শিরোনাম

ঢাকা, ১১ জুন, ২০২৬ (বাসস) : যুক্তরাষ্ট্রের নতুন হামলা এবং এর জবাবে ইরানের পাল্টা আক্রমণের পর তিন মাসব্যাপী মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের নড়বড়ে যুদ্ধবিরতি এখন ‘কার্যত অর্থহীন’ হয়ে পড়েছে বলে বৃহস্পতিবার সতর্ক করেছে ইরান।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া যুদ্ধ এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে স্থগিত হয়েছিল। তবে সংঘাতের স্থায়ী সমাধান নিয়ে আলোচনা অচলাবস্থায় পড়েছে এবং মাঝেমধ্যে গোলাগুলির ঘটনায় যুদ্ধবিরতি বারবার চাপে পড়েছে।
তেহরান থেকে এএফপি জানায়, টানা দ্বিতীয় দিনের মতো পাল্টাপাল্টি হামলার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র নজরদারি, যোগাযোগ ও আকাশ প্রতিরক্ষা স্থাপনায় আঘাত হেনেছে বলে জানিয়েছে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)।
অন্যদিকে, ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছে, তারা জর্ডানে একটি মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে ‘শাস্তিমূলক অভিযান’ পরিচালনা করেছে। এ সময় উপসাগরীয় কয়েকটি দেশও তাদের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের খবর দিয়েছে।
মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান ও কাতার জানিয়েছে, উত্তেজনা বৃদ্ধি সত্ত্বেও যুদ্ধের অবসান ঘটাতে পর্দার আড়ালে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। তবে ইসলামাবাদ স্বীকার করেছে, সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে আশাবাদী থাকা কঠিন।
হামলার সময় একটি কাতারি প্রতিনিধিদল তেহরানে অবস্থান করছিল। এক কূটনৈতিক সূত্র জানায়, তাদের আলোচনা ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় করেই’ পরিচালিত হয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, যিনি বারবার দাবি করেছেন যে তেহরানের সঙ্গে সমঝোতা খুব কাছাকাছি, বুধবার বলেন ইরান ‘আমাদের বোকা বানানোর চেষ্টা করছে’ এবং এখন তাদের ‘মূল্য দিতে হবে’।
এর কয়েক ঘণ্টা পর সেন্টকম জানায়, ইরানের ‘অকারণ ও ধারাবাহিক আগ্রাসনের’ জবাবে বৃহস্পতিবার ভোরে মার্কিন বাহিনী হামলা শুরু করে এবং পরে অভিযান সম্পন্ন হওয়ার ঘোষণা দেয়।
ইরানের বিভিন্ন গণমাধ্যম দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় বিস্ফোরণের খবর দিয়েছে। তেহরান প্রদেশে অন্তত তিনজন আহত হয়েছেন বলে জানানো হয়েছে।
জর্ডান জানিয়েছে, তারা ইরানের ২০টি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে। কুয়েতের সেনাবাহিনীও ‘বৈরী আকাশযান’ প্রতিহত করার কথা জানিয়েছে।
মার্কিন নৌঘাঁটির স্বাগতিক দেশ বাহরাইন জানিয়েছে, ‘পাপপূর্ণ ইরানি আগ্রাসনে’ ১১ বছর বয়সী এক কন্যাশিশু সামান্য আহত হয়েছে এবং কয়েকটি বাড়ি ও যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
‘বোমা দিয়েই আলোচনা’
নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হওয়ার সময় মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, ট্রাম্প নির্দেশ দিলে ‘আমরা বোমা দিয়েই আলোচনা করব’।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘সাম্প্রতিক ঘণ্টাগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের অবৈধ ও অপরাধমূলক হামলা শুধু আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনই নয়, বরং যুদ্ধবিরতিকেও কার্যত অর্থহীন করে তুলেছে।’
