বাসস
  ১৪ মে ২০২৬, ২০:০৫

বেইজিং শীর্ষ বৈঠকে ট্রাম্পকে তাইওয়ান ইস্যুতে সতর্ক করলেন শি

ঢাকা, ১৪ মে, ২০২৬ (বাসস) : চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বৃহস্পতিবার বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত এক শীর্ষ বৈঠকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সতর্ক করে বলেছেন, তাইওয়ান ইস্যুতে ভুল পদক্ষেপ দুই দেশকে ‘সংঘাতের’ দিকে ঠেলে দিতে পারে।

বেইজিং থেকে এএফপি জানায়, ট্রাম্প চীন সফরে এসে স্বাগতিক শি জিনপিংকে ‘মহান নেতা’ ও ‘বন্ধু’ বলে প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, দুই দেশের সামনে ‘একটি চমৎকার ভবিষ্যৎ’ অপেক্ষা করছে।

তবে ট্রাম্পকে জাঁকজমকপূর্ণ অভ্যর্থনা জানানোর পর তুলনামূলক সংযত ভাষায় শি বলেন, দুই পক্ষের ‘প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, অংশীদার হওয়া উচিত’। একই সঙ্গে তিনি শুরুতেই স্বশাসিত গণতান্ত্রিক দ্বীপ তাইওয়ানের বিষয়টি সামনে আনেন, যাকে বেইজিং নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে।

চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত বক্তব্য অনুযায়ী, শি বলেন, ‘তাইওয়ান প্রশ্নটি চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘এটি ভুলভাবে পরিচালিত হলে দুই দেশ মুখোমুখি সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়তে পারে, এমনকি সরাসরি সংঘাতেও রূপ নিতে পারে। এতে পুরো চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক অত্যন্ত বিপজ্জনক অবস্থায় চলে যাবে।’

প্রায় দুই ঘণ্টা ১৫ মিনিট স্থায়ী বৈঠকের শুরুতে তিনি এ মন্তব্য করেন।

২০১৭ সালের পর এই প্রথম কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট চীন সফর করলেন। তবে জাঁকজমকপূর্ণ অভ্যর্থনার আড়ালে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও ভূরাজনৈতিক নানা অমীমাংসিত উত্তেজনা রয়ে গেছে।

শি জিনপিং বেইজিংয়ের জাঁকজমকপূর্ণ ‘গ্রেট হল অব দ্য পিপল’-এ ট্রাম্পকে লালগালিচা সংবর্ধনা জানান। সেখানে সামরিক ব্যান্ড, কামানের তোপ এবং ‘স্বাগতম’ ধ্বনি দেওয়া স্কুলশিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছিল।

ট্রাম্পকে অনুষ্ঠান উপভোগ করতে দেখা যায়। তিনি বলেন, ‘চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভালো হবে।’

অন্যদিকে শি প্রাচীন গ্রিক রাজনৈতিক তত্ত্বের উল্লেখ করে বলেন, যখন একটি উদীয়মান শক্তি বিদ্যমান প্রভাবশালী শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করে, তখন যুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি হয়।

তিনি বলেন, ‘চীন ও যুক্তরাষ্ট্র কি তথাকথিত ‘থুসিডিডিস ফাঁদ’ অতিক্রম করে বৃহৎ শক্তিগুলোর সম্পর্কের নতুন দৃষ্টান্ত গড়তে পারবে?’

শি আরও বলেন, ‘সহযোগিতা উভয় পক্ষের জন্য উপকারী, আর মুখোমুখি অবস্থান উভয়ের জন্য ক্ষতিকর।’

২০১৭ সালে ট্রাম্পের শেষ সফরের পর থেকে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এমন সংঘাতই বেশি দেখা গেছে। ২০২৫ সালের বড় অংশজুড়ে দুই দেশ তীব্র বাণিজ্যযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে এবং বিভিন্ন বৈশ্বিক ইস্যুতে মতবিরোধে ছিল।

তাইওয়ান দীর্ঘদিন ধরেই দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু।

যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে শুধু বেইজিংকেই স্বীকৃতি দিলেও নিজেদের আইনের আওতায় তাইওয়ানকে আত্মরক্ষার জন্য অস্ত্র সরবরাহ করতে বাধ্য।

চীন স্বশাসিত এই দ্বীপকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার অঙ্গীকার করেছে এবং প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগের সম্ভাবনাও নাকচ করেনি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেইজিং সামরিক চাপও বাড়িয়েছে।

শি’র মন্তব্যের পর তাইপে চীনকে আঞ্চলিক শান্তির ‘একমাত্র ঝুঁকি’ বলে উল্লেখ করে এবং জানায়, ‘মার্কিন পক্ষ বারবার তাদের স্পষ্ট ও দৃঢ় সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে।’

তবে ট্রাম্প সোমবার বলেন, তিনি তাইওয়ানে মার্কিন অস্ত্র বিক্রি নিয়ে শি’র সঙ্গে কথা বলবেন। এ বক্তব্য ঐতিহাসিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সেই অবস্থান থেকে সরে আসা, যেখানে ওয়াশিংটন বলত এ বিষয়ে তারা বেইজিংয়ের সঙ্গে পরামর্শ করবে না।

‘চায়না নেইকান’ নিউজলেটারের সম্পাদক অ্যাডাম নিং এএফপিকে বলেন, চীনের পররাষ্ট্রনীতিতে এমন ‘কঠোর ভাষা’ অস্বাভাবিক নয়, তবে শি’র মুখে এটি বিরল।

তিনি বলেন, ‘শি খুব স্পষ্ট করে বোঝাতে চাইছেন যে, তাইওয়ান ইস্যুকেই তিনি দুই পরাশক্তির মধ্যকার সম্ভাব্য বিস্ফোরক সংকট হিসেবে দেখছেন।’

সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির চং জা ইয়ান এএফপিকে বলেন, শীর্ষ বৈঠকের আগে থেকেই চীন তাইওয়ান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ছাড় পাওয়ার আগ্রহের ইঙ্গিত দিচ্ছিল।

তার মতে, শি’র দাবি থেকে বোঝা যায়, ‘তারা মনে করছে ট্রাম্পকে প্রভাবিত করার কিছু সুযোগ রয়েছে।’

আলোচ্য বিষয়গুলোর তালিকায় নতুন করে যুক্ত হওয়া ইরান যুদ্ধ ট্রাম্পের অবস্থানকে দুর্বল করে দিতে পারে। এই যুদ্ধের কারণেই মার্চের সফর পিছিয়ে দিতে হয়েছিল তাকে।

ট্রাম্প বলেন, তিনি ইরান প্রসঙ্গে শি’র সঙ্গে ‘দীর্ঘ আলোচনা’ করবেন। কারণ চীনই মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা ইরানি তেলের প্রধান ক্রেতা। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘এই বিষয়ে আমাদের কোনো সাহায্যের প্রয়োজন নেই।’

অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে চীনের কড়া সমালোচক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, ওয়াশিংটন চায় বেইজিং ‘আরও সক্রিয় ভূমিকা’ পালন করুক।

ট্রাম্প কৃষি, বিমানসহ বিভিন্ন খাতে ব্যবসায়িক চুক্তিরও আশা করছেন।

এনভিডিয়ার জেনসেন হুয়াং এবং টেসলার ইলন মাস্কসহ ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলের সদস্যদের বৃহস্পতিবার অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানে ‘গ্রেট হল অব দ্য পিপল’-এর সিঁড়িতে দেখা যায়।

মাস্ক পরে সাংবাদিকদের বলেন, বৈঠকটি ছিল ‘দারুণ’, আর হুয়াং বলেন, ‘দুই প্রেসিডেন্টই অসাধারণ ছিলেন।’

পরে শি প্রতিনিধিদলকে বলেন, তার দেশের ‘বিশ্বের প্রতি দরজা আরও বেশি খুলবে’ এবং মার্কিন কোম্পানিগুলো চীনে ‘আরও উজ্জ্বল সম্ভাবনা’ উপভোগ করবে।

শীর্ষ বৈঠকের আগের দিন দক্ষিণ কোরিয়ায় মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এবং চীনের উপ-প্রধানমন্ত্রী হে লিফেং দীর্ঘদিনের বাণিজ্যযুদ্ধ নিরসনে অগ্রগতি আনার লক্ষ্যে বৈঠক করেন।

শি বলেন, ওই আলোচনা ‘সামগ্রিকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ ও ইতিবাচক ফল’ দিয়েছে এবং উভয় পক্ষকে ‘কষ্টার্জিত ইতিবাচক গতি’ ধরে রাখার আহ্বান জানান।

দক্ষিণ কোরিয়ায় গত অক্টোবরে ট্রাম্প ও শি যে এক বছরের শুল্কবিরতি চুক্তি করেছিলেন, তা বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

বিরল খনিজ রপ্তানিতে চীনের নিয়ন্ত্রণ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রতিযোগিতাও আলোচনায় আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সকালের বৈঠকের পর দুই নেতা আলোচনা থেকে বিরতি নিয়ে ‘টেম্পল অব হেভেন’-এ যান। ইউনেস্কো ঘোষিত এই বিশ্ব ঐতিহ্যস্থলে একসময় চীনের সম্রাটরা ভালো ফসলের জন্য প্রার্থনা করতেন।