শিরোনাম

ঢাকা, ১৮ জুন, ২০২৬ (বাসস) : যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বৃহস্পতিবার ইরানের সঙ্গে তার করা চুক্তির সমালোচকদের তীব্র সমালোচনা করে তাদের ‘বোকা’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। একইসঙ্গে তিনি বলেছেন, যুদ্ধের অবসান ঘটাতে তিনি ইরানকে ছাড় দিয়েছেন এমন অভিযোগ ভিত্তিহীন। এদিকে চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে সুইজারল্যান্ডে আলোচনার প্রস্তুতি চলছে।
ট্রাম্প এবং তার ইরানি সমকক্ষ পৃথকভাবে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের অবসান ঘটাতে চুক্তিতে স্বাক্ষর করার পর তেলের দাম কমে যায়। তবে কৌশলগত হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া হলেও চুক্তির বিভিন্ন দিক নিয়ে আগামী দুই মাস আলোচনা চলবে।
চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে কখন স্বাক্ষরিত হবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে বুধবার ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সঙ্গে প্যারিসের বাইরে ভার্সাই প্রাসাদে নৈশভোজের সময় ট্রাম্প মোটা কালো কালিতে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অবসান ঘটানো চুক্তির ঐতিহাসিক স্বাক্ষরস্থল ভার্সাই প্রাসাদে এই আয়োজন ম্যাক্রোঁর জন্য বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। ট্রাম্প স্বাক্ষর করার সময় ম্যাক্রোঁ ‘ব্রাভো’ বলে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন।
ওয়াশিংটন থেকে এএফপি জানায়, স্বাক্ষরের কয়েক ঘণ্টা পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প লেখেন, ‘যেসব বোকা মনে করে আমি ইরানের ব্যাপারে যথেষ্ট কঠোর হইনি, অথচ শেয়ারবাজার রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে এবং তেলের দাম কমছে, তারা হয় হিংসুক, নয়তো খারাপ মানুষ, অথবা নির্বোধ।’
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানও চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন বলে জানিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকাই। তিনি বলেন, ‘এখন সময় এসেছে চুক্তির বাস্তবায়ন পরীক্ষা করার।’
চুক্তির খবর প্রকাশের পর থেকেই তেলের দাম কমতে শুরু করে। বৃহস্পতিবার অপরিশোধিত তেলের দাম তিন শতাংশের বেশি কমেছে, যা সপ্তাহান্তে শুরু হওয়া নিম্নমুখী প্রবণতাকে আরও জোরালো করেছে।
শান্তির সুযোগ
চুক্তিটি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ও ইরানের চলমান সংঘাতের অবসান ঘটাবে বলে আশা করা হচ্ছে। ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া যুদ্ধের পর পাঁচ সপ্তাহের পূর্ণাঙ্গ সংঘাত এবং এপ্রিলের শুরুতে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও হরমুজ প্রণালীতে নৌ-চলাচল ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়, যার প্রভাব পড়ে জ্বালানি বাজারে।
চুক্তির মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বলেন, এটি ‘তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর’ হবে এবং ইরান ‘অবিলম্বে’ হরমুজ প্রণালী খুলে দেবে। তিনিও চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন।
এখন দুই মাসের আলোচনা পর্ব শুরু হচ্ছে। সবার নজর থাকবে হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি খুলে দেওয়া এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে অগ্রগতি হয় কি না, সেদিকে। দীর্ঘদিন ধরেই ওয়াশিংটনের অভিযোগ, তেহরান গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে।
মাখোঁ এই চুক্তিকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, এটি ‘শান্তির পথ খুলে দিয়েছে, কোনো টোল ছাড়াই হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত করবে এবং পারমাণবিক, ক্ষেপণাস্ত্র ও আঞ্চলিক কার্যক্রম নিয়ে চূড়ান্ত চুক্তির জন্য ৬০ দিনের সময় দেবে।’
তবে পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে এখনও কিছুটা বিভ্রান্তি রয়েছে। প্রথমে পরিকল্পনা ছিল শুক্রবার সুইজারল্যান্ডের একটি পাহাড়চূড়ার বিলাসবহুল রিসোর্টে ইরানের প্রধান আলোচক ও পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের উপস্থিতিতে চুক্তি স্বাক্ষর হবে।
