বাসস
  ১১ জুন ২০২৬, ১৮:৫০

দ্রুত শান্তি চুক্তির আশা ক্ষীণ, ফের পাল্টাপাল্টি হামলা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের

ঢাকা, ১১ জুন, ২০২৬ (বাসস) : তিন মাসের যুদ্ধের অবসান ঘটাতে সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা দীর্ঘায়িত করার অভিযোগ তুলে বৃহস্পতিবার ইরানের ওপর নতুন করে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এর জবাবে তেহরানও পাল্টা আঘাত হেনেছে। টানা দ্বিতীয় দিনের এ পাল্টাপাল্টি হামলার ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আবারও বেড়েছে।

তেহরান থেকে এএফপি জানায়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, যিনি বারবার দাবি করে আসছিলেন যে তেহরানের সঙ্গে আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে, বুধবার বলেন, ইরান ‘আমাদের বোকা বানানোর চেষ্টা করছে’ এবং এখন তাদের ‘মূল্য দিতে হবে’।

এর কয়েক ঘণ্টা পর মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, ওয়াশিংটন সময় বুধবার বিকেল ৫টা ১৫ মিনিটে, যা ইরানে বৃহস্পতিবার ভোর, মার্কিন বাহিনী ‘অতিরিক্ত আত্মরক্ষামূলক হামলা’ শুরু করে। সেন্টকমের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের ‘অযৌক্তিক ও অব্যাহত আগ্রাসনের’ জবাব হিসেবে এ হামলা চালানো হয়।

ইরানি গণমাধ্যম জানায়, হরমুজ প্রণালীর কাছাকাছি দক্ষিণাঞ্চলে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। বন্দর আব্বাস, কেশম ও মিনাবে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। একই সঙ্গে কারগান ও সিরিকে ‘শত্রুপক্ষের নিক্ষিপ্ত বস্তু’ আঘাত হেনেছে বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে।

পরে সেন্টকম জানায়, তারা ‘ইরানের সামরিক নজরদারি সক্ষমতা, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং বিমান প্রতিরক্ষা স্থাপনার’ ওপর হামলা সম্পন্ন করেছে।

তাদের দাবি, আঞ্চলিক জলপথ দিয়ে চলাচলকারী মার্কিন বাহিনী ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য হুমকি সৃষ্টি করছিল— এমন লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁতভাবে নির্দেশিত অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে।

নতুন এ সংঘাতের মধ্যে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, ট্রাম্প নির্দেশ দিলে ‘আমরা বোমা দিয়েই আলোচনা করব, আর সেটিতে আমরা খুবই দক্ষ’।

এর জবাবে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানায়, তারা কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে হামলা চালিয়েছে। রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএর খবরে বলা হয়, তারা ‘শেখ ঈসা বিমানঘাঁটিও আঘাত করে ধ্বংস করেছে’।

ইরানি গণমাধ্যমের দাবি, বাহরাইনে অবস্থানরত মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের যোগাযোগ অ্যান্টেনা ও রাডার স্থাপনা লক্ষ্য করে ড্রোন হামলাও চালানো হয়েছে।

বাহরাইনে বিমান হামলার সতর্কতা জারি করা হয় এবং দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাসিন্দাদের ‘নিকটতম নিরাপদ স্থানে’ চলে যাওয়ার আহ্বান জানায়।

কুয়েতও সাময়িকভাবে তাদের আকাশসীমা বন্ধ করে দেয়। দেশটির সামরিক বাহিনী জানায়, তাদের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘শত্রুপক্ষের আকাশযান’ প্রতিহত করার কাজ করছে।

এদিকে তেল ও গ্যাস পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী নিয়ে আবারও হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান, যা কার্যত তারা বন্ধ করে রেখেছে।

আইআরজিসির মহাকাশ বাহিনীর প্রধান মাজিদ মুসাভি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, ‘আপনারা কি পবিত্র হরমুজ প্রণালীকে অনিরাপদ করে তুলছেন? আমরা পুরো অঞ্চলকে নরকে পরিণত করব।’

রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন আইআরআইবি ও মেহর বার্তা সংস্থা জানায়, হরমুজ প্রণালী অতিক্রমের চেষ্টা করা দুটি জাহাজে আঘাত হেনেছে ইরানি নৌবাহিনী।

অন্যদিকে তাসনিম বার্তা সংস্থা দেশটির সামরিক অপারেশন কমান্ডের বরাত দিয়ে জানায়, গুরুত্বপূর্ণ এ জলপথ ‘সম্পূর্ণভাবে বন্ধ’ এবং সেখানে চলাচলকারী ‘যেকোনো জাহাজ’ লক্ষ্যবস্তু হবে।

তবে সেন্টকম এ দাবি অস্বীকার করে বলেছে, ‘আজ রাতেও বাণিজ্যিক জাহাজগুলো হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশ ও বের হয়ে যাচ্ছে।’

ট্রাম্প বুধবার দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী গোপনে সহায়তা করে বিরোধপূর্ণ এ প্রণালি দিয়ে ১০ কোটি ব্যারেল তেল পরিবহন নিশ্চিত করেছে।

‘ওদের ওপর প্রচণ্ড বোমাবর্ষণ করব’

এর আগে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজ জানায়, মার্কিন বোমা হামলা শুরু হওয়ার সময় ইরানের নেতারা সরাসরি হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুমে ট্রাম্পকে ফোন করেছিলেন বলে তিনি দাবি করেছেন।

তবে আইআরএনএর খবরে বলা হয়, ইরানের বিপ্লবী গার্ড দ্রুতই এ দাবি অস্বীকার করেছে।

ফক্স নিউজের তথ্যমতে, ট্রাম্প বলেন, মার্কিন বাহিনী ইরানে ৪৯টি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে এবং কিছু লক্ষ্যবস্তু রাজধানী তেহরান থেকে মাত্র ৬০ কিলোমিটার দূরে ছিল।

ফক্সের সাংবাদিক ট্রে ইংস্ট, যিনি ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলেছেন, তার উদ্ধৃতি দিয়ে জানান— ট্রাম্প বলেছেন, ইরান যদি যুদ্ধ অবসানের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত না মেনে নেয়, তাহলে ‘আগামী রাতেই আমরা ওদের ওপর প্রচণ্ড বোমাবর্ষণ করব।’

এটি ছিল টানা দ্বিতীয় দিনের মার্কিন হামলা। চলতি সপ্তাহে উভয় পক্ষের পাল্টাপাল্টি আঘাতের একটি কারণ ছিল ইরানের হাতে একটি মার্কিন হেলিকপ্টার ভূপাতিত হওয়া।

সাম্প্রতিক হামলার আগে ট্রাম্প অভিযোগ করেন, ইরানি আলোচকরা অযথা সময়ক্ষেপণ করছেন, যদিও এর আগে তিনি বলেছিলেন যে সমঝোতা হতে আর মাত্র কয়েক দিন বাকি।

বুধবার সকালে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘গতকাল আমরা তাদের ওপর কঠোর আঘাত হেনেছি। আজও কঠোরভাবে আঘাত করব।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা একটি চুক্তির খুব কাছাকাছি ছিলাম, কিন্তু তারা বারবার আমাদের ঝুলিয়ে রাখছে।’

প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ ইঙ্গিত দেন যে হামলা তৃতীয় রাতেও গড়াতে পারে। তিনি বলেন, অভিযান হবে ‘শক্তিশালী’ এবং ‘স্পষ্ট বার্তাবাহী’।

বিশ্বকাপ ফুটবল শুরুর প্রাক্কালে এ উত্তেজনা বৃদ্ধি আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র এ আসরের সহ-আয়োজক এবং ইরানও অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর একটি।

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সতর্ক করে বলেছেন, পরিস্থিতি আবারও ‘পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে’ রূপ নিতে পারে।

অন্যদিকে জাতিসংঘে ইরানের রাষ্ট্রদূত আমির সাঈদ ইরাভানি ট্রাম্পের হুমকি প্রত্যাখ্যান করে বলেন, ‘হুমকি, ভয়ভীতি বা শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে কোনো টেকসই চুক্তি অর্জন করা সম্ভব নয়।’

তবে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত এক কূটনীতিক জানান, অবশিষ্ট মতপার্থক্য দূর করার প্রচেষ্টায় কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা তেহরানে গিয়ে ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করছেন।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার মাধ্যমে এ যুদ্ধ শুরু হয়। এতে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য নড়ে যায় এবং বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়। পরে ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়।

বৃহস্পতিবার এশিয়ার শেয়ারবাজারগুলো ওয়াল স্ট্রিটের দরপতনের ধারাবাহিকতায় নিম্নমুখী ছিল। একই সঙ্গে তেলের দাম দুই শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে, যা আগের দিনের ঊর্ধ্বগতির ধারাবাহিকতা।

ইরান শুরু থেকেই বলে আসছে, যুদ্ধ অবসানের যেকোনো চুক্তির অংশ হিসেবে লেবাননেও যুদ্ধবিরতি থাকতে হবে। ২ মার্চ ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ ইসরাইলের দিকে রকেট নিক্ষেপ করার পর লেবাননও এ সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে।