বাসস
  ২৩ মে ২০২৬, ১৯:৩৬

যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ‘অতিরিক্ত দাবি’র অভিযোগ ইরানের

ঢাকা, ২৩ মে, ২০২৬ (বাসস): যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে শান্তি প্রস্তাবে ‘অতিরিক্ত দাবি’ তোলার অভিযোগ করেছে তেহরান। একই সময়ে মার্কিন গণমাধ্যমে নতুন করে ইরানে হামলার সম্ভাবনার খবর প্রকাশিত হয়েছে এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্রটির নেতারা সর্বশেষ শান্তি প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করছেন বলে শনিবার জানিয়েছে ইরানি গণমাধ্যম।

তেহরান  থেকে এএফপি জানায়, শান্তি আলোচনায় মধ্যস্থতা জোরদারে পাকিস্তানের প্রভাবশালী সেনাপ্রধান শুক্রবার তেহরানে পৌঁছেছেন। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আকস্মিকভাবে তার ছেলের বিয়েতে যোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ‘সরকার-সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতি’র কারণে ওয়াশিংটনে অবস্থান করার ঘোষণা দেন। এতে পরিস্থিতি স্পর্শকাতর পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে জল্পনা তৈরি হয়েছে।

ট্রাম্প এ সপ্তাহে থেমে থেমে চলা আলোচনাকে নতুন হামলা ও যুদ্ধ অবসানের চুক্তির মধ্যকার ‘সীমারেখায়’ অবস্থান করছে বলে বর্ণনা করেছেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার মধ্য দিয়ে যুদ্ধ শুরু হয়। পরে কৌশলগত হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে পাল্টাপাল্টি অবরোধ আরোপ করা হয়, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিকে অস্থির করে তুলেছে।

৮ এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির পর কয়েক সপ্তাহ ধরে আলোচনা চললেও—যার মধ্যে ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক সরাসরি বৈঠকও রয়েছে—এখনও স্থায়ী সমাধান হয়নি কিংবা হরমুজ প্রণালিতে পূর্ণ প্রবেশাধিকার পুনঃস্থাপন করা যায়নি। ফলে বিশ্ববাজারে বিপুল পরিমাণ তেল সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অননধং অৎধমযপযর জাতিসংঘ মহাসচিব অহঃষ্টহরড় এঁঃবৎৎবং-এর সঙ্গে ফোনালাপে বলেন, ‘কূটনীতির প্রতি বারবার বিশ্বাসঘাতকতা, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক আগ্রাসন, পরস্পরবিরোধী অবস্থান এবং যুক্তরাষ্ট্রের পুনরাবৃত্ত অতিরিক্ত দাবির’ পরও তেহরান কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় যুক্ত রয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানানো হয়।

মার্কিন গণমাধ্যম অ্যাক্সিওস ও সিবিএস নিউজ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, হোয়াইট হাউস ইরানে হামলার বিষয়টি বিবেচনা করছে। তবে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি বলেও তারা উল্লেখ করেছে।

চুক্তি না হলে ইরানের বিরুদ্ধে পুনরায় পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনার কথা মার্কিন কর্মকর্তারা বারবার উল্লেখ করেছেন। সুইডেনে ন্যাটো সম্মেলনের ফাঁকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী  মার্কো রুবিও বলেন, শান্তিপূর্ণ সমাধানের দিকে ‘কিছু অগ্রগতি’ হয়েছে, তবে ‘এখনো কাক্সিক্ষত পর্যায়ে পৌঁছায়নি’।

তিনি বলেন, ‘আমরা অত্যন্ত কঠিন এক গোষ্ঠীর সঙ্গে কাজ করছি। আর যদি পরিস্থিতির পরিবর্তন না হয়, তাহলে প্রেসিডেন্ট পরিষ্কার করেছেন যে তাঁর সামনে অন্য বিকল্পও রয়েছে।’

পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির শুক্রবার তেহরানে পৌঁছে গভীর রাত পর্যন্ত আরাকচির সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ইরানের সরকারি বার্তা সংস্থা আইআরএনএ জানায়, বৈঠকে ‘উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি ঠেকাতে সর্বশেষ কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ও উদ্যোগ’ নিয়ে আলোচনা হয়।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকাই সতর্ক করে বলেন, এ সফরের অর্থ এই নয় যে ‘আমরা কোনো মোড় পরিবর্তনের বা চূড়ান্ত অবস্থায় পৌঁছে গেছি’। ইরানের আইএসএনএ সংবাদ সংস্থার বরাতে তিনি বলেন, মতপার্থক্য এখনো ‘গভীর ও বিস্তৃত’।

বাকাই আরও জানান, শুক্রবার কাতারের একটি প্রতিনিধিদলও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেছে।

তিনি বলেন, ‘সাম্প্রতিক দিনগুলোতে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক—অনেক দেশই যুদ্ধ বন্ধে সহায়তার চেষ্টা করছে... তবে পাকিস্তানই এখনো আনুষ্ঠানিক মধ্যস্থতাকারী।’

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী মাহবাজ শরিফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার চার দিনের সফরে চীনে গেছেন। ইরানের শীর্ষ বাণিজ্য অংশীদার চীনের সঙ্গে বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্য সংকট নিরসনের প্রচেষ্টা নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

বাঘাই বলেন, হরমুজ প্রণালীর পরিস্থিতি এবং ইরানি বন্দরের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা অবরোধ নিয়েও আলোচনা চলছে।

এই কৌশলগত সমুদ্রপথের ভবিষ্যৎ এখনো অন্যতম প্রধান অচলাবস্থার কারণ হয়ে রয়েছে। যুদ্ধ-পূর্ব তেলের মজুত ফুরিয়ে আসায় বৈশ্বিক অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা বাড়ছে।

তবে কূটনৈতিক অগ্রগতির আভাসে বাজার কিছুটা স্বস্তি পেয়েছে। শুক্রবার ওয়াল স্ট্রিট সূচক ঊর্ধ্বমুখী ছিল এবং ডাও জোন্স টানা দ্বিতীয় দিনের মতো রেকর্ড উচ্চতায় বন্ধ হয়। বিনিয়োগকারীরা আশা করছেন, আলোচনার মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত সংকট থেকে বের হওয়ার পথ তৈরি হতে পারে।

তবে তেলের দামও বেড়েছে, যা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে হরমুজে বিঘœ অব্যাহত থাকলে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে। ১৯৫২ সাল থেকে রেকর্ড শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্রে ভোক্তা আস্থা সর্বনি¤œ পর্যায়ে নেমে এসেছে, কারণ উচ্চ মূল্যস্ফীতি পারিবারিক অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো শুক্রবার ইরানের অবরোধকে ‘আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী’ বলে অভিহিত করেছে। একই সঙ্গে অবরোধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞা কাঠামোর পরিধি বাড়াতে কারিগরি পরিবর্তন আনা হয়েছে।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আরও বলেন, লেবাননেও যুদ্ধ বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। সেখানে যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও ইসরাইল এবং তেহরান-সমর্থিত হেজবুল্লাহর মধ্যে সংঘর্ষ চলছে।

লেবাননের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা জানায়, সিরিয়া সীমান্তসংলগ্ন দেশটির পূর্বাঞ্চলে নাবি স্রেইজ এলাকায় ইসরাইল পাঁচটি বিমান হামলা চালিয়েছে।

১৭ এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির পরও ইসরাইল দক্ষিণ লেবাননে হামলা, ধ্বংসযজ্ঞ ও সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ অব্যাহত রেখেছে। তাদের দাবি, তারা হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করেই এসব হামলা চালাচ্ছে। অন্যদিকে হেজবুল্লাহও হামলা অব্যাহত রেখেছে।

২ মার্চ ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের হামলায় হত্যার পর হেজবুল্লাহ ইসরাইল লক্ষ্য করে রকেট হামলা চালিয়ে লেবাননকে যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলে।

বাঘাই বলেন, ‘লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধের অবসান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’

লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২ মার্চ থেকে ইসরাইলি হামলায় দেশটিতে অন্তত ৩ হাজার ১১১ জন নিহত হয়েছেন। শুক্রবার দক্ষিণাঞ্চলে হামলায় এক শিশুসহ ১০ জন নিহত হয়েছেন বলেও তারা জানিয়েছে।