কিন্তু বাকায়ি জানান, সরাসরি উপস্থিত থেকে আর স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের প্রয়োজন নেই। তবে শরিফ বলেছেন, শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠান হবে এবং এরপর কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা শুরু হবে।
চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে দেওয়া তেল নিষেধাজ্ঞা অবিলম্বে প্রত্যাহার করবে।
এছাড়া ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে চূড়ান্ত সমঝোতা হলে যুক্তরাষ্ট্র আঞ্চলিক দেশগুলোর সহায়তায় গঠিত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের (প্রায় ৩৬ লাখ কোটি টাকা) পুনর্গঠন তহবিল কার্যকরে সহায়তা করবে।
জাতিসংঘের পারমাণবিক সংস্থার প্রধান রাফায়েল গ্রোসি জেনেভায় সাংবাদিকদের বলেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় ‘সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ’ নির্ধারণে তারা প্রস্তুত।
মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইরান তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত পাতলা করবে। সম্ভবত জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে ইরানেই এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।
তবে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির বিষয়টি চুক্তিতে উল্লেখ করা হয়নি। যদিও ইসরাইল দীর্ঘদিন ধরে এটি বিলুপ্ত করার দাবি জানিয়ে আসছে।
বাকাই বলেন, ‘ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কেবল নিক্ষেপের জন্য, আলোচনার জন্য নয়। ইরানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা কোনোভাবেই, কোনো প্রক্রিয়ায় বা কারও সঙ্গে আলোচনার বিষয় হবে না।’
‘বৈদেশিক নীতির সবচেয়ে বড় ভুল’
ইরানের কট্টরপন্থী মহলের একটি অংশ চুক্তির সমালোচনা করেছে। তারা এই সংঘাতকে ‘আরোপিত যুদ্ধ’ হিসেবে বর্ণনা করে ১৯৮০-১৯৮৮ সালে ইরাকের সাবেক শাসক সাদ্দাম হোসেনের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করেছে।
তবে গালিবাফ দাবি করেছেন, এই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের ‘ব্যর্থতা’। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান একে ‘ঐতিহাসিক’ বলে অভিহিত করেছেন।
১৩ জন মার্কিন সেনা নিহত হওয়া এবং বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ ব্যবহারের পর ট্রাম্পের যুদ্ধ বন্ধের সিদ্ধান্ত তার নিজ দলেও অস্বস্তি তৈরি করেছে।
সম্ভাব্য সমালোচনার জবাবে ট্রাম্প জি-৭ সম্মেলনে বলেন, ইরান যদি চুক্তি লঙ্ঘন করে, তাহলে তিনি তাদের ‘ভয়াবহভাবে বোমাবর্ষণ’ করতে প্রস্তুত।
কিন্তু ট্রাম্পের নিজ দলের সিনেটর বিল ক্যাসিডি এটিকে ‘গত কয়েক দশকের সবচেয়ে বড় বৈদেশিক নীতিগত ভুল’ বলে মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, ‘ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। বরং তারা শিখে গেছে যে হরমুজ প্রণালী নিয়ে হুমকি কার্যকর।’
ট্রাম্প-সমর্থক হিসেবে পরিচিত মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজও সমালোচকদের উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, চুক্তিটি ইরানকে ‘বিপুল আর্থিক সুবিধা’ দিয়েছে, অথচ তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি ভেঙে ফেলার কোনো শর্ত আরোপ করেনি।
এদিকে চুক্তিতে লেবাননের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে আগামী ৬০ দিনের আলোচনায় সেখানে চলমান সংঘাত নিয়ে আলোচনা হবে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
ইরানের সমর্থিত হিজবুল্লাহ ২ মার্চ ইসরাইলে রকেট হামলা চালানোর পর লেবাননও এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। জবাবে ইসরাইল ব্যাপক বিমান হামলা ও স্থল অভিযান শুরু করে।
চুক্তি ঘোষণার পর লেবাননে সহিংসতা কিছুটা কমলেও বৃহস্পতিবার দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলি ড্রোন হামলায় একজন নিহত হয়েছেন বলে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে।