শিরোনাম

ঢাকা, ১৪ জুন, ২০২৬ (বাসস) : যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ অবসানে আজ রোববার ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে পারে এবং এর পরপরই কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী ‘সবার জন্য উন্মুক্ত’ করে দেওয়া হবে।
এর আগে ইরান ভিন্ন সময়সূচির কথা বললেও তারা ইঙ্গিত দিয়েছে যে, একটি সমঝোতা চূড়ান্ত হওয়ার পথে রয়েছে। একই সঙ্গে যুদ্ধরত পক্ষ ও মধ্যস্থতাকারীরা জানিয়েছে, কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা আলোচনা শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
তেহরান থেকে এএফপি জানায়, শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প লেখেন, ‘চুক্তিটি আগামীকাল স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা রয়েছে। আর চুক্তি স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গেই হরমুজ প্রণালি সবার জন্য খুলে দেওয়া হবে।’
প্রধান মধ্যস্থতাকারীদের অন্যতম পাকিস্তানের নেতাও এর আগে বলেছেন, চুক্তি এখন ‘আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি কাছাকাছি’।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ শনিবার এক্সে দেওয়া পোস্টে বলেন, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এ চুক্তি ‘চূড়ান্ত’ হওয়ার কথা রয়েছে এবং এটি ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে স্বাক্ষরিত হবে।
তিনি জানান, আগামী সপ্তাহে ‘কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা’ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতেও বলা হয়েছে, রোববার চুক্তি স্বাক্ষরের পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে ইরানের ফার্স বার্তা সংস্থা দেশটির আলোচক দলের ঘনিষ্ঠ একটি ‘অবহিত সূত্রের’ বরাত দিয়ে জানিয়েছে, তেহরান এখনো চুক্তি বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি কিংবা কোনো ঘোষণা দেয়নি।
৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকেই ট্রাম্প বারবার দাবি করে আসছেন যে, একটি চুক্তি আসন্ন। কিন্তু নানা জটিলতায় আলোচনা দীর্ঘায়িত হয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকায়ি শনিবার বলেন, চুক্তি স্বাক্ষরের তারিখ এখনো নির্ধারিত হয়নি এবং ‘এটি আগামীকাল হবে না’।
তবে তিনি যোগ করেন, ‘আগামী কয়েক দিনের মধ্যে এটি ঘটার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।’
যুদ্ধরত দুই পক্ষই চুক্তির বিষয়বস্তু নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য দিচ্ছে। উভয় পক্ষই দেখাতে চায় যে, যুদ্ধ শেষে তারাই তুলনামূলক শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।
এদিকে মধ্যস্থতাকারী কাতারের একটি প্রতিনিধি দল রোববার তেহরানে পৌঁছেছে বলে ইরানি গণমাধ্যম জানিয়েছে।
ইরানের আইএসএনএ বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এক উপদেষ্টাকে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানে পাঠানো হয়েছে। অন্যদিকে তাসনিম বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, সফরের উদ্দেশ্য হলো ‘কূটনৈতিক প্রক্রিয়া নিয়ে সাম্প্রতিক অগ্রগতি পর্যালোচনা করা’।
তেহরান বরাবরই বলে আসছে, তারা হরমুজ প্রণালীর ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখবে। উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল ও গ্যাস পরিবহনের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ।
প্রণালিটিতে কার্যত অবরোধ আরোপের পর, যা বিশ্ববাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে, ইরান দাবি করেছে, এ জলপথ দিয়ে যাওয়া জাহাজগুলোকে তাদের সশস্ত্র বাহিনীর অনুমতি নিতে হবে। একই সঙ্গে তদারকি ও টোল আদায়ের জন্য নতুন একটি কর্তৃপক্ষও গঠন করা হয়েছে।
এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নিজস্ব অবরোধ আরোপ করেছে।
শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, ইরান বাণিজ্যিক জাহাজ লক্ষ্য করে ‘বহুসংখ্যক একমুখী আক্রমণাত্মক ড্রোন’ ছুড়েছে।
সেন্টকম আরও জানায়, ‘গত কয়েক ঘণ্টায় মার্কিন বাহিনী এসব ড্রোন ভূপাতিত করেছে।’
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি শুক্রবার বলেন, আলোচনায় থাকা চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ প্রত্যাহারের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘হরমুজ প্রণালীর প্রশাসন আর আগের মতো থাকবে না।’ এ জলপথকে তিনি ইরানের ‘প্রধান প্রতিরোধমূলক উপকরণগুলোর একটি’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বারবার বলেছে, হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকা তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক পোস্টেও টোল বা অন্য কোনো ব্যবস্থার বিষয়ে কিছু বলা হয়নি।
‘পারমাণবিক ডাস্ট’
আলোচনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ, বিশেষ করে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত, যা গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর ভূগর্ভে চাপা পড়েছে বলে ধারণা করা হয়।
ইরান দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার তাদের রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও পশ্চিমা দেশগুলোর সন্দেহ, তেহরান গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে।
আরাঘচি শুক্রবার বলেন, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিয়ে সমাধানের একমাত্র উপায় হলো ‘ইরানের ভেতরেই সেটিকে পাতলা বা ডাইলিউট করা’।
ট্রাম্পের আগে বলেছিলেন, যুদ্ধের উদ্দেশ্যই ছিল ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখা এবং যুক্তরাষ্ট্র ওই ইউরেনিয়াম সরিয়ে ধ্বংস করবে।
শনিবারের পোস্টে তিনি লেখেন, ‘যখন সবকিছু শান্ত হবে, তখন আমরা গিয়ে ওই পারমাণবিক ডাস্ট সংগ্রহ করব... এবং ইরান বা যুক্তরাষ্ট্র, যেখানেই হোক, তা ধ্বংস করে ফেলব।’
ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, যিনি ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় করে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন, বলেছেন ট্রাম্প তাকে আশ্বাস দিয়েছেন যে যেকোনো চুক্তিতেই সমৃদ্ধ পারমাণবিক উপাদান অপসারণের বিষয়টি থাকবে।
যুক্তরাষ্ট্রের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা শুক্রবার জানান, যুদ্ধ অবসানের প্রস্তাবিত চুক্তিতে লেবাননের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। সেখানে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরাইল অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে।
২ মার্চ হিজবুল্লাহ ইসরাইলে রকেট হামলা চালালে লেবাননও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে।
এপ্রিল মাসে লেবাননে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও তা বাস্তবে মানা হয়নি। ওয়াশিংটনে লেবানন ও ইসরাইলের আলোচনার পর গত সপ্তাহে নতুন একটি শর্তসাপেক্ষ যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হলেও সংঘর্ষ অব্যাহত রয়েছে।
রোববার ইসরাইলের সামরিক বাহিনী দক্ষিণ লেবাননের ২৯টি গ্রামের বাসিন্দাদের সম্ভাব্য হামলার আগে এলাকা ত্যাগের নির্দেশ দিয়েছে।
এ ছাড়া তারা জানিয়েছে, হিজবুল্লাহর ছোড়া বলে সন্দেহ করা তিনটি ড্রোন রোববার উত্তর ইসরাইলে আঘাত হেনেছে। তবে এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।