায়ী, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে চূড়ান্ত সমঝোতা হলে আঞ্চলিক দেশগুলোর সহায়তায় গঠিত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের (প্রায় ৩৬ লাখ কোটি টাকা) পুনর্গঠন তহবিল কার্যকরে সহায়তা করবে যুক্তরাষ্ট্র।

তবে ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে চুক্তিটিকে বড় সাফল্য হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা ফক্স নিউজকে সমালোচনার জন্য যথেষ্ট সময় বরাদ্দ দেওয়া থেকে বিরত রাখতে পারেনি।

ফক্স নিউজ বলেছে, ‘প্রশাসন এই চুক্তিকে যুগান্তকারী সাফল্য হিসেবে উপস্থাপন করলেও সমালোচকদের মতে, ইরানকে দেওয়া ছাড়ের পরিমাণ এর বিনিময়ে পাওয়া প্রতিশ্রুতির চেয়ে অনেক বেশি।’

উদারপন্থী মার্কিন টেলিভিশন নেটওয়ার্ক এমএস নাউ আরও কড়া ভাষায় মন্তব্য করেছে।

তাদের ভাষ্য, ‘হোয়াইট হাউস এমন একটি যুদ্ধবিরতি সম্প্রসারণে সম্মত হয়েছে, যা যুদ্ধ-পূর্ব কোনো লক্ষ্যই পূরণ করেনি, অথচ তেহরানকে বিপুল আর্থিক সুবিধা দিয়েছে।’

তারা আরও বলে, ‘এখন প্রশাসন মরিয়া হয়ে প্রমাণ করতে চাইছে যে বিষয়টি ভিন্ন। বাস্তবতা হলো, ট্রাম্প ইরানিদের হাতে পরাস্ত হয়েছেন এবং তার এই প্রচার কৌশল কেউ বিশ্বাস করছে না।’

‘আত্মসমর্পণের দলিলের মতো নয়’

মার্কিন প্রভাবশালী দৈনিক ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল লিখেছে, চুক্তিটি ‘ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের সবচেয়ে বড় বৈদেশিক নীতিগত বাজি’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

পত্রিকাটি বলেছে, ‘ট্রাম্পকে ইরানবিষয়ক কট্টরপন্থীদের বিরোধিতার মুখে পড়তে হবে, যারা মনে করেন প্রেসিডেন্ট যা পাচ্ছেন তার তুলনায় অনেক বেশি ছাড় দিচ্ছেন।’

এমনকি চুক্তি স্বাক্ষরের প্রক্রিয়াও বিশৃঙ্খলার মধ্যে পড়ে বলে জানিয়েছে পত্রিকাটি। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, বুধবার রাতে ট্রাম্প দ্বিতীয়বারের মতো চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন, যা তার কয়েকজন সহযোগীকেও বিস্মিত করে এবং চলতি সপ্তাহের শেষদিকে নির্ধারিত আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর অনুষ্ঠানকে অনিশ্চয়তার মুখে ফেলে।

অন্যদিকে নিউইয়র্ক টাইমস বলেছে, এই সংঘাতের পর ইরানের ‘উদযাপনের অনেক কারণ’ থাকতে পারে।

পত্রিকাটি উল্লেখ করে, চুক্তিটি ‘কোনোভাবেই আত্মসমর্পণের দলিলের মতো নয়।’

তাদের মতে, ইসলামি প্রজাতন্ত্রটি প্রমাণ করেছে যে তারা অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলাকেও একটি কার্যকর অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।

২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার মধ্য দিয়ে সংঘাত শুরু হওয়ার সময় ট্রাম্প ইরানি শাসনব্যবস্থার পতনের সম্ভাবনার কথাও বলেছিলেন।

নিউইয়র্ক টাইমস লিখেছে, ‘বরং ট্রাম্প নতুন নেতৃত্বকে আরও শক্তিশালী করে তুলেছেন।’

পত্রিকাটির মতে, যুদ্ধ শেষে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়ার আরও কাছাকাছি চলে যেতে পারে।

তারা লিখেছে, ‘দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ইরান পারমাণবিক বোমা তৈরির সীমার খুব কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়িয়েছিল, কিন্তু কখনো সেই সীমা অতিক্রম করেনি।’

‘৪০ দিনের বোমাবর্ষণে সৃষ্ট ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে ফেলার পর এবং শিগগিরই পুনরায় আসতে যাওয়া তেল আয়ের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার কীভাবে ব্যয় করা হবে তা নিয়ে ভাবতে গিয়ে ইরানের নেতারা হয়তো প্রশ্ন তুলবেন, এতদিন তারা সঠিক পারমাণবিক কৌশল অনুসরণ করেছিলেন কি না।’

এদিকে ন্যাশনাল পাবলিক রেডিও (এনপিআর) যুদ্ধের মানবিক ক্ষয়ক্ষতির ওপর জোর দিয়েছে।

এনপিআর বলেছে, এই যুদ্ধ ছিল ‘বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর সঙ্গে তুলনামূলকভাবে দুর্বল কিন্তু কৌশলগতভাবে দক্ষ এক প্রতিপক্ষের সংঘর্ষ।’