তবে মধ্যস্থতাকারীরা কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। কাতারি আলোচক দল তেহরান ত্যাগ করেছে। এক কূটনৈতিক সূত্র জানায়, তাদের আলোচনা বৃহস্পতিবার ভোর পর্যন্ত চলেছে।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আন্দ্রাবি বলেন, তারা আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের আশা পুরোপুরি হারাননি।
তবে তিনি বলেন, ‘নতুন করে শত্রুতার এই বিনিময়ের পর আশাবাদী থাকা কঠিন।’
যুদ্ধ চলাকালে ইরানের হামলার শিকার হওয়া সৌদি আরবও পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় আরও আলোচনার আহ্বান জানিয়েছে।
ইরানি তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা চীনও বৃহস্পতিবার আলোচনার ওপর জোর দেয়। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে অবিলম্বে সামরিক অভিযান বন্ধ করে মধ্যস্থতার প্রচেষ্টায় সাড়া দিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্থায়ী যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছানোর আহ্বান জানান।
হরমুজ প্রণালী নিয়ে নতুন হুমকি
তেল ও গ্যাস পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী নিয়ে ইরান আবারও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে দেশটি কার্যত এই নৌপথ বন্ধ করে রেখেছে।
আইআরজিসির মহাকাশ বাহিনীর প্রধান মজিদ মুসাভি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘পবিত্র হরমুজ প্রণালীকে কি আপনারা অনিরাপদ করে তুলছেন? আমরা পুরো অঞ্চলকে আপনাদের জন্য নরকে পরিণত করব।’
বৃহস্পতিবার ভারতের নৌপরিবহনমন্ত্রী জানান, ওমান উপকূলে একটি বাণিজ্যিক জাহাজে মার্কিন হামলায় তিন ভারতীয় নাবিক নিহত হয়েছেন।
এ ঘটনায় নয়াদিল্লিতে নিযুক্ত একজন শীর্ষ মার্কিন কূটনীতিককে তলব করে ‘কঠোর প্রতিবাদ’ জানিয়েছে ভারত।
ইরানের নৌবাহিনীও জানিয়েছে, তারা হরমুজ প্রণালী অতিক্রমের চেষ্টা করা দুটি জাহাজে আঘাত হেনেছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন আইআরআইবি এবং মেহর বার্তা সংস্থা এ তথ্য জানিয়েছে।
অন্যদিকে তাসনিম বার্তা সংস্থা দেশটির সামরিক অপারেশন কমান্ডের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ ‘সম্পূর্ণরূপে বন্ধ’ এবং সেখানে চলাচলকারী ‘যেকোনো জাহাজ’ লক্ষ্যবস্তু হবে।
তবে সেন্টকম এ দাবি অস্বীকার করে বলেছে, ‘আজ রাতেও বাণিজ্যিক জাহাজগুলো হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিকভাবে প্রবেশ ও প্রস্থান করছে।’
‘ওদের ওপর ভয়াবহ বোমাবর্ষণ করব’
এর আগে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজ জানিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রের বোমা হামলা শুরু হওয়ার সময় ইরানি নেতারা সরাসরি হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুমে ট্রাম্পকে ফোন করেছিলেন।
তবে আইআরএনএ সংবাদ সংস্থার বরাত দিয়ে আইআরজিসি এ দাবি দ্রুত অস্বীকার করে।
ফক্স নিউজের সাংবাদিক ট্রে ইংস্ট ট্রাম্পকে উদ্ধৃত করে বলেন, ইরান যদি যুদ্ধের অবসানে যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত না মেনে নেয়, তাহলে ‘আগামীকাল রাতেই আমরা ওদের ওপর ভয়াবহ বোমাবর্ষণ করব।’
বুধবার সকালে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা একটি চুক্তির খুব কাছাকাছি ছিলাম, কিন্তু তারা বারবার আমাদের সঙ্গে খেলা করছে।’
হেগসেথ ইঙ্গিত দেন যে হামলা তৃতীয় রাতেও গড়াতে পারে। তিনি বলেন, এই হামলা হবে ‘শক্তিশালী’ এবং ‘স্পষ্ট বার্তাবাহী